বর্ষবরণ উৎসবে প্রাণের স্পন্দন

নিজস্ব প্রতিবেদক

মেয়েকে নিয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে এসেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম। সঙ্গে স্ত্রীও। পরিবার নিয়ে দীর্ঘদিন বসবাস করছেন জামালখান এলাকায়। ডিসি হিলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো তিনি খুব মিস করেন। তাই প্রশ্নের উত্তরে ছিল ক্ষোভ আর প্রতিবাদ।
শহিদুল ইসলাম বলেন, কর্মস’ল আর বাসা কাছাকাছি হওয়াতে প্রায় সময় পরিবার নিয়ে ঘুরতে বের হই। বন্ধের দিন তো অবশ্যই। এই ডিসি হিলে আগে কত প্রাণ ছিল। অনুষ্ঠান আর অনুষ্ঠান। কিন’ এখন মানুষের আনাগোনা পর্যন্ত নেই। কোন অদৃশ্য শক্তি প্রাণের ডিসি হিলকে এমন নিষ্প্রাণ করে দিল, জানি না। তবে এটি ষড়যন্ত্র। সংস্কৃতি থেকে মানুষকে বিযুক্ত করতে কোনো চক্র কাজটি করছে।
সংস্কৃতিকর্মী উর্মির কথায়ও একই রেশ। আগে প্রতি সপ্তাহে তিনি ডিসি হিল আসতেন। এখন আর সুযোগ হয় না। কারণ অনুষ্ঠান করতে দেয় না প্রশাসন।
সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম ৪০ বছর ধরে ডিসি হিলে নববর্ষের অনুষ্ঠান আয়োজন করছে। যেটি নগরবাসীর প্রাণের অনুষ্ঠানের রূপ নিয়েছে। কিন্ত এক বছর ধরে প্রশাসন ডিসি হিলে অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দিতে কড়াকড়ি আরোপ করছে। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান নিয়েও চলেছে নানা দেন-দরবার। যদিও শেষ পর্যন্ত অনুমতি পেয়েছে আয়োজকরা।
তাই এবারের উৎসবে আনন্দের মাঝে প্রতিবাদও ছিল। অনুষ্ঠানের মাঝখানে আয়োজকরা মঞ্চে একটি প্রতিবাদ চিত্রও প্রদর্শন করে। অনুষ্ঠানে আসা দর্শকের মুখে মুখেও ছিল প্রতিবাদ।
‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির উৎসব, সবার যোগে জয়যুক্ত হোক’ স্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে এবারের অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। সকালে রক্তকরবীর পরিবেশনা দিয়ে শুরু হয় উৎসব।
সকাল থেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে মেলায় আসতে শুরু করে নগরবাসী। বেলা বাড়ার সাথে সাথে কানায় কানায় পূর্ণ হয় ডিসি হিল চত্বর। রঙ-বেরঙের পোশাকে উৎসবে আসা মানুষের অংশগ্রহণে যেন রঙের ঢেউ লাগে বছরের প্রথম দিনটিতে। কড়া রোদ আর ভ্যাপসা গরম উপেক্ষা করে নগরবাসী মেতে ওঠে উৎসবের আনন্দে।
দুপর্বের অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে ছিল গান, নাচ ও আবৃত্তি। গান পরিবেশন করে সুরসাধনা সংগীতালয়, গীতধ্বনি, জয়ন্তী, ছন্দানন্দ, গুরুকুল সংগীত একাডেমি, খেলাঘর ও বংশী শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা।
এরপর স্বরনন্দন প্রমিত বাংলাচর্চা কেন্দ্র, বোধন আবৃত্তি পরিষদ, প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের শিল্পীরা আবৃত্তি করে।
নৃত্য পরিবেশন করে ওড়িশী অ্যান্ড টেগোর ডান্স মুভমেন্ট সেন্টার, স্কুল অব ওরিয়েন্টাল ডান্স, গুরুকুল, নৃত্যম একাডেমি, ঘুঙুর নৃত্যকলা কেন্দ্রের শিল্পীরা।
অন্যদিকে ডিসি হিলের আশপাশ এলাকায়ও উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। এসব এলাকায় বসে বৈশাখী মেলা। মেলায় গৃহস’ালি পণ্য, মাটির তৈরি পণ্য, শিশুদের খেলনা, খাবারসহ নানা দ্রব্যের সমাহার ছিল।
