নিউইয়র্কের সাতকাহন হাঁটাহাঁটি হারলেমে

রিজওয়ানুল ইসলাম
Pic-01

আমার কাছে নিউইয়র্ক সব সময়ই আকর্ষণীয় এবং কৌতূহলোদ্দীপক একটি জায়গা। ঘর থেকে রাস্তায় বের হলেই চারদিকে তাকাই; দেখি শহরটির জীবনযাত্রা, আর মানুষের চলাফেরা। কত ধরনের মানুষ বাস করে এই শহরটিতে, আর কত বিচিত্র তাদের জীবনধারা ! হাঁটাহাঁটি করলে কিছুটা হলেও ধারণা করা যায় শহরটি সম্পর্কে।
তবে তাই বলে হারলেমে হাঁটা ? এই নামটি উচ্চারণের সাথে সাথে চোখে ভেসে ওঠে এমন এক জায়গার কথা যেখানে রাস্তায় হামেশাই হচ্ছে হানাহানি, ছিনতাই, ইত্যাদি। আমারও এরকমই ধারণা ছিল ।কিন’ এখন বুঝতে পারি যে হারলেম না গেলে আমার নিউইয়র্ক দেখা কত অসম্পূর্ণ থেকে যেত।
ম্যানহাটন বরোর একটি বড়সর পাড়া হারলেম। পূর্ব-পশ্চিম এবং উত্তর-দক্ষিণ সব দিকেই এর বিস্তৃতি বেশ কয়েক মাইল(আমেরিকায় এখনো মাইলেই দূরত্ব মাপা হয়)। সপ্তদশ শতকের কোনো এক সময় ওলন্দাজরা এসে একটি গ্রামের পত্তন করে এবং নেদারল্যান্ডস-এ নিজেদের ফেলে আশা শহরের নামে তার নাম দেয় হারলেম। কালক্রমে সে জায়গাটি নিউইয়র্ক শহরের অংশ হিসেবে গড়ে ওঠে। সে সময় প্রথমে ইতালীয় এবং ইহুদীরা ছিল এই অঞ্চলে সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন’ বিংশ শতকের প্রথম দিকে এক সময় আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দলে দলে আফ্রিকান-আমেরিকানরা এসে বসতি গাড়ে হারলেমে। আর তখন এক সময় তারা হয়ে যায় মোট জনসংখ্যার প্রায় নব্বই শতাংশ।
কিন’ মহামন্দার কারণে বিংশ শতকের তিরিশের দশকে হারলেমের অর্থনৈতিক অবস’ার অবনতি ঘটে, যার ফলে বেড়ে যায় বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য। আর তার সাথে অবনতি ঘটে সামাজিক পরিসি’তির। মাদক, ডাকাতি, ছিনতাই এসব হয়ে ওঠে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সেঅবস’া চলে আশির দশকের শেষের দিক পর্যন্ত। কিন’ সে সময় থেকে পরপর দু’জন মেয়র কঠোর ব্যবস’া নেন এসব অপরাধের বিরুদ্ধে। আর তার ফলও পাওয়া যায় ; অপরাধের সংখ্যা দ্রুত কমে আসে। সরকারের দিক থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয় বাসস’ান এবং শিক্ষা ব্যবস’ার উন্নতির লক্ষ্যে। অবস’ার উন্নতির সাথে সাথে হারলেম তার পুরানো গৌরব ফিরে পেতে শুরু করে। এলাকাটির পুনরুজ্জীবনের সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের জনগোষ্ঠী আবার এসে বসবাস শুরু করে এই অঞ্চলে ।আমার মেয়ে শমী এবং ওর স্বামী তাদের মিড-টাউনের বাসা ছেড়ে গিয়েছে সেখানে। ও আমাকে বলেছিল, এখন অনেকেই হারলেমে বাসা নিচ্ছে। আর পরিসংখ্যান বলছে, হারলেমের জনসংখ্যার অর্ধেকের কিছু বেশি এখন আফ্রিকান-আমেরিকান। তবে বাকিদের অধিকাংশই হিস্পানিক অথবা অন্যান্য গোষ্ঠী – শ্বেতাঙ্গ মাত্র দশ শতাংশ। খালি চোখে অবশ্য আমার কাছে মনে হয় যে আফ্রিকান-আমেরিকানরা এখনো শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠই নয়, বিশাল ব্যবধানে বেশি।
