মানবিক গুণসম্পন্ন পুলিশই আমরা চাই

সফিক চৌধুরী
Safique Chy

১. একটি আধুনিক সমাজে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হলেই যে তাঁরা জ্ঞানী হবেন তা নয়, আর জ্ঞানী হলেও তিনি তো মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ নাও হতে পারেন, এই উপলব্ধি আমাদের যত দ্রুত হবে ততই মঙ্গল। এই যে আমাদের এত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও বিভিন্ন ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন’ তবুও তো দেখি সমাজ জুড়ে মূল্যবোধের সংকট, আদর্শের অনটন আর সংবেদনশীলতার ভীষণ অভাব। প্রায় সব ক্ষেত্রেই অরাজকতা, ক্ষমতালিপ্সা আর নিয়মহীনতাই যেন আমাদের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা মানব হয়েও মানবিক না হয়ে ইদানিং অনেকেই দানবের আচরণ করছি, সহনশীল আজ আমরা অপরকে হতে বলি, কিন’ নিজে তার চর্চা করি না। দৈন্যতা আজ আর শুধু গুটি কয়েক মানুষের মননে নয়, তা আজ ছড়িয়ে গেছে সমাজ আর রাষ্ট্রের প্রতিটি কোনায়।
ইদানিং মনে প্রশ্ন জাগে, এই যে আমরা এত মুক্তচিন্তার কথা বলি, কিন’ তাতে আমাদের চিন্তার মুক্তি কি ঘটেছে? আমরা আসলে কতজন পেরেছি সত্যিকারের শুভচিন্তার ‘মানুষ’ হতে?
২. ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’, যুগ যুগ ধরে এই আপ্ত বাক্যটি আমরা যতবার বলে পুলিশের কাছ থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ/সহযোগিতা প্রত্যাশা করি, কিন’ নাগরিক হিসেবে আমরা নিজেরাও কী সবসময় তাঁদের সাথে একইরকম ব্যবহার করি? আমরা আমাদের পুলিশের গুটিকয়েক সদস্যের ঘুষ খাওয়া নিয়ে খুব উচ্চকিত, কিন’ আমরা অন্য অনেক সেক্টরের হাজারো রাঘব বোয়ালের দুর্নীতি নিয়ে একেবারেই চুপ! আমরা ভুলে যাই, প্রতিষ্ঠানের কোন ব্যক্তির অনাচার সমাজের সুশিক্ষা ও সুনীতি’র অভাবের ফল, আর তার দায় সমাজের একজন হিসেবে আমি আপনি এড়াবো কিভাবে? পুলিশ যদি পুরোই নষ্ট হয়ে যেত, তবে আমি আপনি কী সমাজে এভাবে সুস’ থাকতে পারতাম? পুলিশের আচরণ নিয়ে কথা উঠলে আমরা অনেকেই উদাহরণ হিসেবে উন্নত বিশ্বের পুলিশের কথা বলি। কিন’, আমরা ভুলে যাই বা যা বলি না তা হলো, উন্নত বা এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বড় শহরগুলোতে পুলিশ যাঁদের সেবা প্রদান করেন, তাঁরাও নাগরিক হিসেবে তাঁদের দায়িত্ব/কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন। আমরা প্রায় ক্ষেত্রেই নিয়ম-আইন মানতে রাজি নই, কিন’ অন্যের কাছ থেকে তা পূর্ণ মাত্রায় প্রত্যাশা করি।
রাস্তায় তপ্ত রোদে পুড়ে, ঝড় বা ভীষণ বৃষ্টিতে ভিজে যিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করে যান, তিনি হতে পারেন পুলিশ, কিন’ দিনের শেষে তিনিও তো কারও বাবা, ভাই বা স্বামী, আমরা কী তাঁর জন্য রাস্তার পাশে কোন শৌচাগার বানিয়েছি? আমরা তো আমাদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে একটু বসার সুযোগ পাই, কিন’ রাস্তায় একনিষ্ঠ দায়িত্ব পালন করে যাওয়া সেই পুলিশের তো বসার কোন ফুরসত নেই! রাস্তা পার হতে গিয়ে বা রাস্তার যে কোন বিপদে বৃদ্ধ/শিশু/মহিলা বা যে কেউ নিশ্চিন্তে যার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, সে তো আর কেউ নয়, আমাদেরই পুলিশ বন্ধু।
৩. তবে, সব কিছুর পরেও আমাদের সমাজ-সংসারের মতো পুলিশেও ভালো ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষের সংখ্যাই বেশি, মিরসরাই জোরারগঞ্জ থানার তেমন ভালো ও মানবিক গুনসম্পন্ন কিছু পুলিশ উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন মানবিকতার।
গত কিছুদিন বাংলাদেশের লাইফ লাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বলা যায় প্রায় অচল হয়েছিল ফেনীর ফতেহপুর রেল ক্রসিংয়ের উপর নির্মাণাধীন ওভারপাসের কাজের কারণে। যানজটে আটকা পড়ে যাত্রী, চালক ও সাধারণ মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন। বিশেষ করে নারী-শিশু ও বয়স্কদের অবস’া ছিল শোচনীয়। শুকনো খাবারের অপ্রতুলতা, রাস্তায় শৌচাগারের অভাব আর তার উপর মাঝে মাঝে বৈশাখী বৃষ্টি সবাইকেই ভীষণ ভুগিয়েছে। চালক-যাত্রীদের এই নাকাল সময়ে দিন-রাত এক করে নির্ঘুম রজনী ও পরিবারকে ফেলে সেবা দিয়ে গেছেন হাজারো পুলিশ। তবে, জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ শুধু পুলিশের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেই ক্ষান্ত হয়নি, কয়েকদিন টানা যানজটে আটকে থাকা গাড়ির চালক-যাত্রী সহ ভুক্তভোগীদের তাঁদের নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে সাধ্যমতো শুকনো খাবার ও খাবার পানি বিলিয়েছেন নিরবে নিভৃতে।
জোরারগঞ্জ থানা পুলিশের এমন জনহিতৈষী ও মানবিক কাজের কথা শুনে যোগাযোগ করি জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) শামীম আনোয়ারের সাথে। প্রচারবিমুখ ও ব্যবহারে অমায়িক শামীম আনোয়ার বলেন, ‘আমি সহ আমাদের থানার প্রায় সকলেই কয়েকদিন বলতে গেলে প্রায় না ঘুমিয়েই কাটিয়েছি, ঠিকমতো নাওয়া-খাওয়াও হয়নি, কিন’ যখন দেখলাম টানা যানজটে আটকা পড়ে সাধারণ যাত্রী, বাস-ট্রাক ড্রাইভার ও হেলপারদের অবস’া আরও সঙ্গিন, তখন আমাদের মাননীয় পুলিশ সুপার নূরে আলম মিনা স্যারের নির্দেশনায় আমরা ঠিক করলাম নিজেরা টাকা তুলে সেই টাকায় যা পারি কিছু শুকনো খাবার ও খাবার পানি ভুক্তভোগীদের মাঝে বিতরণ করবো। টানা যানজটে নাজেহাল মানুষের কষ্ট আমাদের ভীষণ পীড়া দিচ্ছিল, যা করেছি তা শুধু মানুষ হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব কিছুটা পালন করেছি মাত্র।’ আহ, তাঁর কথা শুনে ভীষণ গর্ববোধ হলো।
মনে হলো, এমন মানবিক পুলিশই তো নাগরিক হিসেবে আমাদের চাওয়া। বর্তমান আমাদের জরাগ্রস্ত সমাজে চারিদিকে যখন হতাশা, মূল্যবোধের সংকট আর পুলিশ নিয়ে সাধারণ অনেকেরই নেতিবাচক মনোভাব তখন জোরারগঞ্জ থানার এমন মানবিক উদ্যোগ আমাদের আশাবাদী আর স্বাপ্নিক করে। আমাদের প্রত্যাশা, এমন মানবিক কাজ ছড়িয়ে যাবে আমাদের সবার মাঝে। জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ সহ এমন মানবিক সব পুলিশের প্রতি আমাদের স্যালুট, ধন্যবাদ আর ভালোবাসা।