প্রতীক্ষা

নজরুল জাহান

দরোজার মুখেই তার সাথে দেখা। চোখ ফেরাতেই চোখে চোখ পড়লো। হাসির ঝলকটা দুয়েরই এক সঙ্গে ফুটলো। যেন একাপরের ভিতরের জিজ্ঞাসা দুজনেরই জানা ।
তবুও তো কাছাকাছি হওয়া । কেমন আছি ? দু’জনের একই প্রশ্ন। দুজনেরই উত্তর, হ্যাঁ, ভালো। তা কবে এলে ? সেও বলে, কবে এলে ? দুজনেরই হাসি। এইতো! এলাম। দুজনেরই আপসোস, সেই কবে দেখা হয়েছিল, আর আজ এই। সে দেখাদেখির কতো দিন হয়ে গেলো ? মনের একই ভাষ্য।
হবে তো! বয়সের কোন অংশ। এখানে, উজ্জ্বল সকালে ? কি করছ ? প্রথম জন বলে, তুমি কি করছ ? দ্বিতীয় জন বলে, তুমি ? উত্তর, হ্যাঁ আমরাই। তুমি, আমি। তুমি আমি একে অপরকে ভাবি। এ না হলে কি একে অপরকে জানা ! জানার সূত্র যেদিন হয়েছিল, সেদিনটি মনে আছে ? উত্তর, আছে কি নেই তুমি জানো আমি জানি।
সে দিনের পর থেকে কতো রূপ যে হেসেছি, কেঁদেছি আমরা! কী অনুভবের তন’ দ্বারা কী যে স্বপ্নের জালে জড়িয়েছি! দু’জন দুজনার এপাশ ওপাশ জড়িয়ে ফেলেছি। যেন কার্পাস তুলর ওপর এক মুঠো রৌদ্রের খেলাই জমে উঠেছিল। ছুঁতে চাইলেও, ছুঁতে গিয়ে ভয় লাগতো। ধুত্তুরি, ছুইলে কি হয়, না ছুইলে না জানি কি হয় ? এমনই দ্বিধার, হ্যাঁ, না। এ ভাবেই গেলো কিছু দিন ক্ষয়ে বয়ে ।
শিমের মাচা, পুঁইয়ের মাচা, লাউয়ের মাচা, এরকম কতো যে মাচার তল ছেয়ে ফেললাম! মান্দার তলার মান্দার ফুলও লবণ মরিচে এক করলাম। তেল পানির মিশামিশির কী যে গল্পও ফাঁদলাম! এক শেষ হলো, সে সব। ষোলো, কুড়িতে। কেউ বলল, থাক। ওসবতে কাজ নেই। কেউ বলল, একদমই জ্বালা।
বলল, চাইস রে, জ্বলতে জ্বলতে ভশ্ম হয়ে না যাইস। ডাল ভাঙানোর ঘূর্ণির নিচে ঘুরপাক খাবি কিন’! শেষমেশ পাউডার হয়ে ফুর ফুর বাতাসে উইড়বি। বাড়তি বলে, তোদের সাধ কি বলতো ? লাগে বুঝি, আমাদের জোড়া করে দেবে নিজেদের বিলিয়ে। আসলে ঐরানকাণ্ডতো সমাজে। অস্বীকারের যতো দল পাকানো। বাড়তি বলে, না বলে চাস না কি বলে চাস ? না বলে চাইলে তো পিঠ মোড়া খাবি, বলে চাইলে সামপ্রদায়িকে পড়বি, কোনটা চাইবি বল ?
ফের ওদের দুজনের সে হাসি । যে দরোজার গোরে দেখা দিয়েছিল। খানিক আগেও যা ছিল বর্তমান। এখন তা-ই অতীত। আর সেটিই তো কবরস্ত বা শ্মশানস’ হয়েছে সেই কবে! এখনকার রঙের খবর আর তখনকার রঙের খবর একই তো হবে দুদিন পরেও। মরার খবর জিন্দার জীবনে সুখ ও দুঃখের কথা।