এছাড়াও কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ডিসি হিলকে উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়ে মানববন্ধন করে। সংগঠনগুলো ডিসি হিলকে সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহবান জানায়।
দ্বিতীয়পর্বের অনুষ্ঠান শুরু হয় বেলা দুটার পর। উৎসবের ইতি টানা হয় বিকেল পাঁচটায়।
উল্লেখ্য, গত ২৩ সেপ্টেম্বর গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন ডিসি হিলে বৈশাখ, রবীন্দ্র ও নজরুল জয়ন্তী ছাড়া অন্য কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন না করার আহ্বান জানান। এরপর থেকে প্রশাসন অনুষ্ঠানের অনুমতি দেয়া বন্ধ করে দেয়।

নগরীর সুশীতল ছায়া ও বাতাসঘেরা উন্মুক্ত একটি স’ান সিআরবি’র শিরীষতলা। দশমবারের মত এখানে সমপন্ন হলো বর্ষবরণ উৎসব। নগরীর ডিসি হিলের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি মানুষের সমাগম যেখানে হয়, সেটি এই শিরীষতলা। শিরীষতলার সাংস্কৃতিক উৎসব মাতিয়ে তুলেছে হাজারো দর্শনার্থীকে। এর সাথে যুক্ত ছিলো বলীখেলা।
নববর্ষ উদযাপন পরিষদের আয়োজনে সকাল পৌনে আটটায় ভায়োলিনিস্ট চিটাগাংয়ের শিল্পীদের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ বাদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণ উৎসব। প্রথম অধিবেশনে দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেয় ২২টি সাংস্কৃতিক সংগঠন। বিকেলে ঢাকার সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণের পরিবেশনার পর একক সংগীত পরিবেশনা করেন নাফিজা শামীম প্রাপ্তি, পাপড়ি ভট্টাচার্য, ইকবাল হায়দার, বিমল বাউল, সঞ্জিত আচার্য ও আবদুর রহিম।
বর্ষবরণকে ঘিরে বাঁশ-বেত-তালপাতার হাতপাখা, প্লাস্টিকের ঢোল, খেলনা, শো-পিস, বেলুন ইত্যাদি নিয়ে যথারীতি বসেছে বৈশাখী মেলা। শিশুরা মেতে ওঠে খেলনা কেনায়। সপরিবারে বর্ষবরণ উৎসবে এসেছিলেন গৃহিনী সুপ্রিয়া চৌধুরীও। তিনি বলেন, ছায়াঘেরা আর বাতাসযুক্ত বলে সিআরবি’র শিরীষতলাই আমার পছন্দের। পহেলা বৈশাখে তাই পরিবার নিয়ে এখানে ঘুরতে আসি। গাছের ছায়ায় বসে অনুষ্ঠান উপভোগের মজাটাই আলাদা।
নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে দুপুরে সিআরবির সাত রাস্তার মোড়ে শুরু হয় সাহাবউদ্দীনের বলীখেলা। নববর্ষ উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রামের উদ্যোগে আয়োজিত বলীখেলায় অংশ নেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ৭০ জন খেলোয়াড়। বলীখেলার উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক।
বলীখেলা উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহবায়ক কাউন্সিলর জহর লাল হাজারী বলেন, বলীখেলা আমাদের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যকে ধারণ করেই সিআরবিতে সাহাবউদ্দীনের বলীখেলার আয়োজন করা হয়েছে। এবার উখিয়া, রামু, চকরিয়া, বাঁশখালীসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে ৭০ জন বলী অংশ নিয়েছেন।
