‘জীবনের ধ্রুবতারা’

আনিসুজ্জামান

‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা’ রবীন্দ্রনাথের সুপরিচিত একটি গান। গীতবিতানের সূচিপত্রে গানটির প্রথম চরণের উল্লেখের পর লেখা আছে ‘ব্রহ্মসঙ্গীত’। অথচ গীতবিতানে এটি সংকলিত হয়েছে প্রেম-পর্যায়ে। ব্রহ্মসঙ্গীত হলে গানটি নিশ্চয় পূজা-পর্যায়ে বিন্যস্ত হতো। এই হেরফের কেন, তা জানতে স্বভাবতই আগ্রহ হয়।
গানটি প্রথম প্রকাশিত হয় ভারতী পত্রিকায়, ১২৮৭ বঙ্গাব্দের কার্তিকে (অক্টোবর ১৮৮০) এই সংখ্যা রবীন্দ্রনাথের ‘গীতিকাব্য’ ভগ্নহৃদয়ের প্রথম সর্গ ও তার সূচনায় ‘উপহার’ নামে উৎসর্গ-গীতি মুদ্রিত হয়। সে গানটির পাঠ এই:
তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা।
এ সমুদ্রে আর কভু হবনাক’ পথহারা।
যেথা আমি যাইনাকো, তুমি প্রকাশিত থাকো
আকুল এ আঁখিপরে ঢাল’ গো আলোক ধারা।
ও মুখানি সদা মনে জাগিতেছে সঙ্গোপনে
আঁধার হৃদয় মাঝে দেবীর প্রতিমাপারা।
কখনো বিপথে যদি, ভ্রমিতে চায় এ হৃদি
অমনি ও মুখ হেরি সরমে সে হয় সারা।
চরণে দিনু গো আজি- এ ভগ্নহৃদয়খানি
চরণ রঞ্জিবে তব এ হৃদি-শোণিত ধারা।
এখানে দুটি কথা যোগ করা প্রয়োজন। ভগ্নহৃদয়-রচনার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজে জানিয়েছেন: ‘বিলাতে থাকিতে আর একটি কাব্যের পত্তন হইয়াছিল। কতকটা ফিরিবার পথে জাহাজে, কতকটা দেশে ফিরিয়া আসিয়া ইহা সমাধা করি।’ ১৮ বছর ৯ মাস বয়সে ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে কবি প্রথমবার বিলেত থেকে ফিরে আসেন। অনুমান করা হয় যে, জানুয়ারিতে ভগ্নহৃদয়-রচনার সূচনা। বিলেতপ্রবাসের পটভূমিকায় সপ্তম ও অষ্টম চরণ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। দ্বিতীয়ত, ভগ্নহৃদয়ের পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে (মালতী-পুঁথিতে)। তাতে দেখা যায়, মে মাসেও বোলপুরে তিনি ভগ্নহৃদয় লিখেছেন। আরো দেখা যায়, প্রথম চরণে প্রথমে কবি লিখেছিলেন, ‘তুমি যদি হও মোর সংসারের ধ্রুবতারা’, পরে ‘তোমারেই করিয়াছি’ লিখেছেন উপরে, কিন’ ‘তুমি যদি হও মোর’ কাটেননি; তেমনি দ্বিতীয় চরণে প্রথমে লিখেছিলেন ‘তাহলে কখনো আর’, তারপর তা না কেটেই উপরে লিখেছেন, ‘এ সমুদ্রে আর কভু’। প্রথম চরণে পাণ্ডুলিপির ‘সংসারের’ জায়গায় ‘জীবনের’ এবং সপ্তম চরণে ‘কুপথের’র জায়গায় ‘বিপথে’ হয়েছে ভারতীতে প্রকাশের সময়ে, আর তখনই যুক্ত হয়েছে শেষ দুটি চরণ।
