খাপছাড়া
রবীন্দ্রনাথের
শেষ বয়সের
রঙ্গ-ব্যঙ্গ-কৌতুক
ইলিয়াস আহমেদ
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য চর্চার মূল যে ধারা তার বাইরে খানিকটা বেমানান দুটি গ্রন’ – একটি “ক্ষণিকা’, অন্যটি “খাপছাড়া’। দুটি গ্রনে’র রচনাকালের পার্থক্য বিস্তর। ক্ষণিকার প্রথম প্রকাশ ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে। তখন রবীন্দ্রনাথ ৩৯ বছরের যুবক। শিলাইদহের এক ভিন্ন পরিবেশে এবং পাটের, দাদনের ব্যবসা, পরীক্ষামূলক আলু চাষসহ বহুবিধ কর্মকাণ্ডে আগ্রহী যুবা বয়সী রবীন্দ্রনাথের ব্যতিক্রমী সৃষ্টি ‘ক্ষণিকা’র কবিতাবলি। অন্যদিকে ‘খাপছাড়া’ রবীন্দ্রনাথের পরিণত বয়সের চটুল, চপল, রঙ্গ-ব্যঙ্গের ছড়া-কবিতার সঙ্কলন। ‘খাপছাড়া’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩৪৩ বঙ্গাব্দে মোতাবেক ১৯৩৬ সালে। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন পঁচাত্তর। দীর্ঘ জীবনব্যাপী সাহিত্য ও নানাবিধ কর্মের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল তার সঙ্গে ‘খাপছাড়া’ গ্রন’টি একেবারেই বেমানান। এ গ্রনে’র ইলাস্ট্রেশন রবীন্দ্রনাথ নিজেই করেছেন। মুদ্রিতও হয়েছে শান্তিনিকেতনের নিজস্ব মুদ্রণালয়ে। ‘খাপছাড়া’ গ্রনে’র ছড়া-কবিতা যে তাঁর এতকালের গড়া ভাবমূর্তির সঙ্গে যায় না সে সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ পুরোপুরি সচেতন ছিলেন। ‘খাপছাড়া’র উৎসর্গপত্রে সাহিত্য সাধনার মূল সড়ক ছেড়ে ভিন্ন পথে গমনের কৈফিয়ত দিতে গিয়ে তর্ক তুলেছেন, কী কারণে বিধাতার চারটে মুখ? চার রকমের কথা বলার জন্যই তো তাঁর মুখের সংখ্যা চার। কাজেই ‘খাপছাড়া’র রঙ্গ-ব্যঙ্গ কবিতা ভিন্ন রকম কিন’ অযৌক্তিক কিছু নয়।

“যদি দেখো খোলষটা
খসিয়াছে বৃদ্ধের,
যদি দেখো চপলতা,
প্রলাপেতে সফলতা
ফলেছে জীবনে সেই ছেলেমিতে-সিদ্ধের,
যদি ধরা পড়ে সে যে নয় ঐকান্তিক
ঘোর বৈদান্তিক,
দেখো গম্ভীরতায় নয় অতলান্তিক,
যদি দেখো কথা তার
কোনো মানে মোদ্দার
হয়তো ধারে না ধার, মাথা উদ্ভ্রান্তিক,
মনখানা পৌঁছয় ক্ষ্যাপামির প্রান্তিক,
তবে তার শিক্ষার
দাও যদি ধিক্কার
সুধাব বিধির মুখ চারিটা কী কারণে।”

‘খাপছাড়া’র উৎসর্গের ব্যক্তিত্ব নির্বাচনও বেশ অর্থবহ। গ্রন’টি উৎসর্গ করা হয়েছে শ্রীযুক্ত রাজশেখর বসু বন্ধুবরেষুকে। রবীন্দ্রনাথ বন্ধু বলে যাঁকে দাবি করেছেন সেই রাজশেখর বসু তাঁর থেকে বয়সে কুড়ি বছরের ছোট ছিলেন। তবে ১৯২৪ এ ‘গড্ডালিকা’ ও ১৯৩৭ এ ‘হনুমানের স্বপ্ন ইত্যাদি গল্প’ শীর্ষক রাজশেখর বসুর রম্য গল্পের বই পরশুরাম নামে প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা অভিধান ‘চলন্তিকা’ সঙ্কলন-সম্পাদনাও রাজশেখর বসু সম্পন্ন করেছেন ১৯৩৭ এ। রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা পেয়েছিল এ অভিধানটি।

‘খাপছাড়া’ গ্রনে’ মোট ছড়া-কবিতার সংখ্যা ১০৫ টি। সংখ্যা দিয়ে শিরোনাম দেয়া। ৬ নম্বর ক্রমিকের অন্তর্গত ছড়া-কবিতার সংখ্যা তিনটি। সে হিসেবে মোট সংখ্যা ১০৭ টি। এছাড়া রয়েছে উৎসর্গপত্র ও একটি ভূমিকা। তারও আগে রয়েছে বহুল জনপ্রিয় সেই দুটি ছত্রঃ

‘সহজ কথায় লিখতে আমায় কহ যে,
সহজ কথা যায় না লেখা সহজে।’
মূল ছড়া কবিতার বহির্ভূত এ দুটি ছত্রের জনপ্রিয়তার সঙ্গে তুলনীয় মধ্যযুগের পারস্য কবি শেখ সাদীর ‘গুলিস্তাঁ’ এর এ চারটি ছত্রঃ
“বালাগাল উলা বি’ কামালিহি
কাশাফাদ দুজা বি’ জামালিহি
হাসুনাত জামিয়ু খিসালিহি
সাল্লু আলাইহে ওয়াআলিহি।”
এ ছত্র চতুষ্টয়ও অষ্ট সর্গে বিন্যস্ত মূল ‘গুলিস্তাঁ’ বহির্ভূত। এটি ভূমিকার অন্তর্গত।

