মুজিবনগর সরকারের কাঠামো ও মুজিববাহিনী

মো. আসলাম হোসেন

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ঘোষণা করেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা”। এই ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে শৃঙ্খলমুক্ত করার আহবান জানিয়ে বললেন, “রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব। তবুও এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশা আল্লাহ্……। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। যার যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।”
বঙ্গবন্ধুর এই কালজয়ী ঘোষণার পর বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিসংগ্রামের চূড়ান্ত প্রস’তি গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ রাত্রে অয়ারলেস যোগে স্বাধীনতার ঘোষণা সারাদেশে ছড়িয়ে দেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কারণেই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত দেড়টায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রথমে ক্যান্টনমেন্টে, পরে পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ে যায়। গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের যে নির্দেশনা প্রদান করেন তদনুযায়ী নেতাগণ এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহেই ভারত গমন করেন।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর থেকে জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকার গঠন করা হয়। এর মাধ্যমে ইতিপূর্বে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রতিপাদন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়। রাষ্ট্রপতি পাকিস্তানে অন্তরীণ থাকার কারণে উপরাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের এখতিয়ার দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার (পরবর্তী নামকরণ মুজিবনগর) আম বাগানে অস’ায়ী বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে গার্ড অব অনার দেওয়ার জন্য কয়েক প্লাটুন ইপিআর ও মুক্তিযোদ্ধা মোতায়েন করা হয়। অনুষ্ঠান শুরু হয় বেলা ১১ ঘটিকায়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম যখন পতাকা উত্তোলন করছিলেন তখন কয়েকজন শিল্পী সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি পরিবেশন করেন। এরপর সৈয়দ নজরুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করেন এবং উপসি’ত সকলকে মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। অনুষ্ঠানে অস’ায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভাষণ দেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। মুজিব নগর সরকারের কাঠামো ছিল নিম্নরূপ :
মুজিবনগর সরকার
রাষ্ট্রপতি : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (পাকিস্তানের কারাগারে অন্তরীণ)
উপরাষ্ট্রপতি : সৈয়দ নজরুল ইসলাম (রাষ্ট্রপতির অনুপসি’তিতে অস’ায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন)
প্রধানমন্ত্রী : তাজউদ্দিন আহমদ
আইন ও পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী : খোন্দকার মোশতাক আহমদ
অর্থমন্ত্রী : এম. মনসুর আলী
স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী : এ.এইচ.এম কামরুজ্জামান
সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান : কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী
চিফ অব স্টাফ : লে. কর্নেল (অব.) আবদুর রব
বিভাগীয় প্রধানগণ : মুজিব নগর সরকারের বিভিন্ন বিভাগের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন আবদুর মান্নান (সংবাদপত্র, তথ্য, বেতার ও চলচ্চিত্র); অধ্যাপক ইউসুফ আলী (ত্রাণ ও পুনর্বাসন); মতিউর রহমান (বাণিজ্য); ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম (ভলান্টিয়ার কোর)। আঞ্চলিক প্রধানগণ : মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য অঞ্চল ভিত্তিক যাদের দায়িত্ব দেয়া হয় তারা হলেন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী, এমএনএ এবং জহুর আহম্মদ চৌধুরী, এমপিএ (দক্ষিণপূর্ব অঞ্চল); দেওয়ান ফরিদ গাজী, এমএনএ এবং শামসুর রহমান খান (উত্তরপূর্ব অঞ্চল); লে. কর্নেল এম.এ. রব, এমএনএ (পূর্বঅঞ্চল); মতিউর রহমান এবং আবদুর রউফ, এমএনএ (উত্তর অঞ্চল) আজিজুর রহমান এবং আশরাফুল ইসলাম, এমএনএ (পশ্চিম অঞ্চল) এম.এ রউফ, এমপিএ এবং ফণীভূষণ মজুমদার, এমপিএ (দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল)।
আঞ্চলিক অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা : ফয়েজ উদ্দিন আহমদ; এস.এ সামাদ; কাজী রকিব উদ্দিন আহমদ; আবদুর রব সেরনিয়াবাত আঞ্চলিক অফিসের দায়িত্ব পালন করেন
মুজিবনগর সরকারের সচিবালয় : সরকারের সচিবালয়ে ৯টি বিভাগের দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা হলেন রুহুল কুদ্দুস (মুখ্য সচিব); নুরুল কাদের খান (সংস’াপন সচিব); আবদুল খালেক (স্বরাষ্ট্র সচিব); আবদুস সামাদ (প্রতিরক্ষা সচিব); আনোয়ারুল হক খান (তথ্য সচিব) মাহবুব-উল-আলম চাষী (পররাষ্ট্র সচিব); হোসেইন তৌফিক ইমাম (মন্ত্রিপরিষদ সচিব); খন্দকার আসাদুজ্জামান (অর্থ সচিব); নুরুদ্দিন আহমদ (কৃষি সচিব)।