ভারতীতে প্রকাশিত গানটির-অর্থাৎ আমরা যেভাবে উদ্ধৃত করেছি, তার ষষ্ঠ ও নবম চরণ থেকে সহজেই বোঝা যায়, গানটির উদ্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি-তাঁকেই কবি উপহার দিচ্ছেন ভগ্ন হৃদয় কাব্য অথবা নিজেরই ভগ্নহৃদয়। রবীন্দ্রজীবনীর প্রথম খণ্ডে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের আলোচনা থেকে মনে হয়, উপহারটি দেওয়া হয় ‘শ্রীমতী হে’ কে, কিন’ পাণ্ডুলিপি বা ভারতীর উল্লেখ যাঁরা করেছেন, তাঁদের আর কেউ সেকথা বলেননি।
কয়েক মাসের মধ্যেই মাঘোৎসবের প্রয়োজনে কবিকে যখন গান লিখতে হলো, তখন দেখা গেল, নতুন লেখা সাতটি ব্রহ্মসঙ্গীতের মধ্যে একটি এই উপহার-গীতিরই পরিবর্তিত রূপ। ১২৮৭-র মাঘোৎসবে সেটি গীত হয় এবং তা তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় (ফাল্গুন ১৮০২ শক) প্রকাশিত হয়। বলা যায়, গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয় তিনটি: ভারতীতে নির্দেশ করা হয়, গানটির রাগ ছায়ানট, তত্ত্ববোধিনীতে আলাইয়া, ঝাঁপতাল। ভারতীতে মুদ্রিত শেষ দুটি চরণ বর্জিত হয় এবং ষষ্ঠ চরণটি সবটুকু বদলে হয় ‘তিলেক অন্তর হল না দেখি কূল-কিনারা’। তাছাড়া, চতুর্থ চরণে ‘এ আঁখিপরের বদলে ‘নয়নজলে’ ও ‘আলোকধারা’র বদলে ‘কিরণধারা’ এবং সপ্তম চরণে ‘কখনো’র জায়গা ‘কখন’ ও ‘চায়’-এর জায়গায় ‘চাহে’ হয়েছে। আসল কথা, মূলের শেষ চরণদুটি অপ্রয়োজনীয় ছিল আর ষষ্ঠ চরণটি ব্রহ্মসঙ্গীতে অচল ছিল-ওর দেবী যে আসলে মানবী, তা বুঝতে ভুল হয় না। সুতরাং মানবীকে যা দেয়া হয়েছিল, চার মাসের মধ্যেই, একটু বদল করে তা-ই দেওয়া হলো ব্রহ্মকে। রবীন্দ্রনাথ গানটি আর ফিরিয়ে নিয়ে মানবীকে দেননি, এমনকি, ভগ্নহৃদয় কাব্য যখন গ্রন’াকারে প্রকাশিত হয় (১৮৮১), তখনও আর আগের উপহারটি পুর্নমুদ্রিত হয়নি। গ্রনে’র উপহার ‘শ্রীমতি হে-’ তারপর ছয় চরণের প্রতি স্তবকের পাঁচটি স্তরক, মোট ত্রিশ চরণের কবিতা। তৃতীয় স্তবকটি এরকম:
হয়ত জান না, দেবি, অদৃশ্য বাঁধন দিয়া
নিয়মিত পথে এক ফিরাইছ মোর হিয়া।
গেছি দূরে, গেছি কাছে, সেই আকর্ষণ আছে,
পথভ্রষ্ট হইনাক, তাহারি অটল বলে।
নহিলে হৃদয় মম ছিন্ন ধূমকেতু সম
দিশাহারা হইত সে অনন্ত আকাশ তলে!
