সিয়ামের মাস : অনুশীলন ও অর্জন

‘উসওয়ায়ে হাসানা’ ও ‘খুলুকে আযীম’র মূর্তরূপ, মুআল্লিমুল কুল, আল্লাহ্র রাসূল হুযুর পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হলেন বিশ্ব মানবতার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। যিনি ইরশাদ করেন, ‘প্রশংসনীয় চরিত্র সুষমার পূর্ণতা বিধানের জন্যই আমি প্রেরিত। তাই মানব জীবনের অপরিহার্য সুন্দর দিকগুলো উম্মতের আচরণে ফুটিয়ে তোলার সামগ্রিক আয়োজন তিনি সম্পন্ন করেছেন। নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন প্রশিক্ষিত প্রতিনিধি গোষ্ঠী সাহাবায়ে কেরাম ও আহলে বাইত। এ মহান লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতিটি ইবাদত-বন্দেগীর এমন সুন্দর প্রক্রিয়া প্রণালী বাতলে দিয়েছেন, যাতে তাঁর অনুসারী উম্মত শুধু ইবাদতই নয়, এর সাথে রপ্ত করবে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে আত্মনিবেদিত সুশৃঙ্খল মানব সম্পদ হবার গৌরব। এ লক্ষ্যে সর্বাধিক ফলপ্রসূ
পরিশুদ্ধিমূলক অনুশীলন ব্রত হল সিয়ামের সাধনা।
এক মাসের সিয়াম সাধনার অনুশীলনে যে সুকুমার বৃত্তিগুলোর বিকাশ ঘটে, এতে অর্জিত হতে পারে মানব চরিত্রের অনেকগুলো কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক দিক। সংক্ষিপ্ত আলোচনার জন্য কয়েকটি দিকে আলোকপাত করা যায়। ১মত: তাকওয়া। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার প্রধান উদ্দেশ্য হল তাকওয়া। ‘লাআল্লাকুম তাত্তাকুন’ বলে এ উদ্দেশ্য ব্যক্ত করা হয়েছে পবিত্র কুরআনে। (২:১৮৩) সচ্চরিত্র নিশ্চিত করার প্রধান মানদণ্ড এ তাকওয়া। যা ইখলাস ও নিষ্ঠা সহকারে সিয়াম আদায়ে অর্জিত হয়। মানুষের কর্ম ও উদ্দেশ্য অভিন্ন না হলে তা প্রতারণার শামিল। আমাদের কর্ম প্রকাশ্য; কিন’ উদ্দেশ্য অপ্রকাশ্য। এ দু’য়ের সমন্বয় ঘটাতে পারে শুধু তাকওয়া। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আল্লাহ্র ভয় অন্তরে জাগ্রত রাখাই তাকওয়া। তাকওয়াবান বান্দার ভেতর-বাহির এক, কথা ও কাজে থাকে না বৈপরীত্য। তাঁর প্রত্যেক কাজে আল্লাহ্র সন’ষ্টি ছাড়া অন্য উদ্দেশ্য থাকে না। জীবন চলার পথে তাকওয়াই উত্তম পাথেয়। এটা এ মাসের প্রধান অর্জন।
২য়ত: সময়ানুবর্তিতা। আল্লাহ তাআলা সুরা আসর’-এ সময়ের শপথ করেছেন। অন্য সব ইবাদতের মত সিয়ামও সময় সংশ্লিষ্ট। নির্দিষ্ট সময়ে সাহ্রী গ্রহণ করা, ইফতার করা, সময় বাঁধা রুটিনে কর্মসূচি সম্পাদনে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হয় এ মাসে। অনবধানতায় সুবহে সাদিকের পরে এবং সূর্যাস্তের পূর্বে কিছু খাওয়া হলে রোযার ক্বাযা দিতে হয়। তাই ঘড়ির কাঁটায় এত সতর্ক নজর অন্য সময়ে দেখা যায় না।
