নতুন জামায় খুকির ঈদ

তুফান মাজহার খান

রমিজ মিয়া কাজে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হচ্ছিল। হঠাতই পেছন থেকে তার পাঁচ বছরের মেয়ে সায়মা এসে তার জামা টেনে ধরে। রমিজ মিয়া পেছনে ঘুরে বলে, কী হইছে মা? কিছু কইবা? সায়মা হ্যাঁ সূচক অর্থে মাথা নাড়ে। রমিজ বলে, আচ্ছা কও মা। সায়মা বলে, বাবা কাইলকা কি ঈদ? হ মা কাইলকা ঈদ, উত্তর দেয় রমিজ মিয়া। সায়মা একটু মুচকি হেসে বলে, আচ্ছা বাবা আমারে জামা কিনা দিবা না? রমিজ বলে, হ মা আইজকাই দিমু, তুমি থাকো আমি কাম থেইকা ফিরা আইসা তোমারে জামা কিনতে লইয়া যামু।
সায়মা খুশিতে লাফ দিয়ে ওঠে। রমিজ সায়মার মাথায় হাত বুলিয়ে বিদায় নেয়। সায়মা দৌড়ে ঘরে চলে যায়।
রমিজ মিয়া রিকশা চালায়। তার নিজের রিকশা নেই। মালেক চানের গ্যারেজ থেকে রিকশা ভাড়া নিয়ে চালায়। দৈনিক সন্ধ্যা বেলায় মালেক চানকে গুনে গুনে তিনশো টাকা বুঝিয়ে দিতে হয়। একটি টাকাও কম নিতে চায় না মালেক চান। তাই কষ্ট হলেও রমিজ মিয়া টাকাটা ঠিকঠাক মতোই দিয়ে দেয়। অন্য সব রিকশাওয়ালার সাথে মালেকের তেমন বনিবনা হয় না। ধমক দিয়ে দিয়ে টাকা আদায় করতে হয়। রমিজ মিয়া একটু আলাদা। সৎ আর খুব ঠান্ডা মেজাজী। তাই মালেক চানও রমিজ মিয়াকে একটু আলাদা চোখেই দেখে।
বেশ কিছুদিন ধরে রমিজ মিয়া খুব কষ্টে আছে। গত বৈশাখের ঝড়ে তার ঘর ভেঙে লন্ড-ভন্ড হয়ে যায়। নতুন করে ঘর তুলতে গিয়ে আবার বিশ হাজার টাকা ঋণ হয়ে যায়। সপ্তাহে এক হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয় তাকে। সেজন্য সংসার চালাতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে কিছুদিন ধরে। এখন ঈদও চলে এসেছে। খরচের চিন্তায় সে অসি’র হয়ে আছে। আবার এ সপ্তাহের কিস্তির টাকাটাও এখনো দেওয়া হয়নি। সেটাও আজই দিতে হবে। তা না হলে আবার জরিমানা হয়ে যাবে। রমিজ মিয়ার পকেটে আছে মাত্র ত্রিশ টাকা। আজকে কাজ করে সে কিভাবে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। রিকশার জমার টাকাই দিবে কিভাবে আর কিস্তির টাকাই বা পাবে কোথায়।
দৈনিক পাঁচ-ছয়শো টাকার কাজ করতে পারে সে। সেখান থেকে তিনশো টাকা রিকশার জমার টাকা দিয়ে যা থাকে সেখান থেকে কিস্তির টাকা রেখে তারপর বাকিটা দিয়ে কোনোরকম সংসারটা চালাতে হয় তাকে। ভালো-মন্দ খাওয়া হয় না অনেকদিন। কাল ঈদ, অন্তত কালকের দিনটার জন্য তো কিছু বাড়তি টাকার দরকার ছিল। আবার খুকির জন্য জামা, সেমাই-চিনিও কিনতে হবে। ভাবতে ভাবতে ঘেমে ওঠে রমিজ। কাঁধের গামছাটি দিয়ে হাত-মুখের ঘাম মুছে নেয় সে।
সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিকেল নাগাদ তার প্রায় আটশো টাকার মতো ইনকাম হয়। সে খুব খুশি। আজ ভালোই ইনকাম হলো। কিন’ এখনো তো কিস্তির টাকাই হলো না। এই ভেবে আবার মন খারাপ হয়ে যায় তার। মনে মনে ঠিক করলো থাক, জরিমানা হয় হোক, এ সপ্তাহে কিস্তির টাকাটা দিবে না সে। তাহলে রিকশার জমার টাকা দিয়েও যে টাকা থাকবে তা দিয়ে খুকির জামাও কেনা যাবে আর সেমাই-চিনিও।
