শফিকুল সাহেব

সৈয়দ ইবনুজ্জামান

বিদ্যুৎ নেই, শফিকুল সাহেব মাথায় আইস ব্যাগ দিয়ে আছেন। জানালা দিয়ে বাইরে কাকদের দেখছেন আর ভাবছেন, কাকের রং তো কালো ওদের তো আরো বেশি গরম লাগার কথা। কিন’ দিব্যি উড়ে বেড়াচ্ছে। তিনিও উড়তে চেয়েছিলেন মুক্ত পাখির মতো। তা আর হলো কই? তিনি একটি বহুজাতিক কোম্পানীর নির্বাহী কর্মকর্তা। পাশাপাশি একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক। পঞ্চাশের কাছাকাছি। একটা সময় প্রতিষ্ঠিত কবি হতে ঢাকায় এসেছিলেন মফস্বল থেকে। আধপেট জীবন তার সে বাসনা মিটিয়ে দেয়। ঘরে তার স্ত্রী। উনিও খুব বড় চাকরি করেন। আর ছেলেটা বিদেশে থেকে লেখাপড়া করে। স্বামী স্ত্রীর দেখা হয় খুব কদাচিৎ, হলেও সেটা বিছানায়। শফিকুল আজ একটা বিশেষ কারণে অফিস থেকে দুপুরেই বাসায় চলে এসেছেন। আজ তার ছাত্রীর রিমির জন্মদিন। রিমির বয়স ২২ কিংবা ২৩। বেশ রোমান্টিক, গালে একটা তিল আছে যা শফিকুল সাহেবকে মাঝে মাঝে সমাজের নৈতিকতা ভুলিয়ে দেয়। আবার ভাবে, ছি ছি এসব কী ভাবছি? রিমি মেয়েটা আট দশটা মেয়ের মত নয়! রেস্টুরেন্ট, পিৎজা, বার্গার এসব তার ভালো লাগে না। ভালো লাগে, স্বচ্ছ লেকের পানি, ফুচকা আর আলুর সিঙ্গারা, ভাঁপা পিঠা। শফিকুলের এর হাতে আর একঘণ্টা সময় আছে ঘর থেকে বেরুবার। একটা কবিতা লিখার চেষ্টা করছেন তিনি। কিন’ না হচ্ছে না। সেই কবে লিখতো। রিমির পছন্দের লিস্টটা শফিকুলের জানা তাই বাইরে থেকে অর্ডার করিয়ে পিঠা আনিয়েছেন।
একটা স্বচ্ছ পানির লেকের ধারে বিকেলে তারা বসে আছেন।
স্যার! একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
আমার কাছে তোমার অনুমতি লাগবে?
প্রেম করেছেন কখনো?
হা-হা-হা
আপনি হাসছেন!
হাসবোনা? করেছিলাম তোমার আন্টির সাথে। বিয়ের পর মাস দুয়েক পালিয়ে থাকতে হয়েছিল।
কেন স্যার?
এই মেয়ে তুমি দেখছি পেট থেকে সব কথা বের করিয়ে তবেই ছাড়বে।
ধরেছি যখন, বের করবই তো
স্নাতক শেষ করে প্রতিষ্ঠিত কবি হবার আশায় ঢাকায় আসি। এক ঘটনাচক্রে তোমার আন্টির সাথে পরিচয় তারপর প্রেম আর পরিণয়।
স্যার আপনাকে আন্টি খুব ভালবাসে, তাই না? একসাথে নিশ্চয় অনেকটা সময় কাটান?
বাদ দাও প্লিজ! আজকে উঠি চলো
এতো তাড়াতাড়ি কেন?
প্লিজ!
এখানে প্লিজ বলছেন ক্লাসে তো মুখটা বাংলার পাঁচ করে রাখেন।
হা-হা-হা, মানুষকে আসলে টিকতে হলে মুখোশ পরে থাকতে হয়।
আপনিও কি তাই?
শফিকুল বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন। এই মুহূর্তে মোবাইলটা বেজে উঠলো। রাত প্রায় সাড়ে দশটা।
স্যার! খেয়েছেন?
না!
এখনো খাননি!
না!
আন্টি নেই?
প্লিজ! তোমার আন্টি ছাড়া যে কোন বিষয়ে কথা বল।
আন্টি কি আপনাকে ভালোবাসে না?
