ছবির শহর

নিউ ইয়র্কের ক্লদ মোনে

ইফতেখারুল ইসলাম

সারা বছর তারা নানারকম প্রদর্শনী দিয়ে শিল্পকলার দর্শককে আকৃষ্ট করে। সেই ভাবেই ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে তারা শুরু করে ক্লদ মোনের ওপর ওয়াটারলিলি শিরোনামের একটা বিশেষ প্রদর্শনী। শুধুমাত্র মোনের জলপদ্ম সিরিজের ছবি নিয়ে এই আয়োজন। পরের বছর অর্থাৎ ২০১০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মোট আট মাস ধরে চলেছে প্রদর্শনী। মোমা-র নিজের সংগ্রহে থাকা চারটি বিশাল প্যানেল আকৃতির ছবি এখানে স’ান পেয়েছে। এগুলো সবই মোনের জীবনের শেষ পর্বের কাজ। মোটামুটি ১৯১৪ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত কালপর্বে আঁকা। জলপদ্ম, পদ্মপুকুর, জাপানি সাঁকো, আর আগাপ্যান’াস গাছকে বিষয়বস’করে আঁকা এই চারটি ছবি।

বেশ কিছুদিন সংস্কার কাজের জন্য বন্ধ থাকার পর ম্যানহাটনের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট বা মোমা আবার তার দ্বার খুলে দিল ২০০৪ সালে। এরপর কয়েকবার এই মিউজিয়ামের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখার সুযোগ হয় আমার। কিন’ মজার ব্যাপার হলো আমাকে কুড়ি ডলার (এখন ২৫ ডলার) দিয়ে টিকেট কিনে ঢুকতে হয়নি। কারণ আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র সুজয়। সে তখন নিউ ইয়র্কের একটি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কে উচ্চপদে কাজ করে। মরগ্যান স্ট্যানলি, মেরিল-লিঞ্চ, বার্কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান মোমা, মেট এবং অন্যান্য প্রধান মিউজিয়ামের স্পন্সর বলে ওদের কর্মকর্তা এবং অতিথিদের বিনামূল্যে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রবেশ টিকেট দেওয়া হয়। এই সুবিধে সব দেশেই থাকে। কিন’ প্যারিস বা ইউরোপের অন্য কোনো শহরে আমার পক্ষে সেটা পাওয়ার সুযোগ হয়নি।
বিখ্যাত ও জনপ্রিয় ইউরোপীয় শিল্পীদের বেশ কিছু ছবির সমৃদ্ধ সংগ্রহের কারণে নিউ ইয়র্কের এই মোমা খুবই বিখ্যাত। গত শতাব্দীর প্রথম দিকের বিশিষ্ট শিল্পীদের ছবির সংগ্রহ দিয়ে শুরু হয় তাদের আধুনিক চিত্রকলার প্রদর্শনী। ১৮৮০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত কালপর্বের ছবির এই বিশাল সংগ্রহ আছে তাদের ভবনের পঞ্চম তলায়। এখানে সে-কালের প্রত্যেক শিল্পীর নিজস্ব শৈলী এবং তাঁদের সমকালীন শিল্পরীতি ও শিল্প-আন্দোলনের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী কালানুক্রমিকভাবে সাজানো রয়েছে ছবি। ক্লদ মোনের জলপদ্মের ছবি যেমন আছে তেমনি আছে ভ্যান গগের বিখ্যাত তারাভরা রাতের আকাশ, স্টারি নাইট। আছে পিকাসো ও মাতিসের চমৎকার সংগ্রহ।
সারা বছর তারা নানারকম প্রদর্শনী দিয়ে শিল্পকলার দর্শককে আকৃষ্ট করে। সেই ভাবেই ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে তারা শুরু করে ক্লদ মোনের ওপর ওয়াটারলিলি শিরোনামের একটা বিশেষ প্রদর্শনী। শুধুমাত্র মোনের জলপদ্ম সিরিজের ছবি নিয়ে এই আয়োজন। পরের বছর অর্থাৎ ২০১০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মোট আট মাস ধরে চলেছে প্রদর্শনী। মোমা-র নিজের সংগ্রহে থাকা চারটি বিশাল প্যানেল আকৃতির ছবি এখানে স’ান পেয়েছে। এগুলো সবই মোনের জীবনের শেষ পর্বের কাজ। মোটামুটি ১৯১৪ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত কালপর্বে আঁকা। জলপদ্ম, পদ্মপুকুর, জাপানি সাঁকো, আর আগাপ্যান’াস গাছকে বিষয়বস’করে আঁকা এই চারটি ছবি।