বলীখেলায় চ্যাম্পিয়ন হন কুমিল্লার শাহজালাল বলী। চূড়ান্ত রাউন্ডের খেলায় উখিয়ার কলিম উল্লাহকে কৌশলে পরাস্ত করেন কুমিল্লার শাহজালাল বলী। এর আগে ৭০ বলীর মধ্য থেকে ৮ বলীকে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার সুযোগ দেন আয়োজকেরা। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে কলিমউল্লাহ, শাহজালাল, নজরুল ও হোসেন বলী সেমিফাইনালে উন্নীত হন। সেমিফাইনাল থেকে কলিম উল্লাহ ও শাহজালাল বলী ফাইনালে উন্নীত হন। খেলা পরিচালনা করেন সাবেক কাউন্সিলর মো. মালেক।
খেলায় বাড়তি বিনোদন জোগান ফ্রান্সের দুই নাগরিক। খেলায় হঠাৎ দুই ফরাসী যুবক রিংয়ে (বলীদের জন্য প্রস’ততকৃত মাটির মাঠ) ওঠে পড়েন তারা। পরে বলীখেলা আয়োজক উপ-কমিটির আহবায়ক মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিনের কাছে গিয়ে খেলায় অংশ নেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন ফ্রান্সের নাগরিক জুমার্কা ও জুসিকা।
অনুমতি পেয়ে কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে বলীখেলার জন্য প্রস’তি নিতেই দর্শনার্থীরা করতালির মাধ্যমে তাদের অভিবাদন জানান। রেফারির কাছ থেকে বলীখেলার নিয়ম-কানুন জানার পর শুরু হয় দুই ফরাসীর ‘বলীযুদ্ধ’। ওই দুই ফরাসী যুবক বলীখেলায় অংশ নিতে রিংয়ে উঠতেই উপসি’ত দর্শনার্থীরা কলতালিতে মুখর করে তোলেন সিআরবি প্রাঙ্গণ। এসময় ফরাসী দুই যুবক নানা ভঙ্গিমায়, হাত নাড়িয়ে শ্রোতাদের আরো উৎসাহিত করে তোলেন। মিনিট তিনেকের লড়াইয়ে জুসিকাকে পরাস্ত করে বিজয় ছিনিয়ে নেন জুমার্কা। সাথে সাথে দর্শনার্থীরা করতালির মাধ্যমে তাদের আবারও স্বাগত জানান। পরে বলীখেলা আয়োজক উপ-কমিটির আহবায়ক মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিন নিজেই তাদের দুজনের গলায় মেডেল পরিয়ে দেন।
বলীখেলার পুরস্কার বিতরণ করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এসময় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বলীখেলা আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সিআরবিতে সাহাবউদ্দিনের বলীখেলা আয়োজকেরা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। লালদীঘিতে ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলার পর সিআরবির এই সাহাউদ্দিনের বলীখেলা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। যত আয়োজন হবে এই বলীখেলার পরিধি তত বাড়বে।’
বলীখেলা উদযাপন কমিটির আহবায়ক মোহাম্মদ সাহাবউদ্দিনের সভাপতিত্বে ও যুগ্ম আহবায়ক কাউন্সিলর জহর লাল হাজারীর সঞ্চালনায় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আরো উপসি’ত ছিলেন চসিকের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন, সাবেক কাউন্সিলর মুহাম্মদ জামাল হোসেন প্রমুখ।

বিনোদন কেন্দ্রে বৈশাখী উৎসবের ঢেউ :
উৎসব পালনে বরাবরের মতো এবারও উদার নগরবাসী। বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনায় তারা উদযাপন করল ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। ছোট-বড় নানান বয়সীদের আনাগোনায় মুখরিত ছিল পতেঙ্গা সী বিচ, ফয়েস লেক, স্বাধীনতা পার্ক, শিশু পার্ক ও চিড়িয়াখানাসহ নগরীর বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রগুলো।
