আহমেদ মাওলার উপন্যাস ময়নামতী উপাখ্যান

চৌধুরী শাহজাহান

গবেষক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে আহমেদ মাওলা সাহিত্য মহলে দ্যুতি ছড়াচ্ছেন দীর্ঘকালব্যাপী। গত আড়াই দশকে তিনি প্রায় বিশের অধিক গ্রন’ রচনা করেছেন। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, ইতোপূর্বে তাঁর দুইটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। কথাসাহিত্যিক হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন ২০১৩ সালে ‘আগুন ঝরা ফাগুন দিনে’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে। প্রথম উপন্যাসের ঠিক চার বছর পর ২০১৭ সালে আমরা পাই তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘কতিপয় মুখস’ মানুষ’। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কুমিল্লার বিখ্যাত ঐতিহাসিক প্রত্ন চরিত্র ময়নামতীকে নিয়ে তৃতীয় উপন্যাস ময়নামতী উপাখ্যান (২০১৮)। প্রথম উপন্যাসের বিষয়বস’ বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন আর দ্বিতীয় উপন্যাসের বিষয় হলো সমকালীন সমাজ, জনপথের সন্ত্রাস ও রাজনীতি। এবার তিনি উপন্যাসের প্লট সাজিয়েছেন কুমিল্লার একাদশ শতকের রাণী ময়নামতীকে নিয়ে।
ময়নামতী কুমিল্লার একটি ঐতিহাসিক স’ান। রাণী ময়নামতীর নামে এই অঞ্চলে বহুবিধ প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। রাণী ময়নামতীকে নিয়ে বাংলাসাহিত্যে ইতোপূর্বে কোনো গল্প-উপন্যাস রচিত হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। আমার মনে হয়, মাওলাই প্রথম ময়নামতীকে নিয়ে ফিকশন রচনা করেছেন।
রাজা মানিকচন্দ্রের স্ত্রী ময়নামতী ছিলেন নাথ ধর্মের অনুসারী একজন সাধক। সাধন ব্রত পালন করে তিনি মহাজ্ঞান লাভ করেছিলেন। অগ্নি, জল আর বায়ু-্এই তিন বস’কে জয় করে ময়নামতি লাভ করেন অমরত্ব। তার ছিলো আড়াই অক্ষর জ্ঞানের শক্তি। রুপে-গুণে অতুলনীয় বঙ্গ হরিকেলের পূর্বে আরাকান রাজ্যের রাজা থাতোমিনথরের দুই কন্যা এলাচ সুন্দরী ও বিলাস সুন্দরীকে রাজা মানিকচন্দ্র তৃতীয় বিবাহের মাধ্যমে প্রাসাদে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। রাণী ময়নামতী এই সংবাদ শুনে রাজার উপর ক্ষুব্ধ হন। তৃতীয় বিয়ে করতে রাজাকে অটল দেখে রাণী রাজাকে একটি শর্তে দিয়ে বলেন, ‘ফেরুসা নগরে আমার জন্য আলাদা একটি কুটির নির্মাণ করে দিতে হবে। তৃতীয় রাণী ঘরে আসার আগেই আমি ঐ কুটিরে চলে যেতে চাই।’ রাজা রাণীর দেয়া শর্ত এক বাক্যে রাজী হলেন এবং দু’বোনকে বিয়ের পূর্বেই রাণীর জন্য কুটির নির্মাণ করে দেন। তৃতীয় ও চতুর্থ রাণী ঘরে আসার আগেই রাণী ময়নামতী ফেরুসা নগরে থিতু হন।
সমতটের সমৃদ্ধ নগরী ছিলো কমলাঙ্ক। স্বর্ণালঙ্কারের মতোই ছিলো তার ঐশ্বর্য। রাজপ্রাসাদ, আনন্দ বিহার, শালবন বিহার, ভোজ বিহার, রুপবানমুড়া, ইটাখোলামুড়া, চারপত্রমুড়া, কোটিলামুড়া, ফেরুসা নগর, রাজগঞ্জ, রাণীর দিঘি ইত্যাদি স’ান এখনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। শ্রমণ, ভিক্ষু, ঋত্বিক, পুরোহিত, মালি, মুচি, চাষা, জেলে, গোপাল, সুতার, নাপিত, ধোপা, চাঁড়াল, পোদ্দার, বণিক, তস্কর, লস্কর সকল জাতিপেশার মানুষ নিয়ে তার রাজ্য। কর্মই ধর্ম-এই মন্ত্রে চলেছে সমাজ। রাজা মানিকচন্দ্রের মৃত্যুর পর নতুন রাজা গোপীচন্দ্রের শাসনামলে করারোপ নিয়ে দেখা দেয় প্রজাদের মধ্যে গোলযোগ।
