কবিয়াল মনিন্দ্র দাস ও তাঁর দুষ্প্রাপ্য রচনা

শামসুল আরেফীনের

প্রভাংশু ত্রিপুরা কবিয়াল মনিন্দ্র দাসকে জানার ও বোঝার জন্য ‘কবিয়াল মনিন্দ্র দাস ও তাঁর দুষ্প্রাপ্য রচনা’ গ্রন’টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূূর্ণ উল্লেখ করে বলেছেন, “শামসুল আরেফীনের সংগ্রহ ও সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘কবিয়াল মনিন্দ্র দাস ও তাঁর দুষ্প্রাপ্য রচনা’ গ্রন’টি মনিন্দ্র দাস ও তাঁর রচনাকে বিস্মৃতির অতল থেকে ফিরিয়ে আনার প্রথম উদ্যোগ এবং চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের কবিগানের ইতিহাস পুনঃনির্মাণে অনেকে অজানা তথ্য ও চিন্তার সম্মিলন। লোকগবেষণায়ও গ্রন’টি অমূল্য সংযোজন।” গ্রন’টির প্রকাশক এবং চট্টগ্রামের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক জামাল উদ্দিন গ্রন’টি সম্পর্কে বলেছেন, ‘কবিয়াল মনিন্দ্র দাস ও তাঁর দুষ্প্রাপ্য রচনা’ গ্রন’টির মাধ্যমে কবিয়াল মনিন্দ্র দাস ও তাঁর রচনাকে বিস্মৃতি বা বিলুপ্তি থেকে উদ্ধার করে লোকগবেষক ও কবি শামসুল আরেফীন এপার-ওপার বঙ্গের লোকগবেষণায় বিরাট অবদান রাখলেন।

বাংলাদেশের খ্যাতনামা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের বলাকা প্রকাশন থেকে লোকগবেষক ও কবি শামসুল আরেফীনের সংগ্রহ ও সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘কবিয়াল মনিন্দ্র দাস ও তাঁর দুষ্প্রাপ্য রচনা’। এপার-ওপার বঙ্গে বিশ শতকের খ্যাতিমান কবিয়াল মনিন্দ্র দাসকে নিয়ে এ বছরের (২০১৮) মার্চ মাসে প্রকাশিত গ্রন’টি প্রকাশের সাথে সাথে ফোকলোর গবেষক, বোদ্ধা পাঠক ও সুধীমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত লেখক ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস বিষয়ক গবেষক প্রভাংশু ত্রিপুরা ‘বাংলাদেশের কবিগানের ইতিহাসে গ্রন’টি অমর হয়ে থাকবে’ মন্তব্য করে গ্রন’টির আলোকে কবিয়াল মনিন্দ্র দাস সম্পর্কে বলেছেন, “উভয় বঙ্গে উদ্ভবকাল থেকে পৌরাণিক বিষয়-আশয়ে কবিগান হতো, তাতে যুক্ত থাকতো অশ্লীলতা, বিকৃত রুচি ও গালি। ফলে ঢাকা-নরসিংদীর হরিচরণ আচার্য (১৮৬১-১৯৪১) কবিগানে শুদ্ধি, শালীনতা ও সৌন্দর্য আনয়নে সচেষ্ট হন। এই হরিচরণ আচার্যের শেষ সময়ে অর্থাৎ বিশ শতকের প্রথমে কবিয়াল করিম বখশের শিষ্য হিসেবে চট্টগ্রামের কবিগানে মনিন্দ্র দাসের আবির্ভাব। কবিগানে তাঁর আবির্ভাবের পূর্বে কলকাতায় তিনি ব্রিটিশবিরোধী গ্রন’ রচনা করেন। গ্রন’গুলো অন্যদের নামে ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলে তাঁদের জেল হয়। সূর্য সেনের সাথে চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার অপারেশনে জড়িত ছিলেন সন্দেহে তিনিও কলকাতায় গ্রেপ্তার হয়ে রাজবন্দি হিসেবে কারাভোগ করেন। চারু মজুমদারের সাথেও ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী হিসেবে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