সকালের দিকে বাকি বিনোদন কেন্দ্রগুলো কিছুটা ফাঁকা থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে সেখানেও ভিড় বাড়তে থাকে। পার্কগুলোতে নানা রঙের পোশাকে আগতদের অংশগ্রহণ যেন রঙের ঢেউ লাগে বৈশাখের প্রথম দিনটিতে।
শনিবার পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে পতেঙ্গা সী বিচে গিয়ে দেখা যায় সেখানে শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সহ সব বয়সী মানুষে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠেছে। সবার একটাই উদ্দেশ্য বাংলা নতুন বছরের শিশু সূর্যটাকে সরাসরি প্রত্যক্ষ করা।
এমনিতেই নগরবাসীর অন্যতম প্রধান বিনোদন আকর্ষণ স্পট হলো পতেঙ্গা সী-বীচ। সমুদ্র ও তার বিস্তীর্ণ জলরাশি, সেখানে তীরের দিকে ভেসে থাকা ছোট ছোট জেলে নৌকা, আরেকটু দূরে সারি সারি বাণিজ্য জাহাজ সব যেন শিল্পীর পটে আঁকা এক মনোরম দৃশ্যাবলী। এসব উপভোগ করতে সৌন্দর্য পিয়াসীরা সপ্তাহের সাতদিনই এখানে ভিড় জমায়। সেখানে পহেলা বৈশাখের মতো এতবড় উপলক্ষ্যে ভিড় হবে না তা কি ভাবা যায়?
সাগর পাড়ে সমুদ্রের গর্জনের সাথে মিশে যেতে কানাডা প্রবাসী দেলোয়ার হোসেন স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে আসেন। তাঁর স্ত্রী তাহমিনা আক্তারের কাছে জানতে চাইলে তিনি আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে যেতে সুপ্রভাতকে বলেন- নতুন দিনের অপেক্ষায় ছিলাম। অনেক ভাল লাগছে। সন্তানরাও অনেক খুশি। ১৪২৫ সন সবার ভাল কাটুক সেটা প্রত্যাশা করি।
অন্যদিকে বৈশাখের প্রথম দিন চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাটা দিন দর্শণার্থীদের ভিড় লেগেই ছিল। বাঘ, সিংহ, হরিণ সহ চিড়িয়াখানায় আনা নতুন ধরণের আফ্রিকান জেব্রার খাঁচায় সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে।
বিনোদন পার্কগুলির পাশাপাশি নগরীর রাস্তাঘাটে এদিন তরুণ-তরুণীরা রঙ-বেরঙের নতুন পোশাক পরে সারাদিন ঘুরে বেড়িয়েছে। আর সুযোগ পেলেই রাস্তার পাশে অবসি’ত রেস্তোরা গুলোতে ঢু মেরে পান্তা-ইলিশে মেতে উঠেছে। বাঙালীর কাছে বৈশাখী উৎসবের অপর নাম যে পান্তা-ইলিশ উৎসব।
তারুণ্য প্রাণের উচ্ছ্বাসে মাতলো চবি
আমাদের চবি সংবাদদাতা জানান, বাঙালির সর্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ। বর্ষবরণের এ দিন সবাই মাতে প্রাণের উচ্ছ্বাসে। সারাদেশে নানা আয়োজনে বরণ করা হয়েছে নতুন বছরের প্রথম দিনকে। তারই অংশ হিসাবে বৈশাখের আনন্দ উপভোগ করতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছিল হাজার প্রাণের মিলনমেলা। নতুন দিনের নতুন সূর্যকিরণ স্পর্শ করার আনন্দ তরুণ প্রাণেই বেশি লক্ষণীয়। তাই তো নববর্ষের প্রথম দিনটিকে বরণ করে নিতে চবি ক্যাম্পাস নতুন করে জেগে উঠেছিল তারুণ্যের প্রাণের উচ্ছ্বাসে।
কোটা সংস্কার দাবিতে ক্লাস বর্জনে গত কয়েক দিনের নিস্তব্ধতার অবসান ঘটিয়ে পহেলা বৈশাখ যেন নবদূত হয়ে ধরা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সকাল থেকে লাল-সাদা শাড়িপরা তরুণী আর পাঞ্জাবি-ফতুয়াপরা তরুণদের ঢল নামে এখানে। চারুকলার শিক্ষার্থীদের নিপুণ হাতের আলপনায় আগেই বর্ণিল সাজে সেজেছে পুরো ক্যাম্পাস। নানারঙে নানাঢঙে সেজে সবাই দিনভর মেতেছিল বর্ষবরণের উৎসবে। বৈশাখে তারুণ্যের বাঁধভাঙা জোয়ারে মুখরিত হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশও।