প্লিজ! বাদ দাও তো।
স্যার আজকের দিনে প্লিজ কথাটা কতবার উচ্চারণ করেছেন মনে আছে?
হা-হা-হা
আমি বলছি এক্ষুনি খেয়ে নিন।
তা আর লাগবে না। সন্ধ্যায় একটা পার্টিতে গিয়েছিলাম। খানিকটা ড্রিঙ্ক করেছি। এখন আর মুড নেই।
কেন খান ওসব ছাইপাস?
জানো চারিদিকে এতো মেকি আনন্দে আমি আর নিজেকে খুঁজে পাই না! হাজারো ভিড়ে বড্ড একা লাগে!
মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে যায়। তিনি আকাশের চাঁদ দেখছেন। চাঁদের মতো তিনিও একা।রিমির প্রতি কোথায় যেন তার একটা নরম অনুভূতি কাজ করে প্রায় সময়। এ অনুভূতির নাম কি প্রেম? তা তো হতে পারে না। আবার নিজের কাছে প্রশ্ন ছুড়লেন, কেন হতে পারে না? মেকি সুখ থেকে পালিয়ে তিনি একটু ভালোবাসার তৃপ্তি চাইছেন, সুখ চাইছেন, তাও কি অন্যায়?

রাত প্রায় একটা বাজে। তার স্ত্রী শায়েলা বাড়ি ফিরেছেন।
তুমি এখনো ঘুমাওনি দেখছি।
বুয়া টেবিলে মুরগি রান্না করে রেখেছে খেয়ে নাও।
না বাইরে থেকে ডিনার করে এসেছি।
শায়েলা কোন কথা না বলে ফ্রেশ হয়ে এসে শুয়ে পড়ে। শফিকুলও আলো নিভিয়ে শুয়ে থাকেন কিন’ ঘুম আসে না। তিনি আদি কামনা থেকে স্ত্রীর শরীরে হাত দিতেই
ছাড়ো তো, ভাল লাগছে না এসব!
আচ্ছা আমরা যেটা করছি সেটা কি সংসার?
কথা না বাড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।
শফিকুল সারারাত ঘুমোতে পারল না। একটা সময় শায়েলা বলতো, তোমার সব দুঃখের সারাজীবনের সাথী আমি। আজ আর তা কই? দুজনের ব্যস্ততা দুজনকে দুই গ্রহে ঠেলে দিয়েছে। শায়েলার ঘুম ভাঙলে
তুমি ঘুমোওনি সারারাত?
না, চলো না আজ বাইরে থেকে ঘুরে আসি!
অফিসে একটা আর্জেন্ট মিটিং আছে।
ওহ্ আচ্ছা!
শফিকুল অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছেন, এমন সময় রিমির ফোন
স্যার চলেন না প্লিজ আজ একটু ঘুরে আসি!
না রিমি আজ তোমার ক্লাস আছে না?
জ্বি স্যার!
তাহলে আজ নয়।
শফিকুল সাহেবের পুরোটা যে রিমি দখল করেছে তা তিনি বেশ টের পাচ্ছেন। কিন’ ওই যে সমাজ! ভালবাসাকেও পরকীয়া নামে আখ্যায়িত করবে। শফিকুল সাহেব নিজেকে তাই নানা কাজে জড়িয়ে রাখেন। কিন’ দিন শেষে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরেন। রিমির সাথে অনেকটা দিন ঘুরতে যাওয়া হয় না। কথাও হয় না। রিমি ফোন তুলেই কান্না জুড়ে দিলো।
আপনি এই কয়টা দিন ফোন দেননি কেন?
পাগলি মেয়ে আগে কান্না থামাও! আগামীকাল ঘুরতে যাবে?
না স্যার!