হারলেমে শুধু যে আফ্রিকান-আমেরিকান অথবা হিস্পানিকরাই বসতি স’াপন করেছিলেন তা নয়, ছিলেন অন্যরাও। তার মধ্যে ছিলেন বাঙালিও। বিবেক বল্ড-এর বই “বেঙ্গলি হারলেম এন্ড দ্য লস্ট হিস্ট্রিজ অফ সাউথ এশিয়ান অ্যামেরিকা” থেকে জানা যায় যে উনবিংশ শতকের শেষাংশে এবং বিংশ শতকের প্রথমার্ধে বেশ কিছু সংখ্যক বাঙালি এ অঞ্চলে বসতি গেড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জাহাজ থেকে পালিয়ে আসা এবং নকশি করা সিল্কের কাপড়ের ব্যবসায়ে নিয়োজিত লোকেরা। বিভিন্ন কারণে তাঁরা এখানে বসবাস শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে আফ্রিকান-আমেরিকান এবং হিস্পানিকদের (বিশেষ করে পুয়ের্তরিকানদের) সাথে মিশে পরিবার গড়েন। জাহাজ কোম্পানির রেকর্ড, পুরনো সংবাদপত্রের রিপোর্ট, স’ানীয় প্রশাসনের বিয়ে সংক্রান্ত রেকর্ড ইত্যাদি বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য ঘেঁটে বিবেক বল্ড এই জাতিগোষ্ঠীর মার্কিন সমাজে একীভূত হওয়ার এক চমকপ্রদ ইতিহাস নির্মাণ করেছেন তাঁর বইয়ে। আর আমি এক সকালে মেয়ের বাসা থেকে দোকানে যাবার পথে দেখা পেয়ে গেলাম এমন এক জনের, যাঁর সাথে কথা বলে মনে হলো, তিনি এ ধরনের কোনো বাঙালি পরিবারের উত্তরসূরী।
এক রাস্তার পাশে কয়েকটি দালানে চলছিল মেরামত ও উন্নয়নের কাজ; আর সেখানে “মালেক ্ কোং” লেখা একটি সাইনবোর্ড ঝুলছিল। যাঁরা সেখানে কাজ করছিলেন তাঁদের মধ্যে দুজনকে দেখে বাঙালি বলেই মনে হলো। আর তাঁদের একজনকে আমি সরাসরি বাংলায় জিজ্ঞেস করলাম, আপনি বাঙালি ? তিনি ইতিবাচক জবাব দিয়ে আমার কথাও জানতে চাইলেন। আর অল্পস্বল্প বাক্যালাপ থেকেই বোঝা গেল যে তিনি বিংশ শতকের প্রথমার্ধে জাহাজ থেকে নেমে পালানো বাঙালি কারো বর্তমান প্রজন্ম। নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করে এখন নিজেই ছোট একটি কোম্পানি গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে কাজ করেন। হারলেমের বাঙালির ইতিহাসের একটি ক্ষুদ্র অংশ বর্তমান হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলেছিলেন অল্পক্ষণের জন্য হলেও।