সমতটের সমৃদ্ধ নগরী কমলাঙ্ক রাজ্যের নিয়ম অনুসারে রাজার একমাত্র পুত্র ষোল বছরের রাজকুমার গোপীচন্দ্র সিংহাসনে বসেন। শালবন বিহারের ধর্মগুরু হাঁড়িসিদ্ধা ও ধ্যানযোগে রাণী ময়নামতী জানতে পারেন যে, আঠারো বছর বয়সে গোপীচন্দ্র যদি বারো বছরের সন্ন্যাস ব্রত পালন না করেন, তবে তার মৃত্যু অবধারিত। এ সংবাদ পুত্রকে জানানোর পর সে মাকে সন্দেহ করে। রাণীমাতা ময়নামতী ও রাজপুত্র গোপীচন্দ্রসহ পুত্রবধূদের মধ্যে রাজ্য পরিচালনা নিয়ে শুরু হয় বাদ-বিবাদ। রাজ্য পরিচালনা নিয়ে মাকে সে ভুল বোঝে। সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত গোপীচন্দ্র ঘরে তন্নী-তরুণী স্ত্রী অদুনা-পদুনাকে রেখে, রাজত্ব ফেলে সন্ন্যাসী হতে চায় না। লোকজন বলাবলি শুরু করে, ময়নামতী চক্রান্ত করে পুত্রকে দূরে পাঠিয়ে নিজের কাছে রাজ্যের ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়। শুরু হয় মাতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব। রাণী মাতাকে উদ্দেশ্য করে পুত্রবধূরা করে নানা কটূক্তি। শেষ পর্যন্ত ময়নামতী তার মহাজ্ঞানের বলে সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং গোপীচন্দ্র হাঁড়িসিদ্ধাকে গুরু মেনে বারো বছরের সন্ন্যাস জীবন কাটিয়ে ফিরে আসে এবং ময়নামতী পুত্রের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে পাহাড়ের গুহায় মহাজ্ঞানের শক্তি বলে অদৃশ্য হয়ে যায়।
ময়নামতী উপাখ্যানের চরিত্র নির্মাণে ঔপন্যাসিক আহমেদ মাওলা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। মানিকচন্দ্র, গোপীচন্দ্র, ময়নামতী, হাঁড়িসিদ্ধা, অদুনা, পদুনা, ভুবন দাশ, সত্যানন্দ ভট্ট প্রমুখ চরিত্র স্বমহিমায় উজ্জ্বল। উপন্যাসের কাহিনীতে ইতিহাস সম্মোহিত একজন যুবকের সাথে পাঠকের নাটকীয়ভাবে পরিচয় ঘটবে যে পাঠকের হাত ধরে নিয়ে যাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন নগরীতে। ‘এক সময় যা ছিল, অথচ এখন নেই, সেই প্রত্ননগরীতে রোমাঞ্চকর মানস-ভ্রমণের স্বাদ পাবেন পাঠক। সময়ের নির্বাক ইতিহাস, সবাক-শব্দায়িত হয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলবে এ উপন্যাসে।’ মোট ছয়টি অধ্যায়ে রচিত হয়েছে আখ্যানটি। প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে প্রাচীন পুঁথির ঢঙ্গে ছয় পংক্তির অন্ত্যমিলের একটি করে পদ্য আছে, যা পাঠককে পরবর্তী ঘটনার সূত্র ধরিয়ে দেয়। আহমেদ মাওলার ভাষা নির্মেদ, ঝরঝরে। পাঠক এক বসায় সত্তর পৃষ্ঠার এই বইটি শেষ করতে পারবেন। প্রথাগত কাহিনী বিন্যাস থেকে এই উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাস একটু ব্যতিক্রম। আশা করি উপন্যাসটি পড়ে পাঠকরা অনেক অজানা তথ্যের সঙ্গে পরিচিত হবেন এবং আনন্দ পাবেন।