সমসাময়িক

অস্থির সমাজে স্বস্তি কোথায়!

মো. সাইদুল ইসলাম চৌধুরী

স্বস্তির আভাস নেই কোথায়ও। সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে চোখ পড়লে শুধু নেতিবাচক সংবাদ। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী স্বস্তিতে না থাকলেও এক শ্রেণির মানুষের জন্য দেশটা কিন’ স্বর্গ। যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে মগ্ন, তারাইতো ভালো থাকবেন। এখন ভালো থাকার নতুন নতুন কৌশল রপ্ত করছেন স্বার্থবাদী শ্রেণি অর্থাৎ তেল মারা, লেজুড়বৃত্তি, তোষামোদ, গলাবাজিসহ স্বার্থ উদ্ধারে যা যা করা প্রয়োজন সব। আর এসব কাজে আসক্ত হয়ে পড়ছেন সুবিধাভোগী শ্রেণি। মন্ত্রী, আমলা, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী সর্বোপরি সব পেশায় এই ধরনের স্বার্থবাদী শ্রেণি তৈরি হয়েছে।
আমরা রোহিঙ্গা, সিরীয়, ফিলিস্তিনিদের জন্য কাঁদি, তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করি অথচ আমাদের পাশে পাশবিক নির্যাতনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছেন অনেক নিরপরাধ মানুষ! কি কঠিন নির্মম বাস্তবতা, আমরা এসব মানুষের জন্য একটুও মর্মাহত হই না। কি এক আজব দেশ! পুলিশি নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, গুম, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক হানাহানি, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি, প্রতারণা, সুশাসনের অভাব, প্রশ্ন ফাঁস, মাদক, পরকীয়া, সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, ঋণ খেলাপী, বিল খেলাপী, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ভেজাল খাদ্য,ভুল চিকিৎসা, জনশক্তি রপ্তানির সংকট, বেকারত্বসহ হাজারো সমস্যা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের শান্তি কোথায়? দিন শেষে প্রশ্ন রয়ে যায় কখন আসবে স্বস্তি?
আয়তনে ছোট দেশ হলেও বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব অনেক বেশি। এত বিশাল জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণ ও সব সমস্যা সমাধান করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব না কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা নিজেদের বদলাতে পারছি ততক্ষণ সমস্যাগুলো বাড়বে।
সমস্যার কারণে মানুষের মধ্যে অসি’রতা সৃষ্টি হয়। তবে অসি’রতার কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অসি’তিশীলতাকে দায়ী করেছে অধিকাংশ মানুষ। প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় স্বাধীনতার সুফল পাচ্ছে না এ দেশের সাধারণ জনগণ। তবে সরকার যতই ভালো কাজ করুক বিরোধী দলের কাছে তা অগ্রহণযোগ্য ঠিক তেমনি বিরোধী দলের পরামর্শগুলো ক্ষমতাসীন দলের কাছে হাস্যকর কৌতুকের মত। আমরা জাতি হিসেবে এমন দুর্ভাগা যে এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করে কিন’ জনগণের কথা কখনো ভাবে না। যদিও গণতন্ত্রের মূল শক্তি হচ্ছে জনগণ কিন’ আমাদের গণতন্ত্র এখন আমলানির্ভর, ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে সবচেয়ে বেশি খুশি রাখতে হয় আমলাদের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইতিহাস পড়লে বুঝা যায় ক্ষমতা চিরস’ায়ী নয়। কোনো পক্ষই আজীবন ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকতে পারে না, এক সময় না এক সময় পরিবর্তন আসে। এখানে ক্ষমতা বলতে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা নয় বরং পরিবার থেকে শুরু করে সরকার পর্যন্ত সব ক্ষমতাকে বুঝানো হচ্ছে।
এক শ্রেণির পাষণ্ড মানুষদের নির্যাতনে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য সাধারণ নিরপরাধ মানুষ। চট্টগ্রাম নগরীর স্বাধীনতা দিবসে মো. মহিউদ্দিন (৩০) নামে এক যুবলীগ কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হোসাইন মোহাম্মদকে (২৯) ছুরিকাঘাত, কাজির দেউড়িতে পথচারী কর্তৃক পুলিশকে মাথা ফাটানো, কর্ণফুলিতে প্রধান শিক্ষক আবুল হাশেমের যৌন নিপীড়নের শিকার তিন ছাত্রী , কাটিরহাটে শিশু হত্যা, রংপুরে স্ত্রী’র পরকীয়ার বলি এডভোকেট রথীশচন্দ্র, সিলেটে বিউটি ধর্ষণসহ হত্যা এসব এখন আমাদের জন্য নিয়মিত ঘটনা। খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, শিশু নির্যাতন, ছাত্র রাজনীতির নামে সহিংসতা এসব এখন প্রতিদিনের রুটিন ওয়ার্ক, না হলে মনে হয় অস্বাভাবিক। দেশে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও দলীয় কোন্দলের কারণে সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। আসলে এসব থামছে না বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে!
সব কিছু যে শুধু খারাপ খবর তা কিন’ নয়। অনেক ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়েছে। জাতিসংঘ কর্তৃক উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতির মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়েছে। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে বাংলাদশের প্রোফাইলে এখন বলা আছে, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ওঠার যোগ্যতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ।
দেশে মাহামারি আকার ধারণ করেছে রমরমা মাদক ব্যবসা। মাদকের আগ্রাসনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যুব সমাজ। ইয়াবা পুরো সমাজটাকে গিলে খাচ্ছে! যেন কোনোভাবে থামানো যাচ্ছে না মাদকের স্রোত। প্রতিদিন গুটিকয়েক সেবক ও সরবরাহকারী ধরা পড়লেও অধরা থেকে যাচ্ছে বাঘব বোয়ালরা। মাদক চক্রের সাথে জড়িতরা প্রভাশালী হওয়ায় প্রশাসন ও আইনের ফাঁকে পার পেয়ে যাচ্ছে। যদি মাদকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ গণজাগরণ সৃষ্টি করা না যায় তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য মাদকের আগ্রাসন হবে ভয়াবহ।
সামাজিক, মানবিক নানাভাবে ইয়াবার আগ্রাসন দেশজুড়ে ছড়ালেও তা নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ খুব সামান্য। ইয়াবা বন্ধে মাদকদ্রব্য ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ছাড়া আর কোনো তৎপরতা নেই। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে একাধিকবার ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত গডফাদারের নতুন নতুন তালিকা তৈরি করা হলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় অপারেশন কার্যক্রম নেই। এরই মধ্যে ইয়াবা ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত ৬০ জন গডফাদার ও ১২ শতাধিক ব্যবসায়ীর নতুন তালিকা রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। গডফাদাররা গ্রেফতার না হওয়ায় তালিকা এখন অনেকটাই ফাইল বন্দী। মাদকের মত প্রযুক্তিও যুবসমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। রাত জেগে মোবাইলে ইন্টারনেটে বিভিন্ন এপস ব্যবহার , পর্নোগ্রাফি, পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রযুক্তির সাহায্যে নকল, ফেইসবুকে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে বর্তমান প্রজন্ম। মানব কল্যাণে প্রযুক্তি তাই যথাযথভাবে এর ব্যবহার না করলে হিতে বিপরীত ঘটবে।
শিক্ষা ব্যবস’ায় বিরাজ করছে অরাজক পরিসি’তি। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও রাজনীতি এ দু’টোর আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে শিক্ষা ব্যবস’া। ছাত্র রাজনীতি এখন স্কুল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, ফলে বাড়ছে সংঘাত ও সংঘর্ষ। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় ভয়াবহ প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে এবং এ কুকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৫৭ জনকে আটক করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রণালয় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ নিলেও তা কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এছাড়াও নিয়োগ বাণিজ্য, ভর্তি জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনীতির নোংরা থাবায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গুণগত শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত অর্জন। সরকার জনগোষ্ঠীর ১০০% শিক্ষিত করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে কিন’ শিক্ষার মান, শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস’ান এসব বিষয়ে নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা নেই। যে হারে জিপিএ-৫ পাওয়া শুরু হয়েছে আর কয়েক বছর পর জিপিএ-৫ ছাড়া কেউ পাশ করবে বলে মনে হয়না । আমাদের শিক্ষা ব্যবস’া এখন অনেকটাই জিপিএ নির্ভর। কিন’ প্রশ্ন হচ্ছে মেধা কি শুধু জিপিএ-৫ দিয়ে বিবেচ্য নাকি প্রায়োগিক মূল্যায়ন?