ম্যানহাটন বরোর অংশ হলেও হারলেমের দালান-কোঠা এবং রাস্তাঘাটগুলো দেখতে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আলাদা। কুড়ি বা তিরিশ তলার আকাশচুম্বী দালান এখানে নেই; কিন’ লাল বা বাদামি রঙের দেয়ালের অনেকগুলোই স’াপত্যের দিক থেকে বেশ দৃষ্টিনন্দন। আর কয়েকটি রাস্তা বিশেষ করে লেনক্স এভেনিউ এবং ম্যালকম এক্স বুলেভার্ড বেশ প্রশস্ত এবং সুন্দর।
হারলেমের পুনরুজ্জীবনের সাথে সাথে বেশ কয়েকটি অভিজাত শ্রেণীর ক্যাফে-রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে বিশেষ করে ফ্রেদেরিক ডগলাস বুলেভার্ডে আর লেনক্স এভেনিউতে। আমরা মাঝ সকালের কফি বা সপ্তাহান্তের ব্রাঞ্চ খাবার জায়গার খোঁজে বেরিয়ে এ ধরনের বেশ কয়েকটি ক্যাফে-রেস্তোরাঁ পেয়েছি। কোনো কোনটির নাম থেকে কিছুটা হলেও বোঝা যায় তার মালিকানার পটভূমি। তেমনি একটির নাম “প্যাতিসারী দেজ-অ্যামবাসাদ”। নাম দেখেই আন্দাজ করেছিলাম যে তার সাথে কিছুটা হলেও ফরাসি যোগাযোগ আছে। ভেতরে গিয়ে দু’একজন খদ্দেরকে ফরাসি ভাষায় কথা বলতে শুনলাম। পরে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর একটি লেখায় এই ক্যাফেটির ফরাসি যোগাযোগের কথা পড়েছি।
হারলেমের আফ্রিকান-আমেরিকান বাসিন্দাদের ফরাসি যোগাযোগ অস্বাভাবিক কিছু নয়, কারণ আফ্রিকার অনেকগুলো দেশই এক সময় ছিল ফ্রান্সের উপনিবেশ, আর তাদের শিক্ষিত জনগণ শিক্ষা এবং সরকারি কাজের জন্য শিখেছিল ফরাসি ভাষা। কোনো কোনো দেশ ফরাসিকে সরকারি ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে। আমেরিকায় অভিবাসন করলেও তারা সে ভাষাটি ধরে রাখবে এতে অবাক হবার কিছু নেই। সুতরাং আমেরিকান হলেও হারলেমের অনেকেই ফরাসী ভাষায় কথা বলে ।
তবে আমি সত্যিই অবাক হয়েছিলাম একবার প্যাতিসারী দেজ-অ্যামবাসাদ-এ গিয়ে। বেকারিতে কয়েকটি জিনিস কিনছিলাম ।সামান্য আলাপ হলো তরুণ বিক্রেতার সাথে।
আমার হাতে অন্য একটি দোকান থেকে কেনা কয়েকটি ব্যাগ ছিল। আমি বাংলাদেশের লোক শুনেই পরিষ্কার বাংলায় জিজ্ঞেস করলো, কী কিনলেন মাছ, সবজি ? ছেলেটি এসেছে ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে, তার বাবা-মায়ের হাত ধরে ।তার কোনো বাংলাদেশী বন্ধুর কাছ থেকে শুনে শুনেই কিছু বাংলা শিখেছে; আর তার নির্ভুল প্রয়োগ করলো আমার সাথে আলাপে ।
মেয়ের বাসার আশেপাশে হাঁটতে হাঁটতে একদিন দেখলাম একটি ভিন্নধর্মী ব্যাপার। দুই দালানের মাঝখানে এক টুকরো খালি জমি গাছ-গাছালিতে ঘেরা জায়গাটি একটি ছোটখাটো পার্কের মত। গেট খোলাই ছিল; আর ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল একটি ছোট্ট বাক্সের মধ্যে কয়েকটি বই রাখা। বাক্সটির গায়ে ছবি আঁকা, আর নিচের অংশে লেখা – “আওয়ার লিটল ফ্রি লাইব্রেরি”। তারপর আরো যা লেখা তার অর্থ হচ্ছে এখান থেকে বই নিয়ে যেতে পারো, ফেরৎ দিতে হবে না। আর ওপরে লেখা “হারলেম আর্ট কালেকটিভ”। প্রবেশ পথের কাছেই বসে ছিলেন এক মহিলা; তিনি এসে আমাদের বললেন, বই দেখো, নিয়ে যাও, কোনো পয়সা দিতে হবে না ।বুঝতে পারলাম যে পাড়াভিত্তিক ক্লাবের মত একটি প্রতিষ্ঠান এই কাজটি করছে ।
