মিরসরাই ট্র্যাজেডি

আজ সেই অন্তহীন অশ্রুপাতের দিন

রাজু কুমার দে, মিরসরাই

মিরসরাই ট্র্যাজেডির সেই মর্মস্পর্শী ঘটনা আজো মিরসরাইবাসীর মনকে ব্যথিত করে তোলে। এ ঘটনার সাত বছর হয়ে গেলেও আজো সব স্মৃতি যেন এতটুকু পরিমাণ মলিন হয়নি। স্বজনহারা মানুষগুলোর করুণ আর্তনাদ আজো থামেনি। যেন আবুতোরাবের ঘরে-ঘরে এখনো লেপ্টে আছে শোকার্তদের চোখের জল। ১১ গ্রামের মানুষের কান্না আজো ভেসে আসে বাতাসে। যে কান্নার রোল থামানোর সাধ্য কারো নেই।
বছর ঘুরে আবারো ফিলে এলো ১১ জুলাই। এদিনটি স্মৃতির পাতায় শোকের দিন হিসেবেই লেখা আছে। দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ৪৫টি উজ্জ্বল নক্ষত্রের কথা। যে নক্ষত্রগুলো একদিন আলোকিত করতো এই জনপদ তথা রাষ্ট্রকে।
১১ এপ্রিল ফিরবে বারবার। ফিরবে না সেই সোনামুখগুলো। যাদের পদচারণায় মুখর ছিল আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়, নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার। চারপাশে আজ তাদের স্মৃতিচিহ্ন। এই চিহ্ন বুকে আঁকড়ে পথ চলছে এই জনপদের মানুষ।
মিরসরাই ট্র্যাজেডির পর আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় সরকারিকরণের ঘোষণা এসেছিল। সেই ঘোষণা আজো বাস্তবায়ন হয়নি।
মিরসরাই ট্র্যাজেডিতে নিহতদের বাড়িতে স্বজনদের খোঁজখবর নিতে গিয়ে এক হৃদয়বিদায়ক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। আশপাশের এলাকায় এখনো ঈদের আনন্দ চলছে। অথচ সেই আনন্দ স্পর্শ করে না স্বজনহারা মানুষগুলোকে। ট্র্যাজেডিতে নিহত সাইদুল, নয়ন, ইফতেখার, কামরুলের হতভাগিনী মায়েরা সন্তানের ছবি বুকে নিয়ে এখনো পথ চেয়ে থাকেন। ছেলে বাড়ি ফিরবে। মা বলে ডাকবে, এ আশায়।
নিহত স্কুল ছাত্র কাজল নাথের মা অনিতা দেবী জানান, প্রতি বছর ১১ জুলাই এলে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেন না। মা-বাবার তার সন্তানের জন্ম বার্ষিকী পালন করে। কিন’ তাদের পালন করতে হয় মৃত্যু বার্ষিকী। এটি যে কত যন্ত্রণাদায়ক তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। প্রতি বছর এই দিনে ছেলে কাজল নাথের নামে পূজা দেন তিনি।
সেদিন যা ঘটেছিল :
১১ জুলাই ২০১১, সোমবার : মিরসরাই স্টেডিয়াম থেকে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল ফাইনাল খেলা শেষে একটি মিনি ট্রাকে করে বিজয়ী এবং বিজিত উভয় দলের খেলোয়াড় ও সমর্থকরা আবুতোরাব এলাকায় যাচ্ছিল। বড়তাকিয়া-আবুতোরাব সড়কের সৈদালী এলাকায় ৬০-৭০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ডোবায় উল্টে যায় মিনিট্রাকটি। যার নং চট্টমেট্রো – ড – ১১-০৩৩৭। ডোবার জল থেকে একে একে উঠে আসে লাশ আর লাশ। ২০১১ সালের ২৪ নভেম্বর রাত ৯ টায় নয়নশীলের প্রয়ান পর্যন্ত ৪৫ টি মৃত্যু গুনতে হয়। সব মিলিয়ে ৪৫ জনের প্রাণের বিনিময়ে রচিত হয় মিরসরাই ট্র্যাজেডী।
সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী নিহত হয় আবুতোরাব বহু মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের। উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৪ শিক্ষার্থী প্রাণ হারায়। এ ছাড়া আবুতোরাব সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩, আবুতোরাব ফাজিল মাদ্রাসার ২, প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের ২, এবং আবুতোরাব এস এম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ জন শিক্ষার্থী মারা যায়। এছাড়া ২জন অভিবাবকও প্রাণ হারায়।
কথা রাখেনি শিক্ষামন্ত্রী:
দূর্ঘটনার পর শিক্ষামন্ত্রী নুুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছিলেন আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করা হবে। কিন’ ঘটনার ৭ বছর অতিবাহিত হতে চললেও এখনো সরকারিকরণের ঘোষনা আসেনি। তাই স্কুল শিক্ষকসহ অভিবাবক ও ছাত্রছাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন:
আজ সকাল ৯ টায় নিহত ছাত্রদের স্মরণে নির্মিথ স্মৃতিস্তম্ভ ‘আবেগ’ ও ‘অন্তিম’ এর স’লে পুষ্পস্তবক অর্পনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে দিনের কর্মসূচী। এরপর শোক র্যালী, কোরআনখানি ও মিলাদ মাহফিল ও আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় প্রঙ্গনে স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়েছ। স্মরণ সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) কায়সার খসরু জানান, বুধবার সকালে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন আয়োজন করা হয়েছে। সকালে একটি শোক র্যালী বের করা হবে। বিকালে আয়োজনা সভার অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপসি’ত থাকবেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি।