ছবির শহর

চলচ্চিত্রের দালি এক

ইফতেখারম্নল ইসলাম
Pic 05

নিউ ইয়র্কের মোমা মিউজিয়ামের একটি বিশেষ প্রদর্শনীর সূত্র ধরে দালিকে ভালোভাবে চিনতে চেষ্টা করি। স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী সালভাদর দালি (১৯০৪-১৯৮৯) আধুনিক নন্দনতত্ত্বের সকল শাখায় গত ষাট-সত্তর বছর ধরে সবচেয়ে আলোচিত নাম। দালির পরাবাসত্মববাদ গত শতাব্দীর আধুনিক চিত্রকলা, ভাস্কর্য, সাহিত্য এমনকি চলচ্চিত্রেও ব্যাপক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
পরাবাসত্মববাদী শিল্প শৈলীতে সালভাদর দালির প্রধান অবদান হচ্ছে এর একটা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা উপস’াপন করা। ইচ্ছাকৃত বিভ্রম ও মনোবিকলন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর প্রকৃত বাসত্মবকে বর্জন করা।
অসংলগ্ন ও বিচ্ছিন্নকে একত্রে গ্রথিত করার জন্য খুঁজে বের করা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজন-পন’া। তাঁর সৃষ্টি করা যে-কোনো ছবি, ড্রয়িং অথবা চলচ্চিত্র-দৃশ্য এই শৈল্পিক বিভ্রানি-কে স্পষ্ট করে দেখিয়ে দেয়।
দালির আঁকা দ্য পার্সিস্টেনস অব মেমরি নামের ছবিটি ১৯৩২ সালের জানুয়ারি মাসে নিউ ইয়র্কে প্রথম প্রদর্শিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই বিপুল সাড়া জাগায়। তার আগের বছর প্যারিসের এক প্রদর্শনীতে ছবিটি দেখানো হলেও সেটা বিক্রি হয়নি। অথচ পরের বছরেই সৃষ্টি হলো এই বিরাট চাঞ্চল্য। পরাবাসত্মববাদী শিল্পকলাবিদ জুলিয়েন লেভি এই ছবিটিকে “১০ইঞ্চি বাই ১৪ইঞ্চি দালি ডিনামাইট” আখ্যা দিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই এই বিস্ফোরক ছবির অসংখ্য আলোচনা প্রকাশিত হয়। আর প্রত্যেক আলোচনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় ছবিটির প্রিন্ট। ফলে বিপুল প্রচার পায় এই ছবি। কয়েক বছর পর এই ছবির সৃষ্টি-কাহিনি বলতে গিয়ে দালি বলেন যে, নরম গলিত ঘড়ির ধারনাটি তিনি পেয়েছিলেন কড়া ক্যামেম্বার্ট পনিরের পুরনো হয়ে যাওয়া গলিত অবশেষটুকু থেকে।
ছবিটিতে অনুপুন্‌েখর প্রতি শিল্পীর গভীর মনোযোগের চিহ্ন রয়েছে। আছে তিনটি পকেট-ঘড়ির গলিত কোমল রূপ।
পাতাহীন, প্রাণহীন গাছের শুকনো ডাল থেকে ঝুলে আছে একটি ঘড়ি আর নিচে আছে দুটি। ছবির নিচের অংশে আছে একটি পশুর মুখাবয়ব। কোনো কোনো আলোচক এটিকে দালির নিজের মুখাবয়বেরই কিছুটা বিকৃত রূপ হিসেবে দেখেছেন। কেউ কেউ এতে লড়্গ করেছেন যৌনতার প্রতীক। দূরের স্বচ্ছ পানি আর মাটির খাড়া পারের ওপর পড়েছে উদিত সূযের্র আলো।
এমনিতে ছবির পটভূমিটি বেশ পরিচ্ছন্ন মনে হয়। কিন’ একটু লড়্গ করলেই দেখা যায় যে, একটি পকেট ঘড়ির ধাতব ঢাকনার উপর ভিড় জমিয়েছে পিপড়ের দল। আর পাশের ঘড়িটিতে এসে বসেছে একটি মাছি। তার অর্থ কি এখানে কোথাও কোনো পচনের ইঙ্গিত? সময়ের স’বিরতা অথবা অসংবদ্ধতার চিহ্ন দেখি ঘড়িগুলোর মধ্যে। প্রত্যেকটি ঘড়ি ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা বা সময় নির্দেশ করছে।
মনে হয় সময়ই হচ্ছে এই ছবির মূলভাব। গলিত ঘড়ির ফর্ম থেকে শুরম্ন করে পিপড়ের দল পর্যন- যে ইঙ্গিত আমরা পাই সেটা হচ্ছে কালের সঙ্গে পচনের সম্পর্ক। আর তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নিজের মুখাবয়ব। নিজের রচিত বিভ্রম দিয়ে বাসত্মব পৃথিবীকে পরিপূর্ণভাবে কলঙ্কিত বা মিথ্যে প্রমাণ করা। এখানে একটাই বাসত্মবতা অড়্গুন্ন আছে। সেটা হলো দূরের খাড়া পার যেটা বাসত্মবে রয়েছে দালির নিজের দেশ স্পেনের কেটালোনিয়ার সমুদ্রতীরে।
দুই
শিল্পকলার তথাকথিত উচ্চ-নিচ ভেদ ভেঙে ফেলেছেন দালি। তাই ছবি আঁকার পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্রের জন্য কাজ করতে শুরম্ন করেন। বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের দৃশ্য পরিকল্পনার কাজ করেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে ওয়াল্ট ডিজনি, সিসিল দ্য মিল, মার্কস ব্রাদার্স, এবং আলফ্রেড হিচককের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন। লুই বুনুয়েলের ১৭ মিনিটের পরাবাসত্মববাদী আর্ট ফিল্মে তিনি ছিলেন সহ-নির্মাতা। পরে এই নির্মাতার সঙ্গে আরো একটা ছবি তৈরি করেন দালি।