রিকশাটা নিয়ে একটু সামনে যেতেই কিস্তির ম্যানেজারের সাথে দেখা। ভূত দেখার মতোই চমকে যায় রমিজ মিয়া। ম্যানেজার রমিজকে দেখেই বলে ওঠে, এই রমিজ মিয়া দাঁড়াও। রমিজ কিছু না বলে রিকশা থেকে নেমে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। ম্যানেজার বলে, কি রমিজ মিয়া আজ তো তোমার কিস্তি দেওয়ার লাস্ট ডেট ছিল। কই টাকা দাও নাই কেন? তোমাকে তো বাড়িতেও খুঁজে পাওয়া যায় না। রমিজ বলে, স্যার, এ সপ্তাহে টাকাটা আমি দিতে পারব না। সামনের সপ্তাহে দুই সপ্তাহের টাকা একসাথে দিমু স্যার। ম্যানেজার ধমকের সুরে বলে ওঠে, তামাশার কথা চলবে না। কালকে ঈদ। কত টাকা আছে বের কর। রমিজ কোনো কথা না বলে তার পকেটে থাকা আটশো টাকা বের করে ম্যানেজারের হাতে দেয়। ম্যানেজার বিরক্ত মুখে টাকাগুলো গুনে বলে, এখানে তো মাত্র আটশো টাকা আছে দেখছি। ঠিক আছে। বাকিটা আগামী সপ্তাহের কিস্তির টাকার সাথে দিয়ে দিও, যাও। রমিজ মিয়া রিকশায় প্যাডেল দিয়ে ম্যানেজারের আড়াল হতেই তার চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগলো। সে তো সবসময় ঠিকঠাক মতোই কিস্তির টাকা দিয়ে আসছে। তাহলে ম্যানেজার আজ এমন ব্যবহার করলো কেন? মেয়েটার জামা বোধ হয় কিনতে পারব না, ভাবলো রমিজ।
রাত দশটা নাগাদ কাজ করে তার পকেটে আসলো মাত্র দুইশো বিশ টাকা। অথচ রিকশার জমার টাকাই দিতে হবে তিনশো। আরও অনেকক্ষণ বসে থেকেও আর কোনো যাত্রী না পেয়ে রমিজ মিয়া গ্যারেজে চলে আসলো। মালেক চান রমিজ মিয়ার এতো দেরি দেখে বলে, কি রমিজ মিয়া ঈদের জন্য কি আইজ বেশি কাম করলা নাকি? পকেট গরম কইরা ফিরছো মনে হয়! রমিজ মিয়া মুখ ভার করে বলে, না মিয়া ভাই যে কয় টাকা কাম করছিলাম সব ম্যানেজার নিয়া গেছে। আপনার জমার টাকাও আইজ পুরা অয় নাই। মালেক মিয়া চিৎকার করে ওঠে, ধুর মিয়া, কী ফালতু কথা কও? বেশি কথা না কইয়া জমার টাকা বাইর কর। কাইল ঈদ। টাকা লাগব। রমিজ মিয়া এবার কেঁদেই ফেললো, মিয়া ভাই আমার পকেটে দুইশো টাকা আছে। মাইয়াডার লাইগা একটা জামা কিনতে অইব। অনেক আগ্রহ কইরা বইসা আছে মাইয়াডা। জামা না নিতে পারলে খুব কষ্ট পাইব। মালেক চান আবারও গর্জে ওঠে, আমি এত কথা বুঝি না। কত আছে তাই দেও। পরে বাকিডা দিয়া দিও। রং-ঢঙের ভাত নাই আমার কাছে। রমিজ মিয়া তার পকেটে থাকা দুইশো বিশ টাকা পুরোটাই মালেক চানের হাতে তুলে দেয়। কোনো কথা না বলে চোখ মুছতে মুছতে বের হয়ে যায় সে। মাঝরাতে বাড়ি ফিরে গেলে তার স্ত্রী দরজা খুলে দিয়ে বলে, কিগো আইজ এত দেরি কইরা আসলা? রমিজ বলে, কী করুম বউ? টাকা তো জোগাড় অইলো না। যে কয় টাকা কাম করছিলাম কিস্তির ম্যানেজার আর ওস্তাদে নিয়া গেছে। সায়মা কই? ঘুমাইছে?