যদিও নিউইয়র্ক শহরে ছোট বড় মিলিয়ে হাজারখানেক মিউজিয়াম রয়েছে, পর্যটকদের পদচারণা সচরাচর সীমাবদ্ধ থাকে নামকরা কয়েকটিতেই। আমারও জানা ছিল না হারলেমের স্টুডিও মিউজিয়ামের কথা। মেয়ের কাছ থেকে শুনলাম এর কথা, আর এও জানলাম যে রবিবার বিকেলে সেটি উন্মুক্ত থাকে বিনামূল্যে প্রবেশের জন্য ।ম্যানহাটনের সেন্ট নিকোলাস এভিনিউ থেকে ১২৫ নম্বর রাস্তা ধরে পূব দিকে সামান্য হেঁটে গেলে হাতেরডান দিকে পড়ে মিউজিয়ামটি। মেয়ের বাসা থেকে হাঁটা পথ। তার মানে যাতায়াতের খরচ নেই। আর রবিবার বিকেলে গিয়েছি বলে ঢোকারও কোনো খরচ নেই। সম্পূর্ণ নিখরচায় দেখা গেল হারলেমের একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য স’ান।
আফ্রিকান-আমেরিকানদের চিন্তা এবং মনের জগৎ সম্পর্কে খানিকটা হলেও ধারণা পাওয়া যায় এরকম একটি জায়গায় কিছুটা সময় কাটালে ।
ষ্টুডিও মিউজিয়াম দেখা শেষ করে যখন বের হলাম তখন প্রায় বন্ধ হবার সময়। স্যুভেনিরের দোকানটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল; কিন’ রিসেপশন কাউন্টারে একজন তখনও বসে ছিলেন।
আর সেখানে সাজানো ছিল বিভিন্ন ধরনের প্রচারপত্র এবং মিউজিয়ামের নিজস্ব সাময়িকীর সর্বশেষ সংখ্যা। আমাকে পত্রিকাটি হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে দেখে কর্মকর্তাটি জানালেন যে এটি আমি সৌজন্য সংখ্যা হিসেবে নিতে পারি। পত্রিকাটির সামনের পৃষ্ঠাগুলো থেকে বুঝতে পারলাম যে এই মিউজিয়ামের পেছনের শক্তি একটি ফাউন্ডেশন যেটি বেশ ভালোই চাঁদা পায় , আর তার ফলেই সম্ভব হচ্ছে শিল্প বিষয়ক এই সাময়িক পত্রিকাটি প্রকাশ করা।

মিউজিয়াম দেখা শেষ করে ১২৫ নম্বর রাস্তা ধরেই ফিরে যাচ্ছিলাম। এক পাশে দেখলাম ঐতিহ্যবাহী অ্যাপোলো থিয়েটার যা এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে বেশ ভালোভাবে। স্পষ্টতই, অনেক দশক ধরে হারলেমের ওঠানামার সাক্ষী এই থিয়েটার। শুধু থিয়েটার এবং বড় বড় দোকানপাটই নয়, ফুটপাথে পসরা সাজিয়ে বসে গিয়েছে অনেকেই। ম্যানহাটনের অনেক জায়গায়ই ফুটপাথে ছোট ছোট দোকান দেখা যায়; তবে ১২৫ নম্বর রাস্তার দোকানগুলোর পসরার ধরন স্বাভাবিকভাবেই বেশ আলাদা, আর পুরো পরিবেশটাই অনেক বেশি প্রাণবন্ত। এলাকাটার পরিবেশ থেকেই বোঝা যাচ্ছিল যে প্রকৃতিতে আফ্রিকান-আমেরিকানরা খুবই প্রাণোচ্ছল এবং আমুদে।