জাপানের রূপকথা

লোভ করা ভালো নয়

সুব্রত চৌধুরী

অনেক অনেক দিন আগের কথা। সুদূর জাপানের কোন এক গ্রামে এক বুড়ো লোক বাস করতো। বুড়ো ছিল যারপরনাই ভালো, কিন্তু তার বউটা ছিল বদের হাড্ডি। বুড়ো-বুড়ি ছিল নিঃসন্তান, তাই তাদের ঘরখানা ছিল একেবারে ফাঁকা। সেই ফাঁকা বাসায় তাদের নিত্যসঙ্গী ছিল ছোট একটা চড়ুই পাখি। বুড়ো চড়ুইটাকে কী যে আদর করতো। দিনের শেষে বুড়ো কাজকর্ম সেরে যখন বাড়িতে ফিরে আসতো তখন চড়ুই পাখিটা বুড়োকে দেখে কী যে খুশি হতো। বুড়ো চড়ুই পাখির নরম তুলতুলে শরীরে আলতো করে হাত বোলাতো, আর রাজ্যের সব গল্প করতো। রাতে খাবার সময় নিজের থালা থেকে তুলে চড়ুই পাখিকে খাওয়াতো।
আর ঐদিকে বুুড়োর বউ, যে ছিল বদের হাড্ডি, সে কোনভাবেই চড়ুই পাখিটাকে মেনে নিতে পারলো না। বুড়ি কোনভাবেই চাইছিল না চড়ুই পাখিটা তার বাড়িতে থাকুক। কারণ বুড়ি মনে মনে ভয় পাচ্ছিল, না জানি বুড়ো তাকে ছেড়ে চড়ুই পাখিটাকে নিয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেয় কিনা।
একদিনের ঘটনা। বুড়ো তখন কাজের খোঁজে বাড়ি থেকে অনেক দূরে। বুড়ি কলতলায় বসে কাপড়-চোপড় পরিস্কার করছিল। এমন সময় চড়ুই পাখিটা উড়ে এসে নরম কম্বলের ওপর বসে মল ত্যাগ করলো। বুড়ি তা দেখে খুবই খেপে গেল। সে উঠে গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে কাঁচি নিয়ে এসে চড়ুই পাখির লেজটা কেটে চড়ুই পাখিটাকে দেওয়ালের বাইরে ছুঁড়ে মারলো, আর গলা সপ্তমে চড়িয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো, ‘দূর হয়ে যা এখান থেকে। আর একবার যদি তোকে এই বাসায় দেখি তাহলে তোকে জবাই করে ফেলবো।’ মনের দুঃখে চড়ুই পাখিটা কোনমতে উড়ে উড়ে বনের ভেতর হারিয়ে গেল।
দিনের শেষে কর্মক্লান্ত শরীর নিয়ে বুড়ো বাড়িতে ফিরে চড়ুই পাখিটাকে না দেখে এখানে-ওখানে খুঁজতে লাগলো, কিন্তু কোথাও চড়ুই পাখির টিকিটিও মিললো না। শেষে বুড়ির কাছে চড়ুই পাখিটার ব্যাপারে জানতে চাইলো। কিন্তু বুড়ির মুখ দিয়ে কোন রা-ই বের হলো না। শেষমেশ বুড়োর চাপাচাপিতে বুড়ি সবকিছু খুলে বললো। বুড়ির কথা শুনে বুড়োর খুব মন খারাপ হয়ে গেল, ভারি মন নিয়েই বুড়ো বিছানায় গেলো।
চড়ুই পাখিটাকে হারিয়ে বুড়োর সারারাত ঘুম হলো না। ভোরের আলো ফুটতেই বুড়ো চড়ুই পাখিটার খোঁজে বনের পথে বেরিয়ে পড়লো। অনেক দূর পথ পাড়ি দিয়েও বুড়ো চড়ুই পাখিটার কোন খোঁজ পেলো না, শেষে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে বুড়ো হাত-পা ছড়িয়ে একটা বড় গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলো। ক্লান্তিতে-শ্রান্তিতে বুড়ো ঝিমোচ্ছিলো, এমন সময় বুড়োকে অবাক করে দিয়ে চড়ুই পাখিটা তার সামনে এসে হাজির হলো। চড়ুই পাখিটার পরনে জাপানী পোশাক, বুড়ো তাকে প্রথমে চিনতে পারলোই না। শেষে ধাতস্থ হয়ে দেখলো সত্যিই তো, তার পোষা চড়ুই পাখিটা তার সামনেই। ‘হে, আমার প্রিয় বন্ধু, আমাকে খুঁজতে গিয়ে তুমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছ, ক্ষুধার্তও নিশ্চয়। চলো আমার সাথে, আমার বাসায় গিয়ে জিরোবে আর খাবে। বুড়ো চড়ুই পাখিটাকে অনুসরণ করে তার বাসায় গিয়ে পৌঁছতেই চড়ুই পাখির মেয়েরা বুড়োকে স্বাগত জানিয়ে বললো, স্বাগতম, ভেতরে আসুন। বুড়ো ঘরের ভেতর ঢুকে আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর চড়ুই পাখির এক মেয়ে ট্রে ভর্তি খাবার এনে তার সামনে রাখলো। ক্ষুধার্ত বুড়ো পেট পুরে তা খেলো। খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে বুড়ো চড়ুই পাখির মেয়েদের সাথে গাল-গল্পে মেতে উঠলো। মেঘে মেঘে কখন যে বেলা গড়িয়ে