এর সঙ্গে উপহার-গীতির সপ্তম-অষ্টম চরণ বক্তব্যের দিক দিয়ে অভিন্ন।
এখন প্রশ্ন, ‘শ্রীমতি হে-’ কে? প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন:
আমি ইন্দিরা দেবীর নিকট শুনিয়াছি, ‘হে’- কাদম্বরী দেবীর কোনো ছদ্মনামের আদ্যক্ষর। তাঁহার ডাকনাম ছিল ‘হেকেটি’।-ইনি প্রাচীন গ্রীকদের ত্রিমুখী দেবী। অন্তরঙ্গেরা রহস্যচ্ছলে এই নামটিতে ডাকতেন। কাদম্বরী দেবীর নারী হৃদয় ত্রিবেণীসংগমক্ষেত্র ছিল। কবি বিহারী লালকে শ্রদ্ধা, স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রকে প্রীতি ও দেবর রবীন্দ্রনাথকে স্নেহদ্বারা তিনি আপনার করিয়া রাখিয়াছিলেন। সেইজন্য অন্তরঙ্গ আত্মীয়রা বলিতেন ত্রিমুখী ‘হেকেটি’। এই নারীর স্নেহ ও শাসন রবীন্দ্রনাথের যৌবনকে সুন্দরের পথে চালিত করিয়াছিল এবং পরবর্তীকালে তাঁহারই পবিত্র স্মৃতি ছিল তাঁহার জীবনের ধ্রুবতারা।
এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের জীবনের দু-একটি ঘটনার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। বিলেত থেকে প্রথমবার ফিরে আসার কয়েকমাস পরেই ব্যারিস্টারি পড়বেন বলে তিনি আবার বিলেত যেতে চান। দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে অনমুতিও দেন। কিন’ তাঁর বিদেশযাত্রার আগেই কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করলে রবীন্দ্রনাথের পরিকল্পনা স’গিত হয়ে যায়। এই আত্মহত্যার প্রয়াস নিয়েই রবীন্দ্রনাথ লেখেন,‘তারকার আত্মহত্যা’ কবিতা (১২৮৮ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ভারতীতে প্রকাশিত এবং সন্ধ্যাসংগীত কাব্যগ্রনে’ সংকলিত)।
ভগ্নহৃদয়ের নতুন উপহার-কবিতা শেষ দুই ছত্রে আছে:
আজিকে বিদায় তবে, আবার কি দেখা হবে,
পাইয়া স্নেহের আলো হৃদয় গাইবে গান?
এই বিদায়গ্রহণের কারন, ১৮৮১-র এপ্রিলে ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিকল্পিত বিলাতযাত্রা। এবারেও অবশ্য তাঁর যাওয়া হয়নি। মাদ্রাজ পর্যন্ত গিয়ে সত্যপ্রসাদের নির্বন্ধে ফিরে এলেন। যখন মাদ্রাজ থেকে ফিরছেন, তখন ‘তারকার আত্মহত্যা’ ভারতীতে মুদ্রিত হচ্ছে।
‘তোমাকেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা’ গানটি তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় যে রূপে প্রকাশিত হয়, গীতবিতানে সেভাবেই সংকলিত হয়। শুধু তত্ত্ববোধিনীতে যা ব্রহ্মসংগীত, গীতবিতানে তা প্রেমের গান।
সূত্র:
১. গীতবিতান, পুনর্মুদ্রণ, কলিকাতা, ১৩৯৪।
২. কানাই সামন্ত-সম্পাদিত, ভগ্নহৃদয়, রবীন্দ্র-পাণ্ডুলিপি-পর্যালোচনা গ্রন’মালা, কলিকাতা, ১৩৮৮।
৩. রবীন্দ্র-রচনাবলী, অচলিত সংগ্রহ, প্রমুখ খণ্ড, পুর্নমুদ্রণ, কলিকাতা, ১৩৬২।
৪. অশোকবিজয় রাহা-সম্পাদিত, রবীন্দ্র-জিজ্ঞাসা, দ্বিতীয় খণ্ড, কলিকাতা, ১৯৬৬।
৫. প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনী, প্রথম খণ্ড, চতুর্থ সংস্করণ, কলিকাতা, ১৩৭৭।