হালিশহর-আগ্রাবাদ

বসবাসের অযোগ্য!

শিগগিরই পোর্ট কানেকটিং রোডের একপাশ উভয়মুখী যান চলাচলের জন্য তৈরি করে দেয়া হবে: মেয়র সমস্যা সমাধানে ২৪ জুন আন্তঃসংস'া সমন্বয় সভা ডেকেছে চসিক

ভূঁইয়া নজরুল
dust at pc road,halishohor area-helal (6)

বর্ষা আর জোয়ারে ঘরে-রাস্তায় পানি, ভাটায় আবর্জনার দুর্গন্ধ! এর বাইরে ভাঙ্গা সড়কের ভোগান্তি। নিত্যদুর্ভোগে আগ্রাবাদ-হালিশহর এলাকা যেন বসবাসের অযোগ্য জনপদ।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে হালিশহর এলাকার দুর্ভোগ চিত্র নিয়ে এক সংবাদকর্মী লিখেছেন- ‘মাননীয় নগরপিতা ও নগর চাচাকে (সিডিএ) একবার নিমতলা থেকে অলঙ্কার মোড় এবং হাজীপাড়া থেকে বড়পুল মোড় যুদ্ধবিধ্বস্ত সড়ক ঘুরে যাওয়ার আমন্ত্রণ রইলো, দেখি তাদের বুকের পাঠা কেমন?’ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম ঈদের পর দিন গত রোববার তার ফেইসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘আকাশে বাতাসে প্রচণ্ড গন্ধ, জোয়ারের পানি, বেহাল সড়ক, বিধ্বস্ত সুয়্যারেজ, নিচতলায় পানিতে বসবাসের অযোগ্য হালিশহর এলাকা।’
এ বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় কথা হয় জাফর আলমের সাথে। তিনি বলেন ,‘আমাদের বন্দর হাসপাতালে এই এলাকার অনেক মানুষ চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এখানকার মানুষ জন্ডিস, হেপাটাইটিস ই, বি, কলেরাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুরা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে পানিতে থাকা বিভিন্ন জীবাণুর দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। ঈদের বন্ধের পর স্কুল-কলেজ খোলা হলে আরো ভয়ানক অবস’া হবে এসব এলাকার অধিবাসীদের। মনে হচ্ছে এই এলাকার কোনো অভিভাবক নেই।’
গতকাল দুপুরে অলঙ্কার মোড় থেকে পোর্ট কানেকটিং রোড ও আগ্রাবাদ এক্সেস রোড এলাকা ঘুরে উপলদ্ধ হয়েছে, নিমতলা মোড় থেকে অলঙ্কার মোড় পর্যন্ত পোর্ট কানেকটিং রোডের উভয় পাশের যেসব বাসিন্দা বসবাস করেন এবং আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের হাজীপাড়া মোড় থেকে বড়পোল মোড় পর্যন্ত অধিবাসীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ সহ্য করে তাদেরকে বসবাস করতে হচ্ছে। সত্যিই বসবাসের যোগ্য নয় এ জনপদ!