গেলো বুড়ো তা টেরই পেলো না। সন্ধ্যা নামতেই বুড়ো বাড়ি ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ালে চড়ুই পাখিটা তাকে বললো তার বাড়িতে থেকে যেতে। কিন্তু বুড়ো তার বউয়ের কথা ভেবে রাজি হলো না। বুড়োর বাড়ি ফেরার তাড়া দেখে চড়ুই পাখিটা তাকে বললো, ‘ঠিক আছে, তুমি যখন যেতেই চাচ্ছো তোমাকে আমি বাধা দেবো না । আমি তোমাকে একটা উপহার দেবো’- এই বলেই চড়ুই পাখি বাড়ির ভেতর থেকে দুটো বেতের ঝুড়ি নিয়ে আসলো। একটা ঝুড়ি ছিল বেশ বড় ও ভারি, আরেকটা ঝুড়ি ছিল ছোট ও হালকা। চড়ুই পাখি বুড়োকে ঝুড়ি দুটো দেখিয়ে বললো, ’এই দুটো ঝুড়ির মধ্যে তুমি কোন ঝুড়িটা নিতে চাও?’বুড়োর মনের কোণে লোভের লেশমাত্রও ছিল না, তাই সে ছোট ঝুড়িটা নিয়েই চড়ুই পাখিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ালো।
বাড়িতে পৌঁছে বুড়ো তার বউকে সব ঘটনা খুলে বললো। বুড়োর মুখে সব শুনে বুড়ির যেন তর সয়ছিল না। বুড়ি বললো, ’তাড়াতাড়ি ঝুড়িটা খোল, দেখি ভেতরে কী আছে?’
বুড়ো ঝুড়ির মুখটা খুলতেই বুড়ির চোখ ছানাবড়া। আর বুড়ির চোখ ছানাবড়া হবেই বা না কেন?ঝুড়ি ভর্তি যে সব সোনার মোহর আর স্বর্ণমুদ্রা। ‘জীবনের বাকি সময়টা আমরা ধনী হয়ে কাটাতে পারবো, আমাদের আর কোন অভাব-অনটন থাকবে না’-বুড়ি মনে মনে ভাবলো। আদতে বুড়ি ছিল খুবই লোভী। তাই সে চিৎকার করে বুড়োকে বললো, ’তুমি একটা মূর্খ, হাঁদারাম। কেন যে তুমি বড় ঝুড়িটা নিলে না, তাহলে আমরা আরো বেশি বেশি ধনী হতে পারতাম। আমি কালকেই চড়ুই পাখির বাড়ি গিয়ে বড় ঝুড়িটা নিয়ে আসবো। ’
‘না, না , তোমার যেতে হবে না, এগুলোই আমাদের জন্য যথেষ্ট, ’ বুড়ো বললো। বুড়ি বুড়োর কথাকে থোড়াই কেয়ার করলো। শেষে বুড়োর কাছ থেকে চড়ুই পাখির বাড়ির ঠিকানা নিয়ে রাখলো। পরদিন ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই বুড়ি চড়ুই পাখির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। বেশ কিছু পথ মাড়িয়ে এসে বুড়ি চড়ুই পাখির বাড়ি খুঁজে পেল। চড়ুই পাখির বাড়িতে পৌঁছেই বুড়ি যতটুকু সম্ভব বিনয় দেখিয়ে বললো,’ হে চড়ুই, তোমাকে কী বলে যে ধন্যবাদ জানাবো, তুমি আমাদেরকে আমাদের বাকি জীবনের জন্য ধনী বানিয়ে দিলে, আমরা আজীবন তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো। ’
চড়ুই পাখি বুড়িকে ঘরের ভেতর ডেকে নিয়ে জলপানে আপ্যায়িত করলো। একথা সেকথা বলা শেষে বুড়ি যখন বাড়ি ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ালো তখন চড়ুই পাখি ঘরের ভেতর থেকে একটা ভারি বেতের ঝুড়ি ও আরেকটি হালকা বেতের ঝুড়ি নিয়ে এসে বুড়িকে বললো, ‘ এই দুটো ঝুড়ির মধ্যে তুমি যে কোন একটা বেছে নাও। ’ বুড়ি কাল বিলম্ব না করে বড় ও ভারি ঝুড়িটা নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল।
বনের ভেতর দিয়ে পথ চলতে চলতে বুড়ি হাঁফিয়ে উঠল। সে মনে মনে চিন্তা করলো, কী দরকার এতো ভারি ঝুড়ি বাড়িতে বয়ে নিয়ে যাওয়ার, তার চাইতে এখানেই খুলে দেখি। যেমন ভাবা তেমন কাজ। বুড়ি বড় একটা গাছের নীচে এসে বসলো, তারপর খুশিতে গদগদ হয়ে যেইনা ঝুড়ির মুখটা খুললো সাথে সাথে অবাক করা সব জিনিষ বের হয়ে আসতে লাগলো। এসব জিনিষের মধ্যে ছিল সাপ, বিষাক্ত মাকড়সা, মৌমাছি আরো কতো কী। এসব দেখে বুড়ি ভয়ে ঝুড়িটা ফেলে রেখে দিল ছুট। ছুটতে ছুটতে বাড়িতে ফিরে সে বুড়োর পায়ে পড়ে বললো, ’ আমি আর কখনো লোভ করবো না, অল্পতেই তুষ্ট থাকবো। ’
বুড়ির কথা শুনে বুড়ো মুচকি হাসলো। এই ঘটনার পর থেকেই বুড়ি তার স্বামীর সাথে ভালো ব্যবহার করতে লাগলো, আর বাড়ির উঠোনে আসা পাখিকূলের যত্ন আত্তিও করতে লাগলো।