৫ বছর ধরে রাজনৈতিক আশ্রয়ে তারেক রহমান

পাসপোর্ট বিতর্কের ফাঁকে বের হলো অজানা তথ্য

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা

২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দেশ ছেড়েছিলেন তারেক রহমান। বরাবরই বিএনপির তরফে বলা হচ্ছিলো তিনি চিকিৎসার জন্যে সেখানে অবস’ান করছেন। তবে পাসপোর্ট বিতর্কের ফাঁকে জানা গেলো, প্রায় পাঁচ বছর হতে চললো তিনি বৃটেনে আছেন রাজনৈতিক আশ্রয়ে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুটি মামলায় সাজা হয়েছে। বিচারাধীন রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি মামলা। এ অবস’ায় তাকে দেশে ফেরানোর ব্যাপারে সরকারের জোর তৎপরতা রয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুক্তরাজ্য সফরের সময়ে এই তৎপরতায় গতি পায়।
এই সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তারেক রহমানকে যুক্তরাজ্য থেকে ফিরিয়ে আনতে ওই দেশের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। এরপর গত রোববার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ঢাকায় সাংবাদিক সম্মেলন করে একই কথা বলেন। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে বন্দি বিনিময় চুক্তি না থাকলেও সেটি করার কথা জানান আইনমন্ত্রী।
তবে তারেককে দেশে ফেরানোর বিষয়ে সরকারের তৎপরতার মধ্যেই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সৌজন্যে আলোচনায় চলে আসে পাসপোর্ট বিতর্ক। লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বক্তব্যে বলেছিলেন, তারেক রহমান বাংলাদেশি পাসপোর্ট সমর্পণ করে দেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন।
এরপর শুরু হয় তুমুল আলোচনা। বক্তব্য প্রত্যাহার এবং ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে লিগ্যাল নোটিস দেন তারেক রহমান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী গত সোমবার ঢাকায় এসে সংবাদ সম্মেলন করে কিছু নথিপত্র তুলে ধরেন। এ সময় তিনি বলেন, শুধু তারেক নয়, তার স্ত্রী-কন্যার পাসপোর্টও বাংলাদেশ হাইকমিশনে হস্তান্তর করেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে সোমবার বিএনপির
তরফে সংবাদ সম্মেলন করে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, তারেক রহমান পাসপোর্ট জমা দেননি।
এর চব্বিশ ঘণ্টা বাদে গতকাল মঙ্গলবার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানালেন, তারেক রহমান পাসপোর্ট জমা দিয়েছিলেন। তবে তিনি নাগরিকত্ব বর্জন করেননি। দেশের সামগ্রিক পরিসি’তিতে নিজেকে অনিরাপদ বিবেচনা করে তিনি যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন এবং পেয়েছেনও।
মির্জা ফখরুলের বক্তব্য মতে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বৃটেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন প্রায় পাঁচ বছর ধরে। ২০১২ সালে তিনি আবেদন করেছিলেন। সেটি এক বছরের মধ্যেই মঞ্জুর হয়ে যায়। ‘চিকিৎসা শেষ হলে এবং দেশে পরিসি’তি স্বাভাবিক’ হলে তারেক ফিরবেন বলে জানান বিএনপির মহাসচিব।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিলেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। গত ৮ ফেব্রুয়ারি মামলাটির রায় ঘোষণার পর থেকেই তিনি কারাবন্দি। ফলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে লন্ডন থেকে দল পরিচালনা করছেন তারেক রহমান। অবশ্য একই মামলায় তারেক নিজেও ১০ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন।
এর আগে অর্থ পাচার মামলায় তারেক রহমানের সাত বছরের কারাদণ্ড হয়েছিলো। দেশে তার বিরুদ্ধে আরও অনেকগুলো মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বড় মামলা হলো একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা। বাদিপক্ষ ওই মামলায় তারেক রহমানের মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে।
খালেদা জিয়ার কারাবাস, তারেক রহমানের অনুপসি’তি আর কঠোর আন্দোলন সফল করতে ব্যর্থতা বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর মধ্যেই তারেক রহমানের নাগরিকত্ব নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য তেঁতিয়ে দেয় বিএনপিকে।
তবে পাসপোর্টের সঙ্গে নাগরিকত্বের সংযোগ নিয়ে বিশ্লেষকদের যথেষ্ঠ প্রশ্ন রয়েছে। পাসপোর্ট জমা দিলেই নাগরিকত্ব চলে যায় কি-না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী মনসুর হাবিব বলেন, ‘সংবিধানে নাগরিকত্ব পাওয়ার ব্যাখ্যা আছে। কিন’ চলে যাওয়ার কোনো ব্যাখ্যা নেই। আর তারেক রহমান যদি পাসপোর্ট জমা দিয়ে থাকেন, তাহলে নাগরিকত্ব যাওয়ার প্রশ্ন উঠছে কেন? তারেক রহমান তো জন্মসূত্রে বাংলাদেশি। তাহলে এই ধরনের আলোচনা রাজনীতি ছাড়া আর কিছুই না। আমি এটাকে অপরাজনীতি বলবো।’
পাসপোর্ট জমা দেওয়ার পরে দল পরিচালনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। খোদ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিজেও এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।
জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের ভোটার হলেই নির্বাচন করা যাবে। বাংলাদেশি নাগরিকেরা ভোটার হওয়ার যোগ্য।
ধরা যাক তারেক রহমান সত্যি সত্যিই নাগরিকত্ব বর্জন করতে চাইছেন বা করছেন, সেক্ষেত্রে তিনি কি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিতে পারবেন? সাখাওয়াত হোসেনে মতে, ‘আরপিওতে এমন কিছু বলা নেই। এটা যে কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব বিষয়। আমাদের উপমহাদেশে তো এমন উদাহরণ আছে।’