সরেজমিনে দেখা যায়, অলঙ্কার মোড় থেকে শুরু হওয়া সড়কে খণ্ড খণ্ড গর্ত বিশাল আকার ধারণ করেছে হাক্কানী পেট্রোল পাম্পের সামনে। পুরো সড়কজুড়েই বিশাল বিশাল গর্ত। চলাচলকারী গাড়িগুলো সাপের মতো একেঁবেঁকে চলছে। এসব গর্ত পার হয়ে নয়াবাজার মোড়ের আগে গাড়িগুলোকে আবার পড়তে হবে গর্তের মধ্যে। এমনকি গর্ত এড়িয়ে দুই চাকার মোটরসাইকেল যাওয়ারও কোনো উপায় নেই। নয়াবাজার মোড়ের পুরোটাই এবরো থেবড়ো গর্তে ভরা। নয়াবাজার মোড় পার হলেই রাস্তার উভয়পাশে দেখা যাবে মাটি ও ময়লার স’প। তাসপিয়ার সামনে উভয়পাশের রাস্তার বিশাল বিশাল গর্ত। খানবাড়ির সামনের গর্তকে মনে হবে পুকুর। আর তাসপিয়ার গেট থেকে হালিশহর ওয়াপদা পর্যন্ত রাস্তার পাশের আবর্জনায় আকাশে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আরো সামনে অগ্রসর হলে ওয়াপদা থেকে হালিশহর এসি মসজিদ পর্যন্ত রাস্তার পূর্ব পাশের সড়কটি যেন ভাসমান ডাস্টবিন। আশপাশের এলাকা থেকে ভ্যানে করে সব ময়লা এখানে ফেলা হয় এবং এখান থেকে পরে সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি এসে নিয়ে যায়। কিন’ আবর্জনা নিয়ে যাওয়ার পর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আবর্জনা পুরো সড়ককে পরিণত করেছে ভাগাড়ে। সেই আবর্জনা জোয়ারের পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। হালিশহর এসি মসজিদের পর (কে ব্লক ১০ নম্বর গেইট) থেকে বড়পোল মোড় পর্যন্ত রাস্তার উভয় পাশে আলকাতরার মতো কালো হয়ে আছে। আর নালা থেকে উঠিয়ে আনা আবর্জনা সড়কজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এসব আবর্জনায় দুর্গন্ধ যেমন ছড়াচ্ছে তেমনিভাবে গত দুই মাস আগে উভয়পাশের নালা তৈরি করতে গিয়ে উঠানো মাটিও রাস্তার উপর এখনো জমে রয়েছে। সেই মাটির স্তূপে গাছ গজিয়ে উঠেছে। এসব মাটি রাস্তার একাংশ দখল করে রেখেছে।
এদিকে হালিশহর কে ব্লক ৯ নম্বর গেইটের সামনে রাস্তার উপর এসব আবর্জনা মাটি অপসারণের কাজ করতে দেখা যায় একটি পেলোডারকে। জানতে চাইলে নিজেকে ঠিকাদার পরিচয় দিয়ে কে এম ফজলুল হক বলেন, ‘আমরা সিডিএ’র মেগা প্রকল্পের আওতায় হালিশহর এলাকার নালা থেকে মাটি উত্তোলনের কাজ করছি। এসব মাটি নালা থেকে তুলে এখানে রাখা হয়েছে এবং এখান থেকে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
এছাড়া পোর্ট কানেকটিং রোডে আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের বড়পোল মোড়ের আগে ব্র্যাক বাংকের সামনে রয়েছে বিশাল গর্ত। এসব গর্ত অতিক্রম করে বড়পোল মোড় পার হলেই রাস্তার একপাশ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে গর্তের কারণে। একইভাবে হালিশহর রোডের বড়পোল মোড় থেকে সল্টগোলা রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের আগে থাকা ব্রিজের আগ পর্যন্ত রাস্তায় বিশাল গর্তের কারণে সড়কের একপাশ বন্ধ। ব্রিজ পার হলে পোর্ট কলোনির মোড় হয়ে নিমতলা ব্রিজ পর্যন্ত বিশাল গর্তে সড়কটি চলাচলের অযোগ্য। অপরদিকে আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের ছোটোপুল শান্তিবাগ থেকে হাজীপাড়া পর্যন্ত সড়কের এক পাশ ব্যবহার অনুপযোগী। যদিও অপর পাশে মাটি দিয়ে উঁচু করায় এখন গাড়ি চলাচল করতে পারছে।
এদিকে জোয়ারের পানির কারণে হালিশহর কে ব্লক, এল ব্লক, ছোটোপুল, শান্তিবাগ, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, বন্দর কলোনিসহ আশপাশের এলাকার নিচতলা প্রায়সময় পানিতে ডুবে থাকছে। এতে পুরো এলাকার ময়লা আবর্জনা আটকে দুর্গন্ধময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার ২৭ নম্বর রোডে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার উপর ময়লা পলিমাটির স্তূপ। এসব মাটির কারণে রাস্তায় জমে থাকা পানি নালায় যেতে পারছে না।