কবিগানের চর্চায় এসব ঘটনা মনিন্দ্র দাসকে দারুণ প্রভাবিত করেছিল। তার প্রমাণ পাওয়া যায় চল্লিশ দশকে যখন রমেশ শীল তাঁর শিষ্য-সহচর, কমিউনিস্ট পার্টি চট্টগ্রামের নেতা-কর্মী ও অন্যান্য কবিয়ালদের নিয়ে কবিগানকে একেবারে অশ্লীলতা, গালি ও বিকৃত রুচি মুক্ত করে পৌরাণিক ও কাল্পনিক বিষয় থেকে মাটিতে নামিয়ে আনার কাজে যুক্ত হন। মনিন্দ্র দাস এসময় রমেশ শীলের অন্যতম সহযোগী ছিলেন। ১৯৩৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টিকে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে বঙ্কিম সেন চট্টলেশ, গীরিজা শঙ্কর ও কলিম শরাফী প্রমুখের উদ্যোগে চট্টগ্রামের জে এম সেন হলে ‘কবিয়াল সম্মেলন’ আয়োজিত হলে তিনি তাতেও অংশ নেন। এই সম্মেলনে রমেশ শীলের বিকল্প হিসেবে মনিন্দ্র দাস সিলেটের কবিয়াল ফণীদাস বিএ-র সাথে কবির লড়াই করে তাঁকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন।
১৯৫২ সালে ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে ভাষা স’পতি অধ্যক্ষ আবুল কাসেমের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘কঠিন বাংলা ভাষা বনাম সহজ বাংলা ভাষা’ শীর্ষক কবির লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে সহজ বাংলা ভাষা চর্চার পক্ষেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই লড়াইয়ে সারাদেশ থেকে আগত প্রায় আড়াইশ কবিয়ালের মধ্যে বিজয় লাভ করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ থেকে স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হন। ১৯৬৭ সালেও তিনি একই স’ানে একই বিষয়ে লড়াই করে স্বর্ণপদক জেতেন।”
প্রভাংশু ত্রিপুরা আরও বলেছেন, “কবিয়াল মনিন্দ্র দাস জীবনের শেষ পর্যায়ে মোহনানন্দ অবধূত পরমহংস নাম ধারণ করে আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন হয়ে মোহনানন্দ ভণিতায় আধ্যাত্মিক ভাবধারার অনেক গান-কবিতা রচনা করেন। তবে দুঃখের বিষয় হলো, ২০০০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর থেকে তাঁর রচনা-সহ তিনি ক্রমশ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে থাকেন।”
প্রভাংশু ত্রিপুরা কবিয়াল মনিন্দ্র দাসকে জানার ও বোঝার জন্য ‘কবিয়াল মনিন্দ্র দাস ও তাঁর দুষ্প্রাপ্য রচনা’ গ্রন’টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূূর্ণ উল্লেখ করে বলেছেন, “শামসুল আরেফীনের সংগ্রহ ও সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘কবিয়াল মনিন্দ্র দাস ও তাঁর দুষ্প্রাপ্য রচনা’ গ্রন’টি মনিন্দ্র দাস ও তাঁর রচনাকে বিস্মৃতির অতল থেকে ফিরিয়ে আনার প্রথম উদ্যোগ এবং চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের কবিগানের ইতিহাস পুনঃনির্মাণে অনেকে অজানা তথ্য ও চিন্তার সম্মিলন। লোকগবেষণায়ও গ্রন’টি অমূল্য সংযোজন।”
