বইমেলা নতুন ভাবনা

রিদওয়ান আনান

কিছুদিন আগেই হয়ে গেল ঢাকা লিট ফেস্টিভ্যাল গ্রুপের অনেকের লেখা আর ছবির মাধ্যমে এ লিট ফেস্টিভ্যাল কেমন, সে সম্পর্কে দূরে থেকেও কিছুটা ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। মফস্বলী শহরে অবস’ান করে নানান জনের নানা মত থেকে যতোদূর বুঝছি, মোটা দাগে ঢাকার এলিট উচ্চশিক্ষিত ইংরেজীতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধকারী আর্বানাইটদের জন্য আছে এসব লিট ফেস্টিভ্যাল, আর ঢাকাবাসী মানুষদের জন্য আছে একুশে ফেব্রুয়ারির বইমেলা। কিন’ সাধারণ পাঠকের জন্য কি আছে?
ফেব্রুয়ারির বইমেলা কি আসলেই বইমেলা? কোন পাঠক দেশের সুদূরতম প্রান্ত থেকে বাংলা একাডেমি চত্বরে এসে বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে শান্তিতে, মন ভরে, নির্মল পরিবেশে, অগুনতি বই দেখে তার থেকে কি পছন্দমতো বই বেছে নিতে পারে? সেলফি তুলতে, চেকইন মারতে আর ফোটোসেশন করতে ব্যস্ত মানুষের হুড়োহুড়ির মধ্যে, কান ফাটা মাইকিংয়ের উৎপাতের মাঝে, যেখানে সেখানে টেলিভিশন ব্রডকাস্টিং এড়িয়ে, ধুলাবালির ঝাপটা খেতে খেতে শত শত স্টলের ভিড়ে কাঙ্ক্ষিত স্টল খুঁজে তাতে আকাঙ্ক্ষিত বইটা খুঁজে পাওয়া কি খুব সহজ?
আমি যতোবার ফেব্রুয়ারির বইমেলা নিয়ে ভাবি, ততোবারই মনে হয় একজন আমপাঠক ফেব্রুয়ারির মেলায় শুধুমাত্র একটা কারণেই যেতে পারে, তা হলো সারা বাংলাদেশে প্রকাশিত বই একসাথে অগোছালো ভাবে সাজিয়ে রাখা দেখে, তা থেকে কষ্টে সৃষ্টে বাছাই করতে পারার সুযোগের জন্য। এ ছাড়া ফেব্রুয়ারির বইমেলায় একজন পাঠকের জন্য প্রায় কিছুই নাই।
তাহলে আমি কি রকম বইমেলা দেখতে চাই? আমি বইমেলাকে বইমেলা হিসাবেই দেখতে চাই। বইমেলা মানে একরের পর একর জায়গা জুড়ে সাজানো ঘিঞ্জি স্টলের মেলা না, বইমেলা মানে এক জায়গায় আপনার পছন্দের বই একসাথে সুন্দর করে সাজানো থাকবে। এখন যে রকম প্রকাশনী ভিত্তিক স্টল করার কালচার, আমার স্বপ্নের মেলায় সে রকম কোন স্টল থাকবে না, থাকবে বইয়ের বিষয় অনুযায়ী বিভক্ত এলাকা বা প্যাভিলিয়ন।
মেলা শুরুতেই দুই এলাকায় বিভক্ত থাকবে, ফিকশন আর নন ফিকশন। ফিকশনের এলাকায় থাকবে ক্লাসিক সাহিত্য, সমকালীন সাহিত্য, গোয়েন্দা কাহিনী- অ্যাডভেঞ্চার, রোমান্টিক সাহিত্য, কবিতা, লিটল ম্যাগাজিন, কমিকস ও গ্রাফিক্স এবং অন্যান্য যা যা ফিকশনের শাখা আছে, সমৃদ্ধিত অনুযায়ী প্যাভিলিয়নে বিভক্ত হয়ে সাজানো থাকবে।
একজন পাঠক হুমায়ূনের উপন্যাস কিনতে চাইলে সমকালীন সাহিত্যের প্যাভিলনে গেলেই হবে, হুমায়ূনের পাশাপাশি এক নজরে দেশের সব লেখকের সমকালীন উপন্যাসগুলোও তিনি দেখে নিতে পারবেন। বিষয় অনুযায়ী বই সাজানো থাকলে নবীন লেখকদের লাভ, বড় লেখকের বইয়ের সাথে তার বইও একই সাথে ডিসপ্লে হলো প্রায় সমান প্রচার পেলো। আর পাঠকের লাভ, একটা নির্দিষ্ট উপন্যাস কিনতে গিয়ে কয়েকটা গৎ বাঁধা বই না দেখে অসংখ্য লেখকের শত শত উপন্যাসের বই দেখে এলেন।
একইভাবে নন ফিকশন এলাকায় থাকবে আরো আকর্ষণীয় সব প্যাভিলিয়ন- ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, ভ্রমণকাহিনী, আত্মজীবনী, শিকার কাহিনী সবই তাদের সমৃদ্ধি অনুযায়ী জায়গা নিয়ে সাজানো থাকবে। এ বইমেলায় কোন পাঠক ঢুকলেই বাংলাদেশের বইয়ের জগত কতটা সমৃদ্ধ, কোন শাখায় আমাদের মনোযোগ বেশি, কোন শাখায় আমরা দুর্বল, তার একটা পরিস্কার ধারণা পেয়ে যাবেন। দ্বিতীয়ত তুলনামূলকভাবে কম জনপ্রিয় ননফিকশন শাখা কতোটা আকর্ষণীয় আর বৈচিত্র্যময়, এ মেলায় সেটা স্পষ্টভাবে পাঠকের চোখে পড়বে।