কী হবে আর তেলেসমাতির ফোর কালার করা ?
সেই সন্ধ্যা ! তুমি মৃৎশিল্পের শিল্পী।
সেই ছোট্ট দুটো দূর্বা লতার মতো হাত তোমার, কি লক্ষ্যে যে ছুটতো, মাটির খামিরার ওপর! গোলগাল তোমারই মতো অবয়ব গড়ে তুলতে তুমি। আমি বলতাম, এটা কি গড়ছ ? তুমি বুঝি হেঁয়ালি কণ্ঠে বলতে, এই-ই তুমি! আমি বলতাম ধ্যেত! এ তোমার দুষ্টামি। তুমি বলতে, তুমি পার না আমাকে গড়তে ? আমি বললাম, না। তুমি বললে, আমি তোমাকে মনে এঁকেছি বলে, শিল্পে গড়ছি। আরও বললে, তবে কি আমাকে তুমি, মনে গড় নি!! আমি হ্যাঁ, না, কিছুই না বলে বলেছিলাম, চল নদীর চরের বালুতে নাম লেখালিখি খেলি গে ।
আজ সেই নাম আর নেই। কতো বর্ষ, যুগ পার হয়ে গেছে । নিত্য ডুবন্ত সূর্যের সাথে বিলীন হয়ে গেছে । প্রথম জন বলল, হ্যাঁ, তা ঠিক বলেছো। আমিত সেই বিলীন হওয়া থেকে উঠে এসেছি। এ কথার উত্তরে দ্বিতীয় জন বলল, আমিও তো সেকথাই বলছি ।
তার পর যেন কি হয়েছিল ? প্রথম জন বলল, যুদ্ধ ! যুদ্ধই তো আমাদের অস্তমিত করে দিলো । যাকে বলে অতীতান্তলোকে ফেলে দিলো । হ্যাঁ, আমি তো সেখান থেকেই এই দীপ্তময় নতুন সূর্যের সাথে তোমার এখানে ফিরে এলাম। দ্বিতীয় জন বলল, আরে ! আমিও কি তা নয়? তবে সেই যুদ্ধ আমাকে যোদ্ধা করেছিল, আর তোমাকে ? প্রথম জন উত্তরে বলল, নিশ্চিত পুরের আশ্রিতা হয়েছিলাম। দ্বিতীয় জন বলল, আমি কিন’ বুলেট বাহিত হয়ে শত্রু ছাউনিতে ক্রলিং করে ঢুকেছিলাম। শত্রুবিধ্বংসী নেশায় তোমাকেও ভুলে ছিলাম।
‘ আর আমি শুধু সন্যাসে তপঃস্বপ্নে ছিলাম, হাতে বয়ে আসছো বিজয় পতাকা বলল প্রথম জন। বলল আরো, তবে তোমাকে পাবার বাসনা একবারও জাগেনি। জেগেছে কেবলই, মানচিত্র আঁকা স্বাধীন বাংলাদেশের ছবি, যেখানে তোমাকে পেতে ফিরে আসবো । প্রথম জনের উক্তি শুনে দ্বিতীয় জন উল্লিসিত হয়ে বলল, তা ঠিকই বলেছ, স্বাধীন সার্বভৌম দেশেই তোমাকে ভালোবাসতে চেয়ে ছিলাম।
বার বার পরাধীন হয়ে যাওয়া তোমার, আমার মোটেই সহ্য হতো না। এ জন্যেই তো, তোমার মৃৎশিল্প গড়ার সময় বলেছিলাম, না! তোমার ছবি আমার মনের কাঁচে আঁকি নি।
প্রথম জন একটু কেঁদো কণ্ঠে বলল, তবুও কী হলো ? দ্বিতীয় জন উৎসাহে বলল, তুমি যে আজকের দিনটির জন্যে অপেক্ষা করেছিলে, আমি সেই একই দিনের জন্যে অপেক্ষায় ছিলাম ।
সূর্যের থির আকাশে লালাভা দেখে-

প্রথম জন-তবে চলো যাই ?
দ্বিতীয় জন-হ্যা, চলো ।