২৭ নম্বর রোডের বাসিন্দা মোহাম্মদ আহমান উল্লাহ বলেন, ‘আমি স’ানীয় কাউন্সিলরকে বার বার বলছি এসব আবর্জনা পরিষ্কারের জন্য, কিন’ কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। জোয়ারের পানি উঠবে আবার নেমে যাবে এটা স্বাভাবিক। কিন’ ময়লা আবর্জনার কারণে পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। এসব পানি শরীরে লাগলেই নানা ধরনের রোগ হবে।’
হালিশহর কে ব্লক আড়ং এর গলির বাসিন্দা শারমিন জাহান বলেন, প্রতিদিন জোয়ারের সময় ঘরে পানি উঠে কিন’ রাস্তায় পানি উঠে না। রাস্তা উঁচু করায় এখন সব পানি ঘরে গিয়ে ঢুকছে। আর আবর্জনাগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে না। এতে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
ভাঙ্গা সড়ক ও দুর্ভোগ প্রসঙ্গে সরাইপাড়া ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাবের আহম্মেদ বলেন, ‘দুর্বল ঠিকাদারের কারণে কাজ একটু বিলম্বিত হচ্ছে। এতে মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। পোর্ট কানেকটিং রোড চলাচলের প্রায় অনুপযোগী। আগামীকালের (বুধবার) সাধারণ সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।’
রামপুরা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এস এস এরশাদ উল্লাহ বলেন, ‘উন্নয়ন পেতে গেলে একটু দুর্ভোগ শিকার করতেই হয়। আমিও এই দুর্ভোগের বাইরে নই। এছাড়া জোয়ারের সময় এই এলাকায় পানি উঠে তাই ঠিকভাবে কাজও করা যায় না। তারপরও দুর্ভোগ কমিয়ে আনার বিষয়ে আমরা কাজ করছি।’
আগ্রাবাদ হালিশহর এলাকার মানুষকে দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে ২৪ জুন বিভিন্ন সংস’া প্রধানদের নিয়ে সমন্বয় সভার ডাক দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘ইতিমধ্যে এসব এলাকা আমি পরিদর্শন করেছি। এই এলাকার মানুষ প্রকৃতপক্ষে কষ্টে রয়েছে। তাদের এই কষ্ট লাঘবের জন্য আমি ট্রাফিক পুলিশ, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চালকদের সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করেছি। পণ্যবাহী গাড়িগুলো এই সড়কের পরিবর্তে পোর্ট এক্সেস রোড দিয়ে চলাচল নিশ্চিত করতে চেষ্টা করা হচ্ছে। আর তা করা গেলে পোর্ট কানেকটিং রোডের উপর চাপ কিছুটা কমবে।’
ভাঙ্গা রাস্তা ও চলাচলের দুর্ভোগ কমানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সড়কের একপাশ চলাচলের উপযোগী করে গড়ে তুলবো। এই একপাশ দিয়ে উভয়মুখী গাড়ি চলাচল করতে পারবে। শিগগিরই এই কাজ শুরু হবে। ইতিমধ্যে আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে এভাবে একপাশ তৈরি করা হয়েছে।’
এলাকায় জমে থাকা ময়লা আবর্জনা ও দুর্গন্ধ প্রসঙ্গে সিটি মেয়র বলেন, অবশ্যই সবগুলো কাজ পর্যায়ক্রমে করা হবে। একটির সাথে আরেকটি সম্পর্কযুক্ত।
রাস্তার উপর সিডিএ’র মেগা প্রকল্পের আবর্জনা পড়ে থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী ২৪ জুন যে আন্তঃসংস’া সমন্বয় সভা ডাকা হয়েছে সেখানে এ বিষয়টি আলোচনা হবে। রাস্তার উপর যাতে আবর্জনা না রাখা হয় এবং ওয়াসাও যাতে রাস্তায় কোনো কাঁটাছেড়া না করে তা নিশ্চিত করা হবে।
পোর্ট কানেকটিং রোডে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা মাটির স্তূপ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিটি মেয়র বলেন, যেহেতু রাস্তাটি উঁচু হচ্ছে তাই পরবর্তীতে অনেক মাটির প্রয়োজন হবে। তাই এখন সব মাটি সরিয়ে ফেললে সমস্যায় পড়তে হবে। তারপরও আমরা অনেক মাটি সরিয়েছি।