আমার কল্পিত বইমেলায় শুধুমাত্র বাংলাদেশের বা বাংলাভাষী বই থাকবে না, সে মেলায় সারা বিশ্বের যে কোন বইয়ের প্রবেশাধিকার থাকবে। সে মেলা হবে সত্যিই বৈশ্বিক, খাঁটি এবং অকৃত্রিম আন্তর্জাতিক বইমেলা। আমরা এ মেলায় সারা পৃথিবীর বই দেখে তুলনামূলক কম দামে বই কেনার সুযোগ পাবো। এখানে দেশ, জাতি, ভাষার কোন সীমা থাকবে না, বাংলাদেশে প্রচলিত আইন আর বিধি-নিষেধের বাইরে বই বিক্রি ও প্রদর্শনে কোন বাধা থাকবে না।
এ মেলা মাসব্যাপী হবে না – যে এলাকায় মেলা হবে, সে এলাকায় ৩০ মিনিটের বাস ভ্রমণে যারা আসতে পারবেন, তারাই হবেন মেলার ক্রেতা। মেলার নাম করে সারা ঢাকা শহরের মানুষকে এক জায়গায় জড়ো করার প্রয়োজন দেখি না, যেখানে মেলাই এলাকায় চলে আসতে পারে।
সে জন্য ঢাকার মতো বিশাল শহরে মেলা হবে কয়েকটা এলাকায়। উত্তরা, পুরান ঢাকা, মিরপুর, বনানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে এসব এলাকায় মেলা হবে পর্যায়ক্রমে, মেলার ব্যাপ্তি হবে ৭ থেকে ১০ দিন। এমন মেলা করার জন্য বিশাল মাঠের প্রয়োজন নাই, এখন বিয়ের জন্য যেসব কনভেনশন সেন্টার হচ্ছে, সেগুলোতেই অনায়াসে এ বইমেলা আয়োজন করা যাবে।
তাই বইমেলা শুধুমাত্র একটা মাসেই কেন্দ্রীভূত থাকবে না, বইমেলা চলতে থাকবে বছর জুড়ে, সারা বছরই কোথাও না কোথাও থাকবে বইয়ের উৎসব।
বাংলাদেশের প্রতিটা প্রধান শহরে পালাক্রমে এ মেলার আয়োজন করা হবে, এমনভাবে ঘুরে ঘুরে আয়োজন করা হবে যেন দেশের প্রত্যেক প্রান্তের, প্রত্যেক অঞ্চলের স্কুলগামী শিশু বছরে একবার হলেও বইমেলায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। মেলার আয়োজক কমিটির কাজ থাকবে শুধুমাত্র মেলার আয়োজন, তারা একই সেটআপ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যাবে। পেশাদার আয়োজকের আয়োজনে বইমেলাতেও আসবে পেশাদারিত্বের ছোঁয়া।
আমার ব্যক্তিগত মত হলো এ বইমেলার পরিবেশ আর দশটা মেলার সাথে না মিলানোই ভালো। সবার মাথায় রাখতে হবে, এটা বইমেলা, বই এখানে সবচেয়ে প্রাধান্য পাবে। এখানে মেলার মধ্যে কোন মঞ্চ থাকবে না, কোন মাইকিং করা যাবে না। শ্রুতিমধুর যান্ত্রিক সংগীত চলতে পারে, সেটাও খুব নিচু স্বরে চলবে।
এ মেলার পরিবেশ অনেকটাই লাইব্রেরির মতো হবে, যেখানে লেখক পাঠক বিনা বাধায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বই দেখবেন, বই বাছবেন। বই নিয়ে হইচই করা, আড্ডা দেওয়া, অটোগ্রাফ নেওয়া, সেলফি তোলার জন্য মেলার ঠিক বাইরেই ক্যাফে কর্নার, লেখক কর্নার, সেমিনার প্রাঙ্গণ থাকবে।
এসবের প্রভাব, আওয়াজ, কোনভাবেই মূল বইমেলার ভিতরে যাবে না। এ মেলা হবে আড়ম্বরহীন, অভিজাত্যর গরিমাবিহীন, সব স্তরের বইপ্রেমীর বইমেলা।
এমন বইমেলায় প্রবেশের জন্য টিকেট থাকবে, সেটা হয়তো ২০ টাকা দাম হবে। সে টিকেটের দাম আবার কোন বই কিনলেই ডিস্কাউন্ট হিসাবে ফেরত দেওয়া হবে। এতে যারা ঢুকবে তারা একটা হলেও বই কিনবে, এমন আশা করা যায়।
মোটামুটি এই হলো আমার কল্পিত পাঠকের, বইপ্রেমীর বইমেলা। এ পর্যন্ত এ লেখাটা পড়ে থাকলে, আপনার মনেও একটা আদর্শ বইমেলার চিত্র ভেসে উঠেছে। কেমন হবে আপনার আদর্শ বইমেলা?