দুর্গম সীমান্ত দিয়ে দেশে এখনো আসছে মাদক!

সুপ্রভাত ডেস্ক

চলমান মাদকবিরোধী কড়া অভিযানের মধ্যেও দেশের দুর্গম সীমান্ত দিয়ে মাদক আসছে। চোরকারবারীরা রুট পরিবর্তন করেও দেশে মাদক আনার চেষ্টা করছে। যদিও প্রতিদিনই দেশের সীমান্ত এলাকায় ধরা পড়ছে বিভিন্ন মাদকের চালান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, শতভাগ নিয়ন্ত্রণে আসতে আরও সময় লাগবে। খবর বাংলাট্রিবিউনের।
বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিদের অনুসন্ধান এবং স’ানীয় জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাদক আসার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। অভিযানের মধ্যে প্রতিদিনই সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদক আসছে। এর কিছু অংশ ধরাও পড়ছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে বান্দরবানে হোটেল বিলকিছের সামনে থেকে ৮০০ পিস ইয়াবাসহ নুরুল বশর নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে জেলার গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেফতার বশর বান্দরবানের পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আকা উদ্দিনের ছেলে।
বান্দরবান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. ইয়াছির আরাফাত এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীরা এখনও চেষ্টা করছে। তারা রুট পরিবর্তন করে বিচ্ছিন্নভাবে মাদক নিয়ে আসছে। উখিয়া ও টেকনাফের মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে সরাসরি কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে না পাঠিয়ে তারা বান্দরবানের পাহাড়ি পথ দিয়ে কাপ্তাই ও রাঙ্গুনিয়া দিয়ে চট্টগ্রামে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সেগুলো আমরা মাঝে মাঝে আটক করছি।’
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ৯টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবা। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় বর্তমানে মূল রুট তারা ব্যবহার করতে পারছে না।
কুমিল্লার ১২৫ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে রয়েছে জেলার ৫টি উপজেলা- চৌদ্দগ্রাম, সদর দক্ষিণ, আদর্শ সদর, বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া। ভারতের ত্রিপুরা ও আগরতলার সঙ্গে এসব উপজেলার সীমান্তবর্তী ইউনিয়নগুলো। এর মধ্যে বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়ার সীমান্ত এলাকা থেকে মাদক আসছে। বুড়িচংয়ের পাহাড়পুর, সাংকুচাইল ও বেগমাবাদ এলাকা থেকে মাদক আসে। ব্রাহ্মণপাড়ার উপজেলার বাশতলি, ক্যাটাভূমি, আশাবাড়ি, হরিমঙ্গল, নয়নপুর আলোচিত শালদানদী থেকে মাদক আসছে।
ব্রাহ্মণপাড়ার উপজেলার আশাবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাকারিয়া জানান, তারা প্রশাসনকে সহযোগিতা করছেন। মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতিরোধে যা যা করা দরকার, করা হচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা হয়তো তাদের জায়গা থেকে চেষ্টা করছে, তবে আগের চেয়ে সীমান্ত এলাকায় অনেক বেশি টহল বাড়ানো হয়েছে।
কুমিল্লা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘অভিযান চলমান রয়েছে। যারা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে তারা শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। আগামী দশ রমজান পর্যন্ত অভিযান চলবে। আমাদের কাছে মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা রয়েছে।’
ভারতের ত্রিপুরার বিপরীত পাশে ফেনী জেলার অবস’ান। মাদক পাচারের রুট হিসেবে এ জেলার ৬টি উপজেলার নাম আছে দেশের গোয়েন্দা সংস’া ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকাতেও ফেনী সদরের ধর্মপুর, পরশুরাম উপজেলার গুতুমা, ফুলগাজীর ঘোষাইপুর, ত্রিপুর, বসন্তপুর ও পরশুরামের মধুগ্রাম, বিলোনিয়া, ছাগলনাইয়া ও মহারাজগঞ্জ দিয়ে মাদক আসছে।