গ্রন’টির প্রকাশক এবং চট্টগ্রামের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক জামাল উদ্দিন গ্রন’টি সম্পর্কে বলেছেন, ‘কবিয়াল মনিন্দ্র দাস ও তাঁর দুষ্প্রাপ্য রচনা’ গ্রন’টির মাধ্যমে কবিয়াল মনিন্দ্র দাস ও তাঁর রচনাকে বিস্মৃতি বা বিলুপ্তি থেকে উদ্ধার করে লোকগবেষক ও কবি শামসুল আরেফীন এপার-ওপার বঙ্গের লোকগবেষণায় বিরাট অবদান রাখলেন।
উল্লেখ্য, শামসুল আরেফীন দীর্ঘকাল ধরে লোকগবেষক হিসেবে এপার-ওপার বাংলার সাহিত্যাঙ্গনে বেশ পরিচিত। তিনি লোক ও অন্যান্য বিষয়ে চট্টগ্রামের বলাকা প্রকাশন থেকে অনেকগুলো গ্রন’ প্রকাশ করেছেন। ‘কবিয়াল মনিন্দ্র দাস ও তাঁর দুষ্প্রাপ্য রচনা’ ছাড়া তাঁর অন্য ১৩ টি গ্রনে’র নাম: আস্কর আলী পণ্ডিত: একটি বিলুপ্ত অধ্যায় (ফেব্রুয়ারি ২০০৬, পৃষ্ঠাসংখ্যা ১১২), বাংলাদেশের লোককবি ও লোকসাহিত্য ১ম খণ্ড (ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃষ্ঠাসংখ্যা ১২৮), বাঙলাদেশের লোককবি ও লোকসাহিত্য ২য়-৪র্থ খণ্ড (জানুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠাসংখ্যা ২৪০), আস্কর আলী পণ্ডিতের দুর্লভ পুথি জ্ঞানচৌতিসা ও পঞ্চসতী প্যারজান (সংগ্রহ ও সম্পাদনা; ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠাসংখ্যা ২৮০), বাংলাদেশের বিস্মৃতপ্রায় লোকসঙ্গীত ১ম খণ্ড (সংগ্রহ ও সম্পাদনা; ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠাসংখ্যা ৪৩২), বাঁশরিয়া বাজাও বাঁশি (পল্লীগানের গ্রন’; ২০১২ সালে ‘বাংলাদেশের বিস্মৃতপ্রায় লোকসঙ্গীত ১ম খণ্ড’ গ্রন’ভুক্তির মাধ্যমে প্রকাশিত), আস্কর আলী পণ্ডিত: ৮৬বছর পর (সংগ্রহ ও সম্পাদনা; ফেব্রুয়ারি ২০১৩, পৃষ্ঠাসংখ্যা ১৬০), গাঙ্গেয় বদ্বীপের অনন্য সঙ্গীতজ্ঞ: স্বপন কুমার দাশ(সম্পাদনা; সরগম একাডেমি, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠাসংখ্যা ৩২), আঠারো শতকের কবি আলী রজা ওরফে কানুফকির (ফেব্রুয়ারি ২০১৭, পৃষ্ঠাসংখ্যা ১২০), আহমদ ছফার অন্দরমহল (ফেব্রুয়ারি ২০০৪, পৃষ্ঠাসংখ্যা ১৪৪), রুবাইয়াত-ই-আরেফীন (কাব্য, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠাসংখ্যা ৬৪), বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার দুর্লভ দলিল (ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠাসংখ্যা ১২০) এবং সূর্য-পুত্র (কাব্য, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, পৃষ্ঠাসংখ্যা ৬৪) প্রভৃতি। শামসুল আরেফীনের এসব গ্রন’ বা তাঁর দীর্ঘদিনের লোকগবেষণা নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে অনেকবার অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি টিভি চ্যানেল ‘মাছরাঙা’ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত পূর্ণ এক ঘণ্টাব্যাপী এই লোকগবেষণা নিয়ে চ্যানেলটির ব্যাপক জনপ্রিয় ‘রাঙাসকাল’ নামক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেছে। এশিয়ান টিভিও এই লোকগবেষণা নিয়ে সম্প্রচার করেছে একটি অনুষ্ঠান।