শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে

ফজলুল কবির মিন্টু

সরকার বিগত ১৪ জানুয়ারি ২০১৮ পোশাক শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি বোর্ড ঘোষণা করেছে। উক্ত মজুরি বোর্ড কর্তৃক ৬ মাসের মধ্যে পোশাক শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করার কথা রয়েছে। কিন’ বিগত ১৯ মার্চ একটা সভা করা ছাড়া মজুরি বোর্ডের তেমন কোন দৃশ্যমান তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়নি। আগমী ২৫ এপ্রিল ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের ২য় সভা অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত সভায় একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তের প্রত্যাশায় ৪০ লক্ষ পোশাক শ্রমিক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
আমাদের অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি পরিবারের ন্যূনতম খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম ব্যয় হয় ২৫২ মার্কিন ডলার অর্থাৎ প্রায় ২০০০০ টাকা। পোশাক শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ১৬০০০ টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি উঠেছে। সরকারের সর্বশেষ পে স্কেলে সর্বনিম্ন মূল মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮২৫০ টাকা যা সর্বসাকুল্যে দাঁড়ায় ১৪৫০০ টাকা এবং সমপ্রতি ট্যানারি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২৮০০ টাকা এবং জাহাজ ভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১৬০০০ টাকা ঘোষণা করায় এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ভার বিবেচনায় এই দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
বাংলাদেশ জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অংশীদার। জাতিসংঘ ২০৩০ সালের মধ্যে উক্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। টেকসই উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হচ্ছে শোভন মজুরি নিশ্চিত করা ও আয় বৈষম্য কমানো। কিন’ দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে আয় বৈষম্য কমার বদলে দিন দিন বাড়ছে। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও শ্রমজীবী মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারছে না।
বিগত ১৬ মার্চ ২০১৮ ইং তারিখে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের যোগ্য বলে ঘোষণা দিয়েছে। তারও আগে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে ঘোষণা দিয়েছিল। বিশ্বব্যাংক এবং জাতিসংঘের এরূপ স্বীকৃতি আনন্দের সংবাদ হলেও দেশের প্রায় ছয় কোটি শ্রমিক কি আনন্দিত হতে পারছে?
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। বৈদেশিক আয়ের ৮০% আয় হয় এই খাত থেকে। প্রায় চল্লিশ লক্ষ শ্রমিক এই শিল্পের সাথে জড়িত রয়েছে। আশির দশকে শুরু হওয়া এই শিল্প নিজে বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংক ও বীমাসহ আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট আরো অনেক খাতকেও বিকশিত করে দেশের অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করে চলেছে। কিন’ এই শিল্পের অন্যতম চালিকা শক্তি ৪০ লক্ষ পোশাক শ্রমিকের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হচ্ছে না। গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির প্রসঙ্গ উঠলেই মালিকরা সমস্বরে বলতে থাকেন, বাংলাদেশের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কম। কিন’ ২০১৩ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক ইউএসএআইডির এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন দক্ষতার সঙ্গে ব্যবস’াপনা করা হয় এমন সব প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা চীনের শ্রমিকদের সমান।
শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে ব্যবস’াপনার দক্ষতার উপর। আমাদের দেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা যদি এতই কম হতো তাহলে এই শিল্প কখনো এত বিকশিত হতে পারতো না। যাদের শ্রম ও ঘামের উপর ভর করে এই শিল্প আজ শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে তাদের দক্ষতার বিষয়টি মালিক, রাষ্ট্র কিংবা বিদেশি ক্রেতা কোন পক্ষই কখনো আমলে নেয়নি। বরং সস্তা শ্রমকে ব্র্যান্ডিং করে এদেশের গার্মেন্টস শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যার খেসারত হিসাবে আজও শ্রমিকরা কম পারিশ্রমিক নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
তৈরি পোশাক গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনভুক্ত একটি পণ্য। এই পণ্যের সাপ্লাই চেইনকে বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই সাপ্লাই চেইনের মধ্যে রয়েছে ডিজাইন, উৎপাদন (শ্রম), পরিবহন ও বিপণন। দীর্ঘ ৪ দশকের বেশি সময় পার করার পরেও বাংলাদেশের মালিক শ্রেণি কেবল শ্রম বিপণন করা ছাড়া সাপ্লাই চেইনের আর কোথাও অবদান রাখার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। সাপ্লাই চেইনে সবচেয়ে বেশি আয় হয় ডিজাইন অংশে আর সবচেয়ে কম আয় হয় উৎপাদন অংশে। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ব্যবসা করার পরও সাপ্লাই চেইনের অন্য কোথাও তেমন অবদান রাখতে না পারায় বাংলাদেশের মালিকরাও অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই তারা শ্রম শোষণ করেই তাদের লাভের পরিমাণ বাড়ানোর প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।
শ্রমিক কম মজুরি পাওয়ার কারণে, একজন শ্রমিকের যে পরিমাণ ক্যালরি প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক কম ক্যালরি গ্রহণ করে তাকে দিনাতিপাত করতে হয়। ফলে তারা অপুষ্টিতে ভোগে। শ্রমিকের কর্মক্ষমতা ও কর্মদক্ষতার উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অল্প বয়সেই অধিকাংশ শ্রমিককে বার্ধক্য গ্রাস করে। পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১৬০০০ টাকা কোন উচ্চআকাঙ্ক্ষাপ্রসূত দাবি নয় বরং এই মজুরি পেলে শ্রমিক কাজ করতে সক্ষম থাকা অবস’ায় কোন মতে খেয়ে পরে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবে। এই মজুরি এতই ন্যূনতম যে, এখানে কোনভাবেই তার এক টাকাও সঞ্চয় করার সুযোগ নাই। ফলে অসুস’তা কিংবা দুর্ঘটনাজনিত কারণে কোন শ্রমিক কাজ করতে অক্ষম হলে কিংবা বৃদ্ধ বয়সে সে কিভাবে জীবন নির্বাহ করবে সে প্রশ্নের জবাব বরাবরই অমীমাংসিত রয়ে যায়।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক অন্যান্য দেশ- কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে অবকাঠামোগত সুবিধা কম থাকার কারণে ঐ সব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শ্রমিকরা কম মজুরি পায় বলে মালিক পক্ষ থেকে বলা হয়। যত দোষ নন্দ ঘোষের মত অবকাঠামো সুবিধা কমের দায়ও যেন শ্রমিকের।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রক্ষার জন্য গার্মেন্টস শ্রমিকদের অবদান প্রশ্নাতীত। রানাপ্লাজা ধ্বস, তাজরিন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ড, স্পেকট্রাম দুর্ঘটনায় কয়েক হাজার শ্রমিক প্রাণ হারানোর পরও শ্রমিক শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। দৈনিক ১৪/১৫ ঘণ্টা কাজ করেও তারা বাঁচার মত মজুরি পাচ্ছে না। বরং মালিকদের অপরিকল্পিতভাবে অর্ডার নেয়ার কারণে প্রায়শ দেখা যায় প্রতিটি রপ্তানির আগে পোশাক শ্রমিকরা বিশেষত ফিনিশিং শাখার কর্মচারীদের বিরামহীন ৪৮ ঘণ্টা কিংবা ৭২ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। শ্রমিকেরা যদি এই ত্যাগটুকু না করতো তাহলে অধিকাংশ অর্ডার স্টকলট হয়ে যেতো এবং অনেক আগেই গার্মেন্টস শিল্প রুগ্ন হয়ে যেতো তাই শ্রমিক ঠকিয়ে, কম মজুরি দিয়ে শিল্পরক্ষার ভ্রান্ত ধারণা পরিহার করতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা বুঝিয়ে দিয়েই শিল্প রক্ষা করতে হবে। রাষ্ট্র, মালিক এবং বিদেশি ক্রেতা সবাইকে মনে রাখতে হবে- শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে।

লেখক : ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠক