নিখুঁত কৌশল ও প্রাকৃতিক সরলীকরণ

আজিজুল কদির
55

বস’ময় প্রকৃতি জগৎকে দেখেছেন নিজের চোখ দিয়ে দেখেছেন শিল্পী সামিনা করিম । এ যেন অনুভূতির এক ভিন্ন বিশ্ব। যেখানে বস’ ও দেহের অবয়বে সঞ্চার হয়েছে নতুন ভাবের। এ যেন এক মাটির কাব্যগাঁথা ।
গত ৫-১২ মে চট্টগ্রাম আলিয়ঁস ফ্রসেঁজ গ্যালারিতে সম্পন্ন হয় শিল্পী সামিনা এম করিমের ভাস্কর্য প্রদর্শনী। আটদিনব্যাপী উক্ত প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন খ্যাতিমান ভাস্কর অলক রায়। চট্টগ্রাম আলিয়ঁস ফ্রসেঁজ এর স্বল্প পরিসরে ভাস্কর সামিনার ১১টি ভাস্কর্য প্রদর্শিত হচ্ছে নিখুঁত কৌশল ও প্রাকৃতিক সরলীকরণে ।
সামিনার এই প্রদর্শনীটি নানা কারণেই দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল। তাঁর ভাস্কর্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর সরল সৌন্দর্য। বাইরের অবয়ব ভীষণভাবে টেনে রাখে দর্শককে। যা চোখ ফেরানো যায় না, অনেকটা সেই রকম। তবে এই সরল সৌন্দর্যের পাশাপাশি আছে অন্য এক স্তরও। তাঁর ভাস্কর্যগুলো যেন নারী,জীবন ও প্রকৃতি সম্পর্কে এক নতুন ভাষা হাজির করে। আর সেটাই সম্ভবত সামিনার অবচেতন মনের কথা। মূলত শিল্প তাই, যা মানুষকে ভাবতে এবং সৌন্দর্য উপলব্ধি করাতে বাধ্য করে। কোনো কোনো ভাস্কর্য রয়েছে যার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে চমকে উঠতে হয়। এই চমকানোটাই প্রকৃত শিল্পের ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশের ভাস্কর্যচর্চা প্রথাবদ্ধতায় আবদ্ধ ছিল এতদিন। আর তা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই সামিনার ভাস্কর্যগুলো দেখে যেন তাই প্রতিয়মান হলো।
মানবদেহ সামিনার অন্যতম আলোচ্য বিষয়। দেহের ভঙ্গি নয়, বরং ভাবের ভাস্কর্য করেছেন তিনি। পাশাপাশি মানুষ যে জড় ও জীবজগতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেই আবিষ্কারও আছে। ‘মাদার এন্ড হার অয়স্টেয়ার স্পেস’ শিরোনামের ভাস্কর্যটির উদাহরণ টানলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। দর্শক প্রথমে দেখে ভাববেন, এ বুঝি কুড়িয়ে আনা কোনো পাথরের খন্ড। কিন’ ভালো করে লক্ষ্য করলে এর ভেতরে নিবিড় বাহুবন্ধনে থাকা অন্য একটা দেহ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জড় প্রতিরূপের ভেতরে এভাবেই তো শিল্পীরা জগৎকে আবিষ্কার করেছেন যুগ যুগ ধরে। সামিনাও তার ব্যতিক্রম নন। পুরো গ্যালারি জুড়ে লাল, হলুদ, নীল বর্ণের ১১টি ভাস্কর্য যেন অবচেতন মনের বহিঃপ্রকাশ। ভাস্কর্যের ওপর রং ও মোমের প্রলেপ দিয়ে বিভ্রম তৈরি করেছেন। সে কারণে মাটির কাজে যোগ হয়েছে ধাতব অনুভূতি।
উল্লেখ্য সামিনা করিম ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। দলীয় ও এককভাবে দেশে-বিদেশে এই পর্যন্ত তিনি ১০টিরও বেশি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। ২০১৫ সালে কলকাতার বিরলা একাডেমিতে দলীয় প্রদর্শনী, ২০১৬ সালে ঢাকার শিল্পকলায় এশিয়ান বাইনালে ও ২০১৭ সালে ন্যাশনাল এক্সিবিশনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি চিটাগং স্কাল্পচার সেন্টার এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এছাড়া চট্টগ্রামের খুলশীতে ‘মৃন্ময়’ নামের একটি আর্ট গ্যালারি পরিচালনা করে আসছেন ১৯৯৮ সাল থেকে। এটি ছিল শিল্পীর তৃতীয় একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী।