কোটা সংস্কার আন্দোলনের উৎস খুঁজছে সরকার!

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের সামনে সদলবলে দাঁড়িয়ে সহ-সভাপতি আরেফিন সিদ্দিক সুজন জানতে চান, কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কেন সাংগঠনিক ব্যবস’া নেওয়া হচ্ছে না। উত্তরটা ‘রাজনীতির ভাষায়’ দিলেন সভাপতি। দু’জনের অনুসারীদের মধ্যে উত্তেজনার পরিণতি আহত ছয়।
এই উত্তেজনাকর পরিসি’তি এখন বলতে গেলে সারা দেশে। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঘোষণার পরেও ইস্যুটির সমাপ্তি হলো না। গত ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরদিন আন্দোলন স’গিত ঘোষণা করে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা। এর মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করে। শিক্ষার্থীরা রাস্তা থেকে ফিরে যায় ক্লাসে। শুরু হয় পড়াশোনা-পরীক্ষা।
কিন’ এই ইস্যুটির বেলায় ‘শেষ হয়েও হলো না শেষ’। কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের চার নেতাকে নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। চারজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে পড়াশোনা করছেন এবং চারজনের তিনজনই কোনো না কোনোভাবে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তবুও এ আন্দোলনকে জামায়াত-শিবিরের ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বিবেচনায় রেখে তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের তিন যুগ্ম আহ্বায়ককে গতকাল ‘তুলে নিয়ে যায়’ গোয়েন্দা পুলিশ। দুই ঘণ্টার ব্যবধানে তাদের ছেড়ে দিলেও রেশটা দেশব্যাপী ছড়িয়ে গেছে এবং অব্যাহত থাকার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। যদিও পুলিশের দাবি, এই তিনজনকে আলোচনার জন্য ডাকা হয়েছে। কিন’ ‘রিক্সা থেকে নামিয়ে চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়ার’ ঘটনাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেন না আন্দোলনকারীরা।
জানা গেছে, কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে ৮ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের (ভিসি) বাড়িতে নারকীয় হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। সেই রাতের তাণ্ডবে ভিসির বাড়ির ভেতরে বাইরে প্রায় প্রত্যেকটি জিনিষ লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। প্রাণে রক্ষা পান উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ওই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং স’ানীয় প্রশাসন শাহবাগ থানায় আলাদাভাবে চারটি মামলা দায়ের করে। এ মামলাগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় তদন্ত চলছে।
তবে হামলার পর ভিসি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, সাধারণ ছাত্ররা এ ধরনের ন্যাক্কারজনক হামলা করতে পারে না। অনুপ্রবেশকারীরা এ হামলা চালাতে পারে। ভিসির বাড়িতে হামলা নিয়ে ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যের অনেকটা অংশজুড়ে উষ্মা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ঘটনায় জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন তিনি।
এর মধ্যে আন্দোলন স’গিত থাকায় এবং বর্ষবরণের ডামাডোলে কোটা সংস্কার বিষয়ে কোনোরকম উত্তেজনা ছিলো না। গতকাল সোমবার বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় গ্রন’াগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। নেতারা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার পর দাবি জানান, পরবর্তী দুদিনের মধ্যে চারটি মামলা তুলে নিতে হবে। অন্যথায় আবারও আন্দোলন গড়ে তুলবেন তারা। পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন, যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুল হক নুরু, রাশেদ খান, ফারুক হোসেনসহ অন্যরা সংবাদ সম্মেলনে উপসি’ত ছিলেন। দুপুরের খাবার খেতে পার্শ্ববর্তী চাঁনখারপুল এলাকায় যাচ্ছিলেন তাদের কয়েকজন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফটকের কাছাকাছি পৌঁছালে একটি রিক্সার গতিরোধ করে কয়েকটি মোটরসাইকেল। মুহূর্তেই সেখানে হাজির হয় একটি সাদা রঙের হাইয়েচ গাড়ি। এক রিক্সায় থাকা তিনজনকে ধস্তাধস্তি করে নামিয়ে ওই গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়।
সেই তিনজনের ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়িতে তুলেই তাদের চোখ বেঁধে ফেলা হয়। কিছুক্ষণ পরে চোখ খুলে দিলে তারা দেখতে পান একটি কক্ষে নেওয়া হয়েছে। প্রথমে তাদের বলা হয়েছিলো একটি ভিডিওচিত্র দেখানো হবে। পরে তা না করে নাম-ঠিকানা জিজ্ঞেস করে তিনজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই তিনজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরে অধ্যায়নরত।
গতকালের এ ঘটনায় কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নেতাদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রামসহ সারা দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আন্দোলন সংঘটিত করা ছাত্ররা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকা প্রকাশ করছেন। গতকাল রাশেদের দিনমজুর পিতাকেও থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নেতারা বলছেন, তাদের পরিবার নিয়ে টান দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের একাধিক নেতা সুপ্রভাতকে বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন সফল হওয়ায় তারা প্রথমদিকে খুবই স্বস্তিতে ছিলেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নিজের মুখে ঘোষণা দেওয়ায় তারা বিশ্বাস করছিলেন যে, সারা দেশের ছাত্র ও চাকরিবঞ্চিত তরুণ-যুবকদের প্রাণের দাবি সফল হতে চলেছে। কিন’ ‘চোখ বেঁধে তুলে নেওয়ার’ ঘটনার পর সেই বিশ্বাসে চিড় ধরে গেছে। এখন কেবল তাদের দাবি নয়, জীবনও শংকিত বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে, গতকালের ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে তারা আবারও আন্দোলন শুরুর হুমকি দিয়ে রাখছেন।
অন্যদিকে, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াত-শিবির সমর্থকদের সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন ওঠায় প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে বলে জানা গেছে। এই আন্দোলনে নেপথ্যে কোনো অশুভ শক্তি কলকাঠি নাড়ছে কি-না সে বিষয়েও তদন্ত চলছে। এর অংশ হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়া নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। তবে গতকাল গোয়েন্দা পুলিশ তাদের তেমন কিছু প্রশ্ন না করায় পুলিশের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সূত্র জানিয়েছে, এই আন্দোলনে ক্ষমতাসীন দলের কোনো প্রতিপক্ষের ইন্ধন বা উসকানি আছে কি-না, তা আগে নিশ্চিত হতে চায় সরকার। এর জন্য আন্দোলনের একেবারে সূচনা থেকে ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।