চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা

অসাম্প্রদায়িকতা ও বাঙালিয়ানার জয়গান

আজিজুল কদির
Mongol-Shobajatra_Charukola

পহেলা বৈশাখ মানে ধর্ম-বর্ণ, ভেদাভেদ ভুলিয়ে-দেওয়া অসামপ্রদায়িকতা আর বাঙালিয়ানার জয়গান। সার্বজনীন এ উৎসব উদযাপনের মধ্য দিয়ে বাংলার সব মানুষ এক হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে। পহেলা বৈশাখ মানে বাঙালিসংস্কৃতির পরিচয়বাহী নানা উপকরণ, রঙ-বেরঙের মুখোশ, শাড়ি, ধুতি আর পাঞ্জাবির মতো বাঙালি সাজে নিজেকে সাজিয়ে-রাঙিয়ে ঘুরে বেড়ানো। নগরে এদিনের আয়োজনে সবচেয়ে বড় আকর্ষণটা হলো চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা।
এবার উন্নয়নের শপথে, সকল অপশক্তিকে রুখে দেয়ার প্রত্যয়ে বন্দরনগরীতে অনুষ্ঠিত হল মঙ্গল শোভাযাত্রা। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘উন্নয়নের অভিযাত্রায় গর্বিত বৈশাখ’।
মঙ্গলের বারতা নিয়ে এই শোভাযাত্রা শুরু হয় নগরীর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণ থেকে। সকাল থেকে চারুশিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার মানুষে ভরে যায় পুরো ক্যাম্পাস।
শোভাযাত্রার অনতম আকর্ষণ ছিল বিচিত্র মোটিফ নিয়ে বিশালকার লক্ষ্মীপেঁচা, লালঝুঁটির মোরগ, টাট্টু ঘোড়াসহ বিচিত্র মুখোশের প্ল্যাকার্ড। চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিল্পীদের উদ্যোগে হওয়া এই শোভাযাত্রায় সব শ্রেণির মানুষই ভিড় করে। তারা মুখোশ-সাজসজ্জা ও বাদ্যযন্ত্রের তালে নৃত্যগীতে মেতে ছিল মুখর এক পরিবেশে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ও চারুকলা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক প্রণব মিত্রচৌধুরী বলেন, ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রকাশ্য আস্ফালন চলছে। এরা নারীদের শিক্ষা-চাকরি ও শিল্প-সংস্কৃতিসহ যাবতীয় সুকুমারবৃত্তির বিরোধী। সব মিলিয়ে অশুভের আস্ফালনে-আক্রমণে জর্জরিত আমরা। এখন আমাদের প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ হওয়া। এক কাতারে দাঁড়ানো। কেননা যখন বাঙালি কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে এক কাতারে দাঁড়ায়, তখনই সে অদম্য, অজেয়। ভাষা আন্দোলন, ৬৯-র গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, এমনকি নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী মহাআন্দোলন এসবের জ্বলন্ত সাক্ষী। মঙ্গল শোভাযাত্রা কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে আমাদের একত্রিত হবার প্রেরণা যোগায়।
শোভাযাত্রায় দেখা গেছে শাড়ির সাথে মিলিয়ে নারীরা খোঁপায় গুঁজেছে ফুলের মালা। ঢাকঢোলের বাদন আর হাজারো নারী-পুরুষের সমাগমে শোভাযাত্রাটি যাচ্ছে তার নিজ গন্তব্যে। এ যেন বাঙালি সংস্কৃতির চিরচেনা রূপ।
শোভাযাত্রায় অংশ নেয়া চারুকলার প্রাক্তন ছাত্র শামসুল আলম সোহেল বলেন, শত ব্যস্ততার মধ্যে বছরের এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করি। গোটা দেশ এই শোভাযাত্রাটির মধ্যে হেসে ওঠে আনন্দে, জয়োল্লাসে। এভাবে জয়ী হবে বাঙালির আবহমান সংস্কৃতি। বিষণ্নতার গুমোট বাষ্পটি উবে যাবে লক্ষ কোটি বাঙালির মন থেকে। অন্তত একটি দিনের জন্য হলেও। সেই সাথে মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে এক সর্বজনীন মাঙ্গলিকতাও ছড়িয়ে পড়বে।
অন্যদিকে তৃতীয়বর্ষের ছাত্র অনীকের মতে, আমাদের যে ঐতিহ্য তা মূলত প্রাণে প্রাণ মেলাবার। হিংসা ও বিভাজনের নয়। এদেশ শত শত বছর ধরে নানান বর্ণ, উদ্ভাস ও বৈচিত্র্য মিশিয়ে সমপ্রীতির অভিন্ন এক মালা গেঁথে আছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা সেই অভিন্নতার, প্রেমের মন্ত্রকেই বড় করে তুলছে। দীক্ষা দেবে মিলনের, মহানুভবতার। সবাইকে মেলাবে এক তারে; অভিন্ন মাঙ্গলিক আবাহনে।
চারুকলার বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রদের অংশগ্রহণে মঙ্গল শোভাযাত্রাটি নগরীর বাদশা মিয়া রোড়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের হয়ে চট্টেশ্বরী রোড়, কাজীর দেউড়ি, আসকারদীঘির পাড়, জামালখান, প্রেসক্লাব হয়ে আবারও আসকারদীঘির পাড় হয়ে সার্সন রোড, চট্টেশ্বরী মোড় হয়ে ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় নারী-পুরুষের পাশাপাশি ছোটদের উপসি’তিও ছিল চোখে পড়ার মতো। তারাও বড়দের সাথে নেচে-গেয়ে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ছিল।
এদিকে বিকেলে ক্যাম্পাসের উম্মুক্ত মঞ্চে শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে আদিবাসী নাচ, গান, আবৃত্তি, বাউল গানে উপসি’ত দর্শকদের মাতিয়ে রাখে চারুশিক্ষার্থীরা। নিরপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিকেল ৫টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে হয়।