এসব ছবিতে বাসত্মব আর কল্পনার জগতকে জোড়া দিয়ে দালি দৃশ্য থেকে দৃশ্যান-রে নিয়ে যান দর্শককে। বারবার দৃষ্টিকোণ বদলে দিয়ে তিনি দর্শককে অসম্ভবের জগতে পৌঁছে দেন। এই দুটি ছবিই স্বাধীন পরাবাসত্মববাদী চলচ্চিত্র আন্দোলনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। তবে দ্বিতীয় ছবিটির কিছু দৃশ্য এমন বিতর্ক তৈরি করে যে শেষ পর্যন- সেগুলো সেন্সরড হয়ে যায়। এর ফলে অবশ্য বাণিজ্যিক বা মূলধারার ছবির জগতেও দালির জন্য ব্যাপক আগ্রহ ও সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ সময় তিনি হলিউডের আমন্ত্রণেও সাড়া দিয়েছেন। তবে, মাত্র দুটো উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন সেখানে। এর একটা হলো আলফ্রেড হিচককের স্পেলবাউন্ড আর অন্যটি ওয়াল্ট ডিজনির ডেসটিনো।
দালির সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্র প্রকল্প হচ্ছে আলফ্রেড হিচককের স্পেলবাউন্ড যেখানে তাঁর পরিকল্পিত স্বপ্ন-দৃশ্যটি ছবির বিষয়বসত্মু ছাপিয়ে অন-র্জগত-বিশ্লেষণের পর্যায়ে নিয়ে যায়। হিচককের ছবিতে তিনি যে ধারনাটি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন তা হলো, অবদমিত অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন- সরাসরি স্নায়ু-বৈকল্য ঘটাতে পারে। হিচকক বুঝেছিলেন, তাঁর ছবির জন্য ঠিক যে আবহটি দরকার তা এনে দিতে পারেন দালি-ই। স্পেলবাউন্ড-এর এই দৃশ্য যাঁরা দেখেছেন তাঁরা জানেন কি অসামান্য শিল্পকৌশল আর সৃজনশীল ভাবনা এখানে রয়েছে।
ডিজনির কার্টুন ছবি ডেসটিনো-র বেশ কিছু দৃশ্য নির্মাণ করেছেন দালি। ১৯৪৬-এ ছবিটির কাজ শুরম্ন হলেও অর্থাভাবে তা শেষ করা যায়নি। অর্ধ-শতাব্দীর বেশি পার হয়ে যাবার পর ২০০৩ সালে ছবিটির কাজ সমাপ্ত করেন বেকার ব্লাডউইথ এবং রয় ডিজনি। আরো যেসব ছবিতে দালি কাজ করেছেন তার মধ্যে আছে ‘কেয়স এন্ড ক্রিয়েশন’ নামের ডকুমেন্টারি আর ‘ইমেপ্রশনস অব আপার মঙ্গোলিয়া’ নামের একটা ছবি।
২০০৮ সালের ২৯ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যনত্ম নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে দালি ও চলচ্চিত্র শিরোনামে বিশেষ একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। মিউজিয়ামের সবচেয়ে উপরের তলায় বেশ কয়েকটি কড়্গ নিয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে চলচ্চিত্রের সঙ্গে সালভাদর দালির সম্পৃক্ততা বিষয়ে অনেক গুরম্নত্বপূর্ণ চিত্রকলা, ড্রয়িং, চিঠিপত্র, এবং অন্য নানা রকমের তথ্য প্রদর্শিত হয়।
সেই সঙ্গে প্রতিটি কড়্গে দেখানো হয় হিচককের স্পেলবাউন্ড থেকে শুরম্ন করে অন্য কয়েকজন পরিচালকের তৈরি বিভিন্ন চলচ্চিত্রের প্রাসঙ্গিক সব ক্লিপ। সেইসব ক্লিপ যা দালির পরিকল্পনা ও নির্দেশনা বা তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয়েছিল। এই প্রদর্শনীতে দেখানো হয় ১৩০টির বেশি শিল্পসামগ্রী। দালির আঁকা অনেকগুলো ছবি, বেশ কিছু ড্রয়িং, এবং চলচ্চিত্রের দৃশ্যপট।
বিভিন্ন লেখায় এবং ছবিতে পরাবাসত্মববাদী ভাবনার প্রত্যড়্গ প্রতিফলন দেখা যায়। বোঝা যায় চলচ্চিত্রের সঙ্গে এই নিবিড় সম্পর্ক তাঁকে কতোটা অনুপ্রাণিত করেছিল। কতোটা সচ্ছন্দে তিনি তাঁর শিল্পভাবনা চলচ্চিত্রে সঞ্চারিত করেছেন।
একটি যুগান-কারী শিল্পভাবনা ও রীতি কীভাবে এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে প্রবাহিত, রূপান-রিত ও বিকশিত হয়েছে তা এইসব ছবি ও চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে গভীরভাবে অনুভব করা যায়। মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে দেখা দালির কয়েকটি ছবি আর একটি বিশেষ প্রদর্শনীরসফল পরিবেশনা স’ায়ী অভিঘাত তৈরি করে আমার মতো অসংখ্য দর্শনার্থীর মনে।