পদ্মপুকুর আর তার ওপর তৈরি জাপানি সাঁকো মোনের অনেক ছবিতে আগেই দেখেছি। কিন’ এখানকার এই ছবিগুলো রং ও শিল্পশৈলীর দিক থেকে অনেকটা অন্যরকম। শিল্পীর আগের কাজগুলো না দেখা থাকলে এগুলোকে অনেকটা বিমূর্ত কম্পোজিশন বলে মনে হবে। আর যাঁরা আগের পর্বে আঁকা পদ্মপুকুর আর কাঠের সাঁকোর ছবিগুলো দেখেছেন অথবা জিভার্নি গ্রামে ক্লদ মোনের বাড়ি, বাগান, জলাশয় ও সবুজ রঙের কাঠের সাঁকোটি দেখেছেন তাঁদের চোখে এখানকার ছবিগুলো মনে হবে অচেনা ও নতুন। রেখা ও অবয়ব হারিয়ে গেছে। মিলে-মিশে গেছে বৃক্ষ, লতা-গুল্ম, জলাশয় আর কাঠের ফ্রেম। এই ছবিতে সাঁকো যে কোথায় সেটা রীতিমত খুঁজে বের করতে হয়। এরকম উজ্জ্বল হলুদ, লাল ও কমলা রং আর তাদের এরকম প্রজ্বলিত রূপ আগে ক্লদ মোনের ছবিতে দেখা যায়নি। প্রকৃতির একটি দৃশ্য দেখার পর শিল্পী যে তাঁর মনের ভেতর থেকে তাকে নতুনভাবে সৃজন করেন সেটা এই ছবি দেখলে বোঝা যায়।
এই ছবিগুলোর সঙ্গে প্রদর্শনের জন্য মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট থেকে ধার করে আনা হয় সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আরো দুটো ছবি। একটা জলপদ্ম আর অন্যটি পুকুরের পানিতে উইপিং উইলো-র প্রতিফলন। অর্থাৎ প্রত্যেকটি ছবিই প্যারিস থেকে অনতিদূরে জিভার্নি গ্রামে ক্লদ মোনের তৈরি বাগান ও জলাশয়ের ছবি। পরিচিত দৃশ্যের পুনর্সৃজন।
জিভার্নিতে কীভাবে ক্লদ মোনে তাঁর ছবির গ্রামটি গড়ে তুলেছিলেন সে গল্প অন্যত্র বলা হয়েছে। সেখানে তাঁর নিজের থাকার জন্য বাড়ি, ছবি আঁকার স্টুডিও আর বিশাল ফুল-বাগান তৈরি করেন মোনে। পরে আরো জমি কিনে সেখানে জাপানি শৈলীতে তৈরি করা হয় পদ্মপুকুর আর সবুজ রঙের কাঠের সাঁকো। জীবনের শেষ পঁচিশ বছর ধরে এই পদ্মপুকুর আর তার আশেপাশের প্রকৃতির দৃশ্যই বারবার এঁকেছেন ক্লদ মোনে। এঁকেছেন নানা ঋতু আর দিনের বিভিন্ন সময়ের নিয়ত বদলে যাওয়া আলোয়।
এমনকি ক্যাটারাক্ট-এর কারণে নিজের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া আর বর্ণ-বিভ্রম ঘটার পরেও তিনি এঁকেছেন প্রকৃতির দৃশ্যাবলী।
মোনের মৃত্যুর পর জিভার্নির স্টুডিওতে এ ধরনের অনেকগুলো ছবি পড়ে ছিল। সেগুলো শিল্পীর ছেলের তত্ত্বাবধানে রয়ে যায়। ততোদিনে ক্লদ মোনের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে। কিন’ মৃত্যুর পরের দুই দশক ধরে শিল্পরসিকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মোনের আরও আগের, বিশেষত ইমপ্রেশনিস্ট পর্যায়ের চিত্রকলা। জিভার্নির পদ্মপুকুরের ছবিগুলোর কথা সকলেরই জানা ছিল। কিন’ ১৯১০ ও ১৯২০ দশকের যে ছবিগুলো স্টুডিওতে রয়ে যায় তাদের যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এগুলোকে কিছুটা অসংবদ্ধ ও অনেকাংশে অসমাপ্ত কাজ বলেই গণ্য করা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শিল্পকলা বিষয়ে ঘটে যায় কিছু আকস্মিক বাঁক পরিবর্তন। এ সময়ে ক্লদ মোনের শেষ জীবনের ছবিগুলোর ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। সমকালীন চিত্রকলার ধারা এবং নতুন শৈলীর আলোয় অতীতের চিত্রকলাকে পুনরাবিষ্কার করার সূচনা হয়। বিমূর্ত এক্সপ্রেশনিজম-এর আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে মোনের বিশাল আকারের প্যানেল ছবিগুলো।
এই আগ্রহ ও আলোচনা যখন তুঙ্গে তখনই (১৯৫৫ সালে) নিউ ইয়র্কের মোমা মোনের জলপদ্ম সিরিজের একটি বড় ছবি কিনে নেয়। আমেরিকার কোনো মিউজিয়ামে মোনের ওই ধরনের ছবি সেটাই প্রথম। সমকালীন এবং আধুনিক চিত্রকলায় এই ছবির গুরুত্বের কারণে আর দর্শকদের আগ্রহ ও ভালোবাসায় ক্লদ মোনে হয়ে ওঠেন মোমা-র অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। প্রায় শতবর্ষ আগে আঁকা এই ছবিগুলোর ব্যাপারে নতুন প্রজন্মের দর্শকের ক্রমশ বেড়ে চলা আগ্রহ বিবেচনা করেই আয়োজন করা হয় ২০০৯-১০ এর এই বিশেষ প্রদর্শনী।
ভাবলে অবাক লাগে, একজন শিল্পী সারা পৃথিবীর শিল্প-প্রেমীদের কাছে কতোটা প্রিয় হলে এবং তার শিল্পী-জীবনের একটি কালপর্ব কতোটা তাৎপর্যপূর্ণ হলে দেশে বিদেশে এরকম বিশেষ প্রদর্শনী হয় ! শুধু তাই নয়। মাত্র ছয়টি ছবি নিয়ে এই প্রদর্শনী আট মাস ধরে চলেছে নিউ ইয়র্কের মোমাতে। আর প্রতিদিন সেই ছবিগুলো দেখেছেন অসংখ্য আমেরিকান দর্শক আর অন্যান্য দেশ থেকে বেড়াতে আসা মানুষ।