রমিজের স্ত্রী বলে, হ জামার লাইগা অপেক্ষা করতে করতে শেষ পর্যন্ত ঘুমাইছে। রমিজ মিয়া মন খারাপ করে মেঝেতে বিছানো মাদুরটায় বসে পড়ে। রমিজের স্ত্রী বলে, চিন্তা কইরেন নাতো খুকীর বাপ। টাকা নাই তাই জামা আনতে পারেন নাই, এর জন্য মন খারাপ কইরা বইসা থাইকা লাভ কী? টাকা হইলে পরে দুইডা জামা কিনা দিয়েন। অহন ওঠেন, খাইয়া লন।
সকালে রমিজের স্ত্রী ঘর থেকে বের হতেই দেখে বারান্দায় মালেক চান বসা। হাতের কাছে ব্যাগভর্তি কিসব জিনিসপত্র। রমিজের স্ত্রী ডাকে, ও খুকির বাপ ওঠেন, দেখেন কে আসছে।
রমিজ মিয়া হন্ত-দন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। এসে মালেক চানকে দেখে তো পুরোই অবাক সে। রমিজ মিয়া বলে, মিয়া ভাই আপনি?
হ রমিজ মিয়া। এই লও তোমার খুকির ঈদের জামা আর এই লও সেমাই-চিনি, বললো মালেক চান।
রমিজ মিয়া থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
মালেক চান আবার বললো, কী হইলো মিয়া, লও।
রমিজ মিয়া মালেক চানের হাত থেকে এগুলো নিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো। আবেগে চোখের কোনে জলও এলো। মালেক চান জমির মিয়াকে ছেড়ে বললো, শোনো জমির মিয়া আমার এই দুনিয়ায় কেউ নাই। এই যে আমি ২০/২৫ টা রিকশা থেকে এত টাকা পাই এগুলো আমার খাওনের মানুষ নাই। আমি প্রতিদিন তোমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বিভিন্ন ফালতু জায়গায় নষ্ট করি। আমার জীবনে আমি কোনো ভালো কাজ করছি কিনা মনে নাই। তিন কুলে আমার কেউ নাই দেখে মেজাজটাও কেমন জানি হয়ে গেছে খিটখিটে। ভালো ব্যবহারও ভুলে গেছি। আমার কাছে ঈদের আনন্দ বলে কিছু নাই। তবে কাইল রাইতে তোমারে নিয়া ভাবলাম। তোমার চোখের জল আমার বিবেককে ধাক্কা দিল। পরে বুঝতে পারলাম যে তোমার সাথে এমন ব্যবহারটা করা উচিত অয় নাই। তাই আইজ তোমার জন্য সামান্য কিছুর ব্যবস’া করলাম।
তবে আইজ আমার মনে হইতেছে আমি অনেক বড় পুণ্যের কাজ করলাম।
রমিজ হাত দিয়ে চোখে আসা আবেগের জল মুছে। এত হৈ-হুল্লোড় শুনে সায়মারও ঘুম ভেঙে যায়। দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে সে। বাইরে আসতেই মালেক চান সায়মাকে কোলে তুলে নেয়। পরক্ষণে নতুন জামাটা সায়মার গায়ে জড়িয়ে দেন তিনি। সায়মা খুশিতে উঠানে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে। যেন স্বর্গীয় সুখে ভরে ওঠে রমিজ মিয়ার বাড়ি।