রাউজানে নজরুল

ওহীদুল আলম

খুব সম্ভব ১৯৩২ ইংরেজির এক গ্রীষ্মকাল। রাউজানে সাহিত্য-সম্মেলন হবে, নজরুল আসবেন, তাই চারিদিক সরগরম।
সম্মেলনে যোগদানের জন্য, আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন আবুল ফজল, কামালউদ্দীন খান, মুহম্মদ ছবীবুল্লাহ্ বাহার। মাহবুবউল আলম সাহেব সহ আমরা রওয়ানা হলুম সকালের দিকে।
সম্মেলনে যখন পৌঁছানো গেল তখন প্রায় দুপুর। মাথার উপরে সুর্যের আগুন, পেটে ক্ষিদের আগুন। কিন’ সব আগুন ঠাণ্ডা হলো নজরুলকে দেখে। এতদিন যাঁর গজল গেয়ে গেয়ে আমরা দিনকে রাত ও রাতকে দিন করেছি সেই নজরুলকে দেখলাম।
মঞ্চে আমারও স’ান হলো এতগুলি সাহিত্যিকের স্নেহভাজন বলে। বসলাম নজরুলের পাশেই, মন ভোলানো চেহারা, বড় বড় চোখ, ঝাঁকড়া চুলের উপর খদ্দরের টুপী চেপে বসানো, পরনে খদ্দরের পায়জামা, গায়ে খদ্দরের পাঞ্জাবী-একটি খদ্দরের হল্দে আলোয়ান জড়ানো। আমার দিকে চোখ ফিরিয়ে মেজদাকে বললেন- ‘মাহবুব সাহেব, এ কে?’ মেজদা বললেন- ‘ছোট ভাই’।
নজরুল-‘তাই নাকি?’ পরে আমাকেই বললেন-‘আমি যখন তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলুম তোকে যে দেখিনি?’
মেজদা মৃদু হেসে বললেন- ‘ সে তখন (১৯২৯ সালে) রেংগুন পালিয়েছিল।
নজরুল- ‘পালিয়েছিলি, বেশ করেছিলি’। বলেই আমার পিঠে এক চাপড়। অর্থাৎ, কাজটি তাঁর মনোমত হয়েছে। সম্মেলনের কাজ শুরু হলো। সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকার ভূতপূর্ব সম্পাদক জনাব নজির আহমদ চৌধুরী বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। বক্তৃতার এক জায়গায় তিনি বললেন, ‘সেই মহাযুদ্ধে (প্রথম মহাযুদ্ধে) ব্রিটিশ গভর্নমেন্টকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাহায্য করবার জন্য আমাদের এই কবি নজরুল ইসলাম ও সাহিত্যিক মাহবুব-উল আলম গিয়েছিলেন। এই বলে তিনি নজরুল ও মেজদাকে আঙ্গুলে ইংগিত করে দেখালেন।
নজরুল চুপিচুপি মেজদাকে বললেন, মাহবুব সাহেব, আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে। আপনি এর উত্তর দিবেন।’
মেজদা-‘না, আপনার জবাবই ঠিক হবে।’
নজির আহমদ সাহেবের বক্তৃতার শেষে দাঁড়ালেন নজরুল। বজ্রগম্ভীর স্বরে তিনি বললেন-‘চৌধুরী সাহেব আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। জবাবে আমি বলছি: আমরা যখন যুদ্ধে যাই, তখন কে হারবে কে জিতবে একথা তলিয়ে দেখিনি। আমাদের যুদ্ধে যাওয়ার পেছনে ছিল চপল তারুণ্য। এই তারুণ্যের বশেই আমরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম।’ দুপুরে এক ভদ্রলোকের বাড়িতে আমাদের খানার এন্তেযাম হয়েছিল। নজরুল বসেছেন, আর তাকে ঘিরে বসেছি আমরা তরুণ দল। খেতে বসে দেখলাম, নজরুল খেতে পারেন বেশ। গোটা গোটা কোর্মার টুকরা মুখে পুরছেন। ভাত কম খান। আর মাঝে মাঝে হাসির হুল্লোড় ত লেগেই আছে।
খাওয়ার পরে আমরা ক’জন নজরুলের স্যুটকেশ খুলে দেখতে লাগলাম। কি কি দেখেছি তাতে, সব মনে নাই। তবে এইটুকু মনে আছে-স্নো, ক্রিম, পাউডার, আর্শি, চিরুণী- সবগুলি দামী দামী।
বিকেলে আবার সম্মেলন শুরু হলো, নজরুল আবৃত্তি করলেন ‘সাম্যবাদী’। গান হলো অগুন্তি। মগ্রীবের নামাজের সময জমায়াত হচ্ছে প্যান্ডেলের পশ্চিম পাশে। আমরা ক’জন মঞ্চে তখনো বসে আছি। হঠাৎ নজরুল বলে উঠলেন, ‘মাহবুব সাহেব, চলূন নামাজে শামিল হওয়া যাক॥’ তৎক্ষণাৎ পেছনের কাতারে গিয়ে তিনিও দাঁড়ালেন।
নামাজের শেষে সম্মেলনও শেষ হওয়ার কথা, সকলের উঠি উঠি ভাব। হঠাৎ কথা হলো নজরুল আরো একটি গান শোনাবেন। নজরুল গাইলেন-‘গুলবাগিচার বুলবুল আমি, রঙিন প্রেমের গাই গজল।’ সেই রবিকরোজ্জ্বল দিনে নজরুলের ততোধিক উজ্জ্বল নয়নের দীপ্তি, গজলের জোশ, আবেগময় কণ্ঠ আমার জীবনের মণিকোঠায় অক্ষয় হয়ে থাকবে। কাল-ব্যাধির প্রবল প্রতাপে সেই তেজোদৃপ্ত মুখচ্ছবি নিষ্প্রভ হয়েছে, একথা ভাবতেও মনে ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে।
মাহে-নও, জ্যৈষ্ঠ ১৩৬০ থেকে