কূটনৈতিক প্রতিনিধি : বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী (বিশেষ কূটনৈতিক প্রতিনিধি); হুমায়ান রশীদ চৌধুরী (নয়াদিল্লিস’ বাংলাদেশ মিশন প্রধান); হোসেন আলী (কলকাতাস’ বাংলাদেশ মিশন প্রধান) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরিকল্পনা কমিশন : মুজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী (চেয়ারম্যান); সদস্য ড. মোশারফ হোসেন, ড. আনিসুজ্জামান, ড. খান সরোয়ার মুর্শিদ এবং ড. স্বদেশ রঞ্জন বোসকে নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন মিশন গঠিত হয়।
অধিদপ্তর : মন্ত্রণালয়ের অধীনস’ অধিদপ্তরগুলোতে যারা দায়িত্বপালন করেন তারা হলেন উইং কমান্ডার এস. আর মির্যা (পরিচালক, যুব শিবির); এম. আর আখতার মুকুল (পরিচালক, তথ্য ও প্রচার দফতর); আব্দুল জব্বার খান (পরিচালক, চলচ্চিত্র দফতর); কামরুল হাসান (পরিচালক, শিল্পকলা দফতর); জে.জি ভৌমিক (ত্রাণ কমিশনার); ডা. টি হোসাইন (পরিচালক, স্বাস’্য); ডা. আহমদ আলী (সহকারী পরিচালক, স্বাস’্য)।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র : ১৯৭১ সালে বর্তমানকালের মতো ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং প্রিন্ট মিডিয়া এত উন্নত ছিল না। তদানীন্তন পূর্ব-পাকিস্তানের সরকার নিয়ন্ত্রিত রেডিও টেলিভিশনে মুক্তিযুদ্ধের কোন সংবাদ প্রচার নিষিদ্ধ ছিল। তাই দেশের জনগণ সেদিন কেন্দ্র থেকে রণাঙ্গনের সংবাদ পেত, মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের খবর শুনে উল্লসিত হতো সেটি ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন আশফাকুর রহমান খান, শহীদুল ইসলাম, টি. এইচ শিকদার, বেলাল মোহাম্মদ এবং তাহের সুলতান। কামাল লোহানী (বাংলা সংবাদ), আলী যাকের (ইংরেজি সংবাদ), আলমগীর কবির (ইংরেজি সংবাদ ধারাবিবরণী), জাহিদ সিদ্দিকী (উর্দু প্রোগ্রাম), সমর দাস ও অজিত রায় (সঙ্গীত) হাসান ইমাম (নাটক), আশরাফুল আলম (সমপ্রচার ও সাক্ষাৎকার), সৈয়দ আবদুশ শাকুর এবং রেজাউল করীম চৌধুরী (প্রকৌশল বিভাগ)।
মুজিব বাহিনী : বিশ শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মুজিব বাহিনী গঠন সম্পর্কিত ধারণার উন্মেষ ঘটে বলে ধারণা করা হয়। সে সময় কতিপয় জাতীয়বাদী বুদ্ধিজীবী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে এটি একটি একাডেমিক চিন্তা হিসেবে লালিত হত।
মুজিব বাহিনীর অগ্রণী সংগঠকরাই একসময় সর্বদলীয় ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন এবং তাঁরাই ছিলেন ১৯৬৯ সালের এগারো দফা কর্মসূচির প্রবক্তা। তাঁরা ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানেও নেতৃত্ব দেন ১৯৭১ সালে ১ মার্চ থেকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনা করেন, ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং যুক্তিযুদ্ধের পথে সার্বিক প্রস’তি সংগঠিত করেন।
আওয়ামী লীগ ও ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের তরুণ ও শিক্ষিত কর্মীদের নিয়ে এই বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। প্রায় পাঁচ হাজার সদস্যের এ বাহিনীকে চারটি সেক্টরে ভাগ করা হয় এবং এর নেতৃত্বে ছিল ১৯-সদস্যের কেন্দ্রীয় কমান্ড। প্রথম দিকে সেক্টর কম্যান্ডারগণ ভারতের ব্যারাকপুর, শিলিগুড়ি, আগরতলা ও মেঘালয় থেকে নিজ নিজ বাহিনী পরিচালনা করতেন। এ বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডার ছিলেন তোফায়েল আহমদ, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও শেখ ফজলুল হক মনি। শেখ ফজলুল হক মনি বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল উবানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দেরাদুন পাহাড়ি এলাকায় এ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।যুদ্ধক্ষেত্রে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুজিব বাহিনী যুদ্ধ করেছে। তারা দখলদার পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গন এবং ঢাকার আশেপাশে বেশ কিছু দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করে। মুজিব বাহিনীর সদস্যগণ গেরিলা রণকৌশলে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ছিল এবং তারা ছিল তুলনামূলকভাবে উন্নত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত।
স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রারম্ভে বাংলাদেশ সরকার (মুজিব নগর সরকার) গঠন ছিলো একটি বৈপ্লবিক কাজ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কনসেপ্ট অনুসারে ছিলো অবশ্য পালনীয় কাজ। যুদ্ধের জন্য দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। ১৯টি যুব শিবির ও প্রতিষ্ঠা করা হয় রিক্রুটমেন্টের জন্য।
এর ফলে নিয়মিত সৈন্যবাহিনী, মুক্তিবাহিনী, মুজিববাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী এবং দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন গেরিলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের কাজটি শৃঙ্খলার সাথে করা সহজ হয়। মুজিব নগর সরকার যুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে একটি উপদেষ্টা পরিষদও গঠন করে।
এতে মাওলানা ভাসানী, ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড মনি সিং, কংগ্রেস নেতা মনোরঞ্জন ধর এবং অস’ায়ী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা যুক্ত হন।

লেখক : অধ্যক্ষ,
ডা. ফজলুল-হাজেরা ডিগ্রী কলেজ