এরপরও আছে প্রায় একই ভাবের চারটি চরণঃ
‘লেখার কথা মাথায় যদি জোটে,
তখন আমি লিখতে পারি হয়তো,
কঠিন লেখা নয়কো কঠিন মোটে
যা’-তা’ লেখা তেমন সহজ নয়তো।’

কী ধরনের বই ‘খাপছাড়া’, কী তার চরিত্র-বৈশিষ্ট্য, সেটি এক জাদুকরের রূপকে ’ভূমিকা’য় স্পষ্ট করায় প্রয়াস পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। ডুগডুগি বাজিয়ে জাদুকর পথের ধারে আসর সাজিয়ে বসল। চারদিকে অনেক ছেলেপিলে। একটি চাদর বিছিয়ে মন্ত্র পড়ে তার মধ্য থেকে জাদুকর বের করল চড়-ই ছানা, ছেঁড়া ঘুড়ি, জামের আঁটি ইত্যাদি। মন্ত্রপুত চাদরের তলা থেকে জাদুকর আরও বের করলঃ

“টুকরো বাসন চিনে মাটির,
মুড়ো ঝাঁটা খড় ্কে কাঠির,
নলচে-ভাঙা হুঁকো, পোড়াকাঠটা,
ঠিকানা নেই আগুপিছুর,
কিছুর সঙ্গে যোগ না কিছুর,
ক্ষণকালের ভোজ্বাজির এই ঠাট্টা।”

‘খাপছাড়াকে’ রবীন্দ্রনাথ যেমন চিহ্নিত করেছেন ‘ক্ষণকালের ভোজ্বাজির এই ঠাট্টা’, বলে ঠিক তেমনই ‘ক্ষণিকার’ প্রথম কবিতার প্রথম কয়েক ছত্র হচ্ছে,

“শুধু অকারণ পুলকে
ক্ষণিকের গান গারে আজি প্রাণ
ক্ষণিক দিনের আলোকে।”

এ ছড়া-কবিতাগুলো যে ক্ষণিকের কৌতুক, মজার জন্য, তা প্রথমেই ঘোষণা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সিরিয়াস পাঠকের জন্য এটি সতর্কবার্তা।
সত্তরের কোঠায় যখন বয়স তখন কী এক ছেলেমানুষীতে পেয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে ! হাসি-মশকরা-ঠাট্টায় নিমগ্ন। ছড়ায়-কবিতায় শুধু ছন্দই মেলাচ্ছেন না, ওর বিষয়ের সঙ্গে মিলিয়ে মনের অর্গল খুলে স্কেচও আঁকছেন। দু একটির আবার পরিচয়ও লিখছেন – এটি দামোদর শেঠ, এটি সিঁধকাটা চোর। দামোদর শেঠের স্কেচটিতে আঁকিয়ের নামও লিখছেন। লিখছেন আবার সংক্ষেপ করে – রবীন্দ্র। এই একটি মাত্র স্কেচে আঁকিয়ের নামটি আলাদাভাবে লেখা।

‘খাপছাড়া’য় হাসি-তামাশার অজস্র বিষয় – রান্না-বান্না, লেখাপড়া-ইস্কুল, অফিসে বিলম্ব নিয়ে বাবুর উৎকণ্ঠা, বড় ইঞ্জিনিয়ারের করা প্ল্যানে নির্মিত ব্রিজের ধস, সংসার, পণ ইত্যাদি। ডাক্তারদের দুর্বোধ্য লেখার হাত সেকালেও ছিলঃ
পাড়াতে এসেছে এক
নাড়িটেপা ডাক্তার
দূর থেকে দেখা যায়
অতি উঁচু নাক তার।

নাম লেখে ওষুধের
এ দেশের পশুদের
সাধ্য কী পাড়ে তাহা –
এই বড়ো জাঁক তার।
শাসনকার্যে কত যে উদ্ভট ও স্তূল বিষয় ঘটে সেটিও রবীন্দ্রনাথের চোখে বাদ যায়নি।

চর ফিরে তাকে তাকে,
সাধু যদি ছাড়া থাকে,
খোঁজ পেলে নৃপতিরে
হয় তাহা জানাতে,
রক্ষা করিতে তাঁরে,
রাখে জেলখানাতে।

একটি ছড়ায় আমাদের ঢাকা শহরের প্রসঙ্গও এসেছে।
বহুল ব্যবহার আছে ইংরেজি শব্দের। এমন কী ব্রিলিয়ান্ট, ক্যালিফোর্নিয়া, ম্যাসাচুসেটস, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড, রেলিটিভিটির মতো উচ্চারণ-কঠিন শব্দ ছড়া কাটতে রবীন্দ্রনাথ সাবলীল ভাবে ব্যবহার করেছেন। এখানে তাঁর নতুন শব্দ তৈরির প্রয়াসও আছে। উড়িয়ে, বুড়িয়ে, এর সঙ্গে ‘তুড়ি মেরে’ অর্থে ‘তুড়িয়ে’ ব্যবহার করেছেন। তবে দুটি ছড়ায় সুকঠিন অন্ত্যমিল আছে – একটিতে ‘বরিষ্ঠ’, ‘বড়িষ্ট’ও ’দ্রঢ়িষ্ঠ’; অন্যটিতে ‘নক্র’, ‘বক্র’, ও ‘তক্র’।
সব মিলিয়ে ‘খাপছাড়া’ হচ্ছে কৌতুকের চোখে, হালকা চটুল চালে পরিপার্শ্ব দেখার ও দেখানোর এক মহৎ প্রচেষ্টা।

পুুরোনো বানানের কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।