অভিযান শুরু হওয়ার পর এসব এলাকার কয়েকটি মাদকপাচারের রুট সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে ফেনি প্রতিনিধি রফিকুইল ইসলাম। তার অনুসন্ধানে এসব রুট দিয়ে ফেনসিডিল ও গাঁজা আসার প্রমাণ মিলেছে। পুলিশ ও বিজিবির হাতে কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছে। গোয়েন্দাদের সর্বশেষ তালিকাতেও ফেনীর ২৪ মাদক ব্যবসায়ীর নাম রয়েছে। এদের মধ্যে ৯ জন জেলার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। এই জেলায় এ মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় তিনজন।
লেমুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাসিমুল হাসান নাসিব স্বীকার করেন, এলাকায় এখনও মাদক আসছে। তবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় কড়াকড়ি হলেও মাদক ব্যবসায়ীরা বসে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।’
সাতক্ষীরা জেলার ১৩৮ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা। এই এলাকায় মাদক চোরাচালান হ্রাস পেয়েছে। তবে জেলার ভোমরা, গাজীপুর, লক্ষ্মীদাড়ী, তলুইগাছা, ভাদিয়ালী, কাকডাঙ্গা, হিজলদী, দেবহাটার কুলিয়া, কুশখালী, বৈকারী, ঘোনা ও বসন্তপুরে এখনও মাদক ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
বৈকারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান বলেন, ‘যারা গাঁজা সেবন করে এমন কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বর্তমানে আমাদের এলাকা সিলগালা করে রাখা হয়েছে। এই এলাকায় কেউ মাদক নিয়ে ঢুকতে পারবে না। যারা ছিল তারাও গা-ঢাকা দিয়েছে।’
দিনাজপুর জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে ৭টি সীমান্ত এলাকা। প্রায় দেড়শ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকার বোচাগঞ্জ, বিরল, চিরিরবন্দর, ফুলবাড়ী, বিরামপুর এবং হাকিমপুর থেকে মাদক আসে। সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস’া ও রাস্তাঘাট না থাকায় বিজিবি সদস্যদের চোরাচালান প্রতিরোধে টহল দিতে গিয়ে হিমসিম খেতে হয়। গত মঙ্গলবার ৩৯ মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীকে আটক করে পুলিশ। বুধবারও ৮৫ জনকে আটক করা হয়েছে। এদের কাছ থেকে ইয়াবা ও ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়েছে। মূলত হিলি, বিরল ও কমলপুর সীমান্ত দিয়ে মাদক আসছে।
বিরামপুর উপজেলার কাটলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজির হোসেন বলেন, ‘এখনও মাদক আসছে। আমরা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছি। সচেতনতা সৃষ্টি করছি।’ তিনি বলেন, ‘আমার এলাকায় এখনও ১০-১৫ জন বড় মাদক ব্যবসায়ী আছে। তাদের কেউ গ্রেফতার করে না। আমার কর্মীও থাকতে পারে, অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে গডফাদার কেউ নেই।’
দিনাজপুরে পুলিশ সুপার (এসপি) হামিদুল আলম বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীদের মোটামুটি সবাইকেই ধরেছি। তবে সবাই গডফাদার না। দুই-একজন গডফাদার আছে। তবে বিরামপুরে নিহত ব্যক্তি গডফাদার ছিল। বাকিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তের রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ডাঙ্গেরপাড়া ও তালপট্টি, চিলমারী ইউনিয়নের মরারচর, উদয়নগর ও বাংলাবাজার, আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের গরুড়া ও ধর্মদহ এবং প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাথুয়া, প্রাগপুর, চরপ্রাগপুর, ময়রামপুর, মহিষকুন্ডি মাঠপাড়া ও জামালপুর ভাঙ্গাপাড়া থেকে মাদক আসছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার সিংগার বিল, শ্রীনগর, বিষ্ণপুর, আলীনগর, কালাছাড়া, হরেসপুরসহ আরও কয়েকটি সীমান্তবর্তী রুট দিয়ে এখনও মাদক আসছে।