৩য়ত: আত্মনিয়ন্ত্রণ। সিয়াম শব্দের অর্থ আত্মপ্রবৃত্তিকে স্বভাবজাত আকর্ষণ থেকে বিরত রাখা। দমন করা। প্রবৃত্তির স্বাভাবিক চাহিদার মধ্যে যেগুলো বৈধ, হালাল, তা থেকে নিবৃত্ত থাকাই পরিভাষায় সিয়াম। দিনমান একটি নির্দিষ্ট সি’তিকাল হালাল আকর্ষণকে জয় করা, তার হাতছানিকে উপেক্ষা করার মধ্যে হয়ে থাকে আত্মসংযমের অনুশীলন। এর মধ্যে আত্মজয়ই শুধু নয়, বরং নির্লোভ জীবনযাপনের একটি শক্তি আত্মস’ হয়। যে নিজ চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, সে পরমুখাপেক্ষিতা থেকেও মুক্ত থাকতে পারে। যে কোন পরিসি’তি সহজে সয়ে যাবার আত্মগত শক্তি অর্জিত হয়। আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি থাকলে অনেক কিছুরই লাগাম টেনে ধরা যায়। যেমন, এতে লোভ-লালসা, ক্রোধ-ঈর্ষা, প্রতিশোধ প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসে। এমন মানুষই সমাজের অবক্ষয় এড়াতে প্রয়োজন। এদের সংখ্যা বাড়লে অপরাধবৃত্তিও হ্রাস পাওয়ার প্রত্যাশা বাড়বে। সিয়ামের পবিত্রতা রক্ষায় একজন রোযাদারকে রসনার যথেচ্ছ ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হয়। রাসূলে পাকের ইরশাদ, অনেক রোযাদার আছে যারা রোযা রেখে ক্ষুধা-তৃষ্ণার যন্ত্রণা ছাড়া কিছুই পায় না। অনেক নামাযী আছে যারা নামায থেকে রাত জাগার ক্লান্তি ছাড়া আর কিছুই পায়না। (মিশকাত) রসনা সংযত করেই মিথ্যা, গীবৎ, অশ্লীল কথা, ঝগড়া-কলহ থেকে বিরত থাকা যায়।
৪র্থত: ধৈর্য ও সংযম। আল্লাহ্ রাসূলের পরামর্শ হলো রোযাদার গায়ে পড়ে কলহ-বিবাদ তো করবে না; বরং কেউ যেচে ঝগড়া করলে এড়িয়ে গিয়ে বলবে, আমি এক রোযাদার বান্দা। ধৈর্যশীল ও সংযমী মানুষ সমাজের জন্য কখনো ক্ষতিকর হতে পারে না। এ গুণাগুণ মাহে রমযানে রপ্ত করার সুবর্ণ সুযোগ। তাই আল্লাহর রাসূল একে ‘শাহরুর সাবরি’ ধৈর্য্যের মাস বলেছেন।
৫মত: পরহিত বা পরার্থ বিবেচনা। রোযা রেখেই অভুক্ত ব্যক্তির কষ্ট বুঝতে পারে। সহানুভূতি, সহমর্মিতা অর্জনে সক্ষম হতে পারে রোযাদার। ইফতারের সময় কোন রোযাদারকে ইফতার করালে রোযার সমান সওয়াব মিলে। প্রাচুর্য-ঐশ্বর্য না থাকুক, আল্লাহ্র রাসূল বলেন, স্বল্প সামর্থ দিয়েও পরহিতের অনুশীলন করা যায়। একটি খেজুর, কিংবা এক ঢোক পানি দিয়ে ইফতার করালেও এ সওয়াব পাওয়া যাবে। নিজের প্রয়োজন ভুলে অন্য ভাইয়ের প্রয়োজন আত্মস’ করার শিক্ষা এ ইবাদতের মধ্য দিয়ে অর্জন করা যায়।