গত শনিবার নতুন বঙ্গাব্দ’কে স্বাগত জানিয়েছে চবি পরিবার। বরাবরের মতো এবারো চবি ক্যাম্পাসের জিরো পয়েন্ট থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ প্রাণের উৎসব। এ বছর শোভাযাত্রার স্লোগান ছিল ‘উন্নয়ন অভিযাত্রায় গর্বিত বৈশাখ’।শোভাযাত্রাটি ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে অনুষ্ঠানস’ল আবদুর রব হল মাঠ প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়।
বর্ষবরণ উপলক্ষে ক্যাম্পাসে ঐতিহ্যবাহী লোকজ মেলা ও কনসার্টের আয়োজন করে করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, আদিবাসীদের পরিবেশনা, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবেশনা, মহিলা সংসদ ও স্কুল শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা, নৃত্য, কৌতুক, রম্য বিতর্ক, লাঠিখেলা, বলীখেলা, পুতুল নাচ, বউচি খেলা এবং আমন্ত্রিতব্যান্ড দল ‘জলের গান’-এর পরিবেশনা। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্য ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশ এবং শহর থেকে হাজারো মানুষকে আনন্দিত করেছে এসব পরিবেশনা।
এর আগে সকাল থেকেই শুরু হয় ছেলেমেয়েদের গালে আলপনা আঁকার পালা। শিক্ষার্থীদের অনেকে বিনামূল্যে, আবার কেউ কেউ অর্থের বিনিময়েও বৈশাখের আলপনা এঁকেছেন। তরুণীরা হাতে লালচুড়ি, মাথায় ফুল গুঁজে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ছবি তুলেছেন পছন্দের মানুষের সাথে। তরুণরা হই-হুল্লোড় আর বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মাতিয়েছেন পুরো ক্যাম্পাস। এছাড়া ওইদিনে অস’ায়ী ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা বৈশাখের নানান জিনিসপত্রসহ স্টল নিয়ে বসেন ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায়। বিক্রি করেন ঐতিহ্যবাহী নানান খাবার, পিঠাপুলি, মাটির তৈজসপত্র, রঙ-বেরঙের বেলুন, ফেস্টুন, ভুভুজেলা, নানা রঙ ও ঢঙের মুখোশসহ শিক্ষার্থীদের হাতের তৈরি ও নকশা করা বিভিন্ন জিনিসপত্র।
বৈশাখের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে দেখা যায় তরুণ-তরুণীদের প্রাণের উচ্ছ্বাস। তাদের মধ্যে কেউ এসেছেন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে, কেউবা পরিবার-পরিজন নিয়ে। কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয় যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথমবর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম পহেলা বৈশাখ। উৎসবের কয়েকদিন আগ থেকে নিজের মধ্যে উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। তাই পুরনো স্মৃতির সঙ্গে বৈশাখের আনন্দ ভাগ করে নিতে সব বন্ধুরা মিলে এসেছি আপন ক্যাম্পাসে।’
হাতে লালচুড়ি, কপালে টিপ আর লালশাড়ি পরে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে শামিল হতে এসেছেন শিক্ষার্থী ফারজানা আমিন সোনিয়া। তিনি বলেন, ‘বৈশাখী মেলায় গণমানুষের যে মিলনমেলা জমে, তা আর কোনো উৎসবে দেখা যায় না। তাই তো বাঙালির এ উৎসবে নিজের মধ্যে ভিন্ন আমেজ কাজ করে। এ বছরই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বন্ধু-বান্ধাবকে নিয়ে বৈশাখী আনন্দ উপভোগ করতে আসা।’