ট্রাম্প-কিম বৈঠকে ফের অনিশ্চয়তা

সুপ্রভাত বহির্বিশ্ব ডেস্ক

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সাথে বৈঠকের সম্ভাবনার ব্যাপারে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘এই বৈঠক না হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।’ তিনি বলেছেন, ‘সম্মেলনের আগে উত্তর কোরিয়াকে শর্ত পূরণ করতে হবে। যদি সেটা না করে তাহলে এই বৈঠক আরো পরেও হতে পারে।’ হোয়াইট হাউজে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইনের সাথে আলোচনার পর তিনি এসব মন্তব্য করেন। খবর বিবিসি বাংলার।
আগামী জুন মাসের ১২ তারিখে সিঙ্গাপুরে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গত ২৭ এপ্রিলে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ঐতিহাসিক শীর্ষ বৈঠকের পর ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের এ বৈঠকের পট প্রস্তত হয়। কিন’ গত সপ্তাহে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে পিয়ংইয়ংকে পরমাণু অস্ত্র প্রকল্প বন্ধ করতে চাপ দিতে থাকলে দুই দেশের পরিকল্পিত বৈঠক বাতিল করা হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে দেখা দেওয়া এ অনিশ্চয়তা দূর করার চেষ্টা নিয়েই মুন ওয়াশিংটন সফর করছেন। বৈঠকটি হওয়ানোর জন্য মুন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ দূর করার মধ্য দিয়ে ট্রাম্পকে শান্ত করার চেষ্টা করবেন বলেই জানিয়েছেন পর্যবেক্ষকরা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠককালে কিমের কাছ থেকে কি আশা করা যায়, আর কি আশা করা যায় না- তাই মুন বলবেন বলে তার কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে ইয়ুনহাপ বার্তা সংস’া।
নেপথ্যে চার কারণ
বৈঠকের ব্যাপারে দুপক্ষের তরফেই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেও দুই নেতা আলোচনার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন’ নির্ধারিত বৈঠকের প্রায় তিন সপ্তাহ আগে হঠাৎ করে এই অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হলো কেন? যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রীয়াজ বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এজন্যে চারটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রথম কারণ হচ্ছে জন বোল্টনের কিছু মন্তব্য। আলী রীয়াজ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা জন বোল্টনের সামপ্রতিক কিছু মন্তব্য পরিসি’তিকে জটিল করে তুলেছে। ‘তিনি যেভাবে একতরফাভাবে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের কথা বলেছেন এবং লিবিয়া মডেলের কথা উল্লেখ করেছেন সেটা উত্তর কোরিয়ার জন্যে একটা বড় রকমের ভীতি তৈরি করেছে,’ বলেন রীয়াজ।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর চাপে ২০০৩ সালে লিবিয়া তার গণ-বিধ্বংসী অস্ত্র পরিহারের কথা ঘোষণা করেছিল। লিবিয়ার উপর থেকে তখন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাও ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করে নেয়। কিন’ শেষ পর্যন্ত লিবিয়ার সাথে যুদ্ধে কর্নেল গাদ্দাফি নিহত হন। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে যৌথ মহড়া। আলী রীয়াজ বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে যৌথ সামরিক মহড়া অলিম্পিকের কারণে পেছানো হয়েছিল। উত্তর কোরিয়া চাইছিল এই মহড়া বাতিল করা হোক। কিন’ সেটা বাতিল না করে এই মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে।’
তিন নম্বর কারণ হচ্ছে, ‘চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যে বাণিজ্য লড়াই প্রায় শুরু হতে যাচ্ছে বা হওয়ার মতো পরিসি’তির তৈরি হয়েছে সেটাও এর পেছনে পরোক্ষভাবে কাজ করেছে’ বলে মনে করেন আলী রীয়াজ। ‘চীন যেহেতু উত্তর কোরিয়ার বড় সমর্থক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যখন এক ধরনের টানাপড়েন চলছে, এরকম একটা পরিসি’তিতে চীন সম্ভবত উত্তর কোরিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের উপর একটা চাপ তৈরি করতে চাইছে,’ বলেন তিনি।
আর চতুর্থ হচ্ছে, আলী রীয়াজ মনে করেন, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে যতোটা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হয়তো তারচেয়েও বেশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছেন। আলী রিয়াজ বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে বর্তমানে দুটো ধারণা এখন স্পষ্ট। একটি হচ্ছে জন বোল্টনের ধারণা। তিনি মনে করেন এই আলোচনা সফল হবে না। ফলে যুদ্ধের জন্যে মানসিকভাবে প্রস’তি নিতে হবে।
আর অন্যটি হচ্ছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর ধারণা। তিনি একাধিকবার উত্তর কোরিয়াতে গেছেন। অতীতে তিনি উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে বারবার সামরিক অভিযানের কথা বললেও এখন তিনি চাইছেন অন্তত আলোচনাটা হোক।
‘সম্ভবত হোয়াইট হাউজের কথা বিবেচনা করেই তিনি অনেক দূর পর্যন্ত যেতে চান। এই পার্থক্যের কারণে বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে যে এক ধরনের টানাপড়েন চলছে। এবং এই টানাপড়েনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের উপর চাপ তৈরি করতে চায় উত্তর কোরিয়া,’ বলেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেশ কিছু শর্তের কথা বলেছেন যদিও তিনি সেসব প্রকাশ করেননি। কিন’ অনেকেই মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার একতরফাভাবে পরমাণু কর্মসূচি পরিহারের কথা বলছেন। তাহলে কি বাধাটা এখন যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকেই আসছে?
এই প্রশ্নের জবাবে রীয়াজ বলেন, একটা শীর্ষ বৈঠকের আগে দুপক্ষকে মাঝামাঝি জায়গায় আসতে হবে যেটা এখনও তৈরি হয়নি।
‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে উত্তর কোরিয়া চায় ওই এলাকাতে যাতে মার্কিন সামরিক উপসি’তি না থাকে। সেটা আসলে যুক্তরাষ্ট্র মানতে চাইছে না। এছাড়াও ওই এলাকায় অন্যান্য দেশগুলোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে উত্তর কোরিয়া সেটাও চায় না। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারে একতরফাভাবে উত্তর কোরিয়ার উপর চাপ দিচ্ছে। ফলে শীর্ষ বৈঠকের প্রস’তিটা এখনও তৈরি হয়নি,’ বলেন তিনি।