অন্যদিকে চাঁপাইনবাগঞ্জের শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, ভোলাহাট সীমান্ত মাদক পাচারের রুট হিসেবে চিহ্নিত। জেলার সীমান্তবর্তী নয়ালাভাঙ্গা, শাহাবাজপুর ও বিনোদপুর, গোহালবাড়ি, নারায়ণপুর ও সুন্দরপুর থেকে মাদক ঢুকছে।
গত বুধবার শিবগঞ্জ উপজেলার তাঁতীপাড়া ৪ নম্বর বেরিবাঁধ এলাকা থেকে ইয়াবাসহ দুজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় তারা আটক হলেও শতভাগ মাদক নির্মূল হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হক।
তিনি বলেন, ‘সীমান্তে কড়াকড়ি হলেও রাতের অন্ধকারে মাদক আসছে। এখনও ধরা পড়ছে। গত সোম ও মঙ্গলবারও মাদক নিয়ে কয়েকজন এলাকা থেকে আটক করেছে র্যাব পুলিশ। তাই ধারণা করছি এখনও মাদক আসছে। এলাকার অনেক ছেলেপেলেকে ধরা হচ্ছে যাদের আগে সন্দেহ করতাম না, তাদেরও মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী হিসেবে আটক করা হচ্ছে। এতেই মনে হয় মাদক ব্যবসায়ীরা তৎপর।’
মাদকবিরোধী অভিযানের পর গত ১৮ মে শিবগঞ্জে র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে এক গাঁজা ব্যবসায়ী নিহত হয়। তার নাম আব্দুল আলিম (৫০)।
টেকনাফের নাফ নদী দিয়েও ইয়াবা এখনও আসছে। নাফ নদীতে নৌকা নিয়ে মাছ শিকার নিষেধ থাকলেও সীমান্ত বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এখনও অনেকে মাছ শিকারের নামে ইয়াবা নিয়ে আসছে। এছাড়াও মুখ দিয়ে গিলে পেটের ভেতরে করেও ইয়াবা নিয়ে আসে কেউ কেউ। অপর একটি গ্রুপ সাগরে মাছ শিকার করতে যাওয়ার নাম করেও ইয়াবা নিয়ে আসে। সাগরের মাছ ধরার শত শত ট্রলার তল্লাশি করা কোস্টগার্ডের জন্য দুরূহ কাজ। তাই সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয় বলে জানিয়েছেন কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল এ এম এম এম আওরঙ্গজেব চৌধুরী।
গোয়েন্দাদের তথ্যানুযায়ী, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, নয়াপাড়া, সাবরং, মৌলভীপাড়া, নাজিরপাড়া, হোয়াইকং, জালিয়াপাড়া, নাইট্যংপাড়া, জলিলেরদিয়া, লেদা, আলীখালি, হৃীলাসহ ১১টি পয়েন্ট ইয়াবা পাচারের চিহ্নিত রুট। এসব রুটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা রয়েছে। তবে মিয়ানমার সীমান্ত বাহিনীর সহায়তা বন্ধ না হলে ইয়াবা পাচার শতভাগ বন্ধ করা যাবে না বলে মনে করেন বিজিবির শীর্ষ এক কর্মকর্তা।
এত অভিযানের পরও বাংলাদেশে ইয়াবা আসার বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ বিজিবি-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আসাদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের ২৪ ঘণ্টাই পাহারা রয়েছে। তারপরও মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। বেশি টাকার লোভ দেখিয়ে গরিব মানুষকে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়ানো হচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীরা টেকনাফ ও উখিয়ায় সীমান্ত কড়াকড়ি দেখলে তারা মাছের ট্রলারে করে সাগরপথে পটুয়াখালী বা অন্য জেলায় চলে যায়। এভাবে দেশের ভেতরে ইয়াবা নিয়ে আসা হয়।’
মাদক ব্যবসায়ীরা জেনেশুনেই অল্প সময়ে বেশি টাকার মালিক হতে এই ঝুঁকি নিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা গত সপ্তাহে একজনকে ৪ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেফতার করি। সে নাফ নদী পাড় হয়ে টেকনাফে এসেছিল। এ জন্য তাকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। কক্সবাজার নিতে পারলে আরও ২০ হাজার পেতো। মূলত এই কারণেই দরিদ্র মানুষটি দিনরাত ঝুঁকি নিতে চেষ্টা করছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। মাদক প্রতিরোধে চলমান অভিযানে আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।’