শফিকুল রাগ করে লাইনটা কেটে দিয়ে মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে। শফিকুল সাহেব ভাবতে থাকেন, আমি যা করছি তা সঠিক তো? ও তো আমার ছাত্রী। তবে এসব কী হচ্ছে? নৈতিকভাবে আমি কি সঠিক? তার মনে হয় নৈতিক অনৈতিক বলে কিছু নেই। সব সমাজের সৃষ্টি। তবুও আমি বিবাহিত। এটা একটা বিরাট প্রশ্ন যে একজন বিবাহিত অর্ধবয়স্ক লোক একজন তরুণীর প্রেমে পড়েছে। তবে কি আমি ভুল? কিন’ ও যে আমার পুরোটা দখল করেছে। আমার প্রেম তো বিশুদ্ধ তবে কেন তা অন্যায় হবে? বয়স তো তারুণ্যকে বেঁধে রাখতে পারে না। সেটাই বা কজনে বুঝবে? আসলে “এভিরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার” নৈতিক অনৈতিক নিয়ে তিনি আর ভাবতে চান না। যা হবার তাই হবে। যা ঘটবার তাই ঘটবে। চিন্তার কিছু নেই। তবুও সমাজ বলে একটা ব্যাপার আছে। আবার ভাবেন হয়তো তিনি ভুল করছেন, কারণ এটা একটা বেমানান বিষয় শুধু তাই নয়। কেউ মানবে না এটা।
শায়লা আজ একটু তাড়াতাড়ি এলো, শফিকুল গম্ভীর গলায় বললেন, তোমার সাথে কিছু কথা আছে।
এখন না, আগামীকাল বলো, আমি খুব ক্লান্ত, সো প্লিজ সিনক্রিয়েট করো না।
আমি করছি?
করছোই তো! রাত বারোটা বাজে কোন দরকারি কথা থাকতে পারে না।
আমি শুধু জানতে চাইছি, আমরা যেটা করছি সেটা কি সংসার?
এসব বাজে কথা শোনার সময় নেই আমার।
এক ছাদের নিচে, একটা বিছানা শেয়ার করলেই কি স্বামী-স্ত্রী হয়?
শোন, বাঁচতে হলে টাকার দরকার। সোসাইটিতে টাকা লাগে।
কই আমাকে যখন প্রথম বিয়ে করেছিলে তখন তো একটা কলা আর পাউরুটি খেয়ে দিন কাটাতে। তখন তো বলোনি এসব।
ডোন্ট টক্ সাচ অ্যা স্টুপিড! সময়টা অনেক আগের।
সময়ের সাথে সাথে কি ভালোবাসার রংও পাল্টায়?
তোমার হলো টা কি?
কিছুই না! শুধু বলো এতটা বদলালে কীভাবে?
তুমি বদলাওনি? বাদ দাও! ঘুমিয়ে পড়ো।
শফিকুল সাহেব শুয়ে ভাবছেন, এভাবে চলা যায় না। নিজেকে তিনি যন্ত্র বানিয়ে ফেলেছেন। রিমিকে নিয়েই বাকি পথটা পাড়ি দেবেন।
সকালে উঠেই রিমিকে ফোন দিলেন শফিকুল
আজ ঘুরতে যাবে? আজ তোমাকে চমকে দেব।
যাব স্যার
স্যারের চমকটা তার জানা আছে। স্যারের প্রতি তার এক ধরনের অনুভূতি কাজ করে। স্যারের একাকীত্ব তাকে বেশ পোড়ায়। ইচ্ছে করে স্যারের হাতটা ধরে বলতে, ভালোবাসি। তা যে অসম্ভব। তবুও অসম্ভবকে সম্ভব করার ইচ্ছে তার প্রবল। কিন’ সমাজ! পরিবার, এরা? মেনে নেবে?
লেকের ধারে দুজনে বসে আছে।
স্যার কি যেন চমক দেবেন?
শফিকুল সংকোচ আর পাপী বোধ করছেন। যদি রিমি ভাবে, স্যার এত বাজে! নোংরা মনের মানুষ!
না রিমি আজ না,
আচ্ছা স্যার
রিমিকে রিক্সায় উঠিয়ে দিয়ে শফিকুল রাস্তা ধরে হাটতে থাকেন, ভাবেন হয়তো কখনো রিমিকে বলা হবে না তার একাকীত্বের যন্ত্রণা ঘোচাতে তাকে তার প্রয়োজন। আবারও সেই মেকি সংসারে একছাদ আর জীবন। কিংবা হয়তো রিমিকে নিয়েই সমাজের ধিক্কারকে দূরে ঠেলে সত্যি একদিন স্বপ্নের মেঘে ভাসবেন যার বৃষ্টিতে শীতল হবে তার একাকীত্বের দহন।