প্রতিবছরই উচ্চশিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে আসা শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকের বেশি বেকার থাকছেন অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিচালিত সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে তথ্য মতে, দেশের প্রবৃদ্ধি যে গতিতে বেড়ে চলেছে, সেই গতিতে এগোতে পারছে না দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। ফলে বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। দেশের জাতীয় বেকারত্বের গড় হার অপরিবর্তিত রয়েছে। এ হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। তবে উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি, অর্থাৎ মোট বেকারত্বের ১১ দশমিক ২ শতাংশ উচ্চ শিক্ষিত। বেকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারী ও পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান সমান। এ ছাড়া অর্থনীতির রূপান্তরের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশের কৃষি খাতে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা কমেছে, বিপরীতে বাড়ছে শিল্প ও সেবা খাতের শ্রমশক্তির সংখ্যা। দেশের মোট শ্রমশক্তির ৫৬ শতাংশ কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে নিয়োজিত রয়েছে, যা সংখ্যায় ৬ কোটি ৮০ লাখ। শ্রম শক্তির বাইরে রয়েছে ৪ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ।
প্রতিদিন গণমাধ্যমে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত সংবাদে বলা হচ্ছে দেশের প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে এবং আগামীতে আরও বাড়বে। তবে পুঁিজ বাজারের ধ্বস, এমএলএম ব্যবসার নামে কোটি কোটি টাকার লোপাট, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তারল্যের সংকট, সরকারি বেসরকারি ব্যংকগুলোতে ঋণ খেলাপীদের দীর্ঘ তালিকা এসব বিষয় সাধারণ মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস’া বলতে চারটি স্তম্ভের কথা কমবেশি অনেকেই অবহিত- আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও সংবাদপত্র। গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় গণমাধ্যম বড় ভূমিকা রেখেছে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গণমাধ্যম এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার সমান্তরাল বিকাশ, আইনের শাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সর্বোপরি জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে সেতুবন্ধন স’াপনে গণমাধ্যমের ভূমিকা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। স্বাধীন, বস’নিষ্ঠ গণমাধ্যমের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) মতে দেশে গণমাধ্যমের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে ।ফলে টিকে থাকার জন্য মানিয়ে চলার সংস্কৃতি ধারণ করতে বাধ্য হচ্ছে গণমাধ্যমগুলো।
আলোচনার বিষয় ছিল অসি’র সমাজে স্বস্তি কোথায়? উপরোক্ত মুখ্য বিষয়গুলো অসি’রতার নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। এর বাইরেও আরও অনেক কারণ রয়েছে- যেমন খাদ্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, মেধার অবমূল্যায়ন,নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি সেবাদানকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ দুর্নীতির আখড়া, অনিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস’া (সড়ক ও জলপথে), সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে খুন, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন,পরকীয়াসহ নানা কারণে অসি’র পরিবেশ বিরাজ করছে সর্বত্র। তবে এই অসি’র পরিসি’তির জন্য এককভাবে কেউ দায়ী নয়।
আমরা যদি নিজ নিজ অবস’ান থেকে নিজেকে শুধরাতে পারি তাহলে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে। প্রবাদে আছে, আপনি ভালোত জগৎ ভালো অর্থাৎ প্রথমে নিজেকে বদলাতে হবে তবেই বদলে যাবে দেশ। আশির দশকে মালয়েশিয়া আমাদের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে ছিলো অথচ আজ তারা কোথায়? ইচ্ছে ও একতা থাকলে সবি সম্ভব যা মালয়েশিয়া প্রমাণ করেছে। আমরা যদি স্বার্থবাদী না হয়ে সার্বজনীন চিন্তা করি তাহলে দেশের পরিবর্তন আসবে। সুখী, শান্ত, শিক্ষিত ও সভ্য জাতি হিসেবে আমরাও বিশ্বে পরিচিত হবো।

লেখক : প্রাবন্ধিক