মহসীন কাজীর কালের সাক্ষী সময়ের কাটাছেঁড়া

প্রদীপ নন্দী

বর্তমানকে ভবিষ্যতের কাছে নিয়ে যাবার দুর্বার চেষ্টা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। সৃষ্টির আদিকাল থেকে এই নিরন্তর চেষ্টার প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়। সমকালীন চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণাকে ভবিষ্যতের কাছে পৌঁছে দেয়ার মধ্যে বর্তমান-ভবিষ্যতের সেতুবন্ধন নিহিত। মানুষ নানা কলা কৌশলে তার পারিপার্শ্বিকতাকে ফ্রেমে আবদ্ধ করে রাখে। তাই তো সৃষ্টি হয়েছে মিশরের পিরামিড, আগ্রার তাজমহল, বানপো, অশোকস্তম্ভ্ভ ইত্যাদির। কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিকেরা ইতিহাস রচনার মধ্যমে সমকালীন পরিসি’তিকে অনাগত ভবিষ্যতের কাছে পৌঁছে দেন। শত বছর আগে কবি শবরপা, লুইপা, কাহ্নপা চর্যাপদ রচনা করায় তৎকালের বিরাজমান সাহিত্য সাংস্কৃতিকের ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে আজ আমাদের জানার সুযোগ হয়েছে।
মহসীন কাজীর সাংবাদিক জীবনকে পারিপার্শ্বিক যে সমস্ত ঘটনা বেশি প্রভাবিত করেছে, তিনি সেই ঘটনাবলীকে কালের সাক্ষী হিসাবে ‘সময়ের কাটাছেঁড়া’ গ্রনে’ উপস’াপন করেছেন। সময় উপযোগী বিশটি প্রবন্ধ নিয়ে গ্রন’টি রচিত হয়েছে। গ্রন’টির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, প্রতিটি নিবন্ধে ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের বারুদের গন্ধ পাওয়া যায়।
লেখক প্রথমেই তাঁর জন্মভূমি চট্টগ্রাম এবং প্রিয় প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সমুন্নত রাখতে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল স’াপন করে। ম্যুরাল স’াপনের পেছনে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ভূমিকার অনেক অজানা তথ্য সরবরাহ করে, লেখক চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ইতিহাসকে সমৃদ্ধিশালী করেছেন। ‘বঞ্চিত বীরের বিদায়’ নিবন্ধে মোহাম্মদ শাহ বাঙালির অবহেলিত জীবনচিত্র রচনায় গুণীজনের প্রতি সমাজের অবহেলা, লেখক আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। তাতে বঞ্চিত মানুষের প্রতি লেখকের জনদরদী মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সন্ধানে, যুদ্ধকালীন সময়ে অসামপ্রদায়িক মির্জা পরিবারের ভূমিকার চিত্র সাংবাদিক মহসীন কাজীর প্রশংসনীয় উপস’াপন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমটি অ্যাভলুজ ধ্বংস একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। অ্যাভলুজ ধ্বংসের সংবাদ তৎকালীন বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশ্বকে জানান দেয় বাঙালিরা স্বাধীনতার জন্য মরিয়া। সৃষ্টি হয় বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বের সমর্থন। ‘টার্গেট অ্যাভলুজ’ নিবন্ধটি স্বাধীনতা যুদ্ধের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দ্বারা সমাদৃত।
‘একটি চিঠির গল্প’ প্রবন্ধে লেখকের ইতিহাস সন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় মেলে। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন নারী মুক্তিযোদ্ধাকে দেখা যায়, তেমনি ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে নারী মুক্তিযোদ্ধার সন্ধান করতে গিয়ে চট্টগ্রামের বীর কন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারকে তুলে আনেন। প্রীতিলতার সংগ্রামী জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মহসীন কাজীর লেখায় স’ান পেয়েছে।
সত্য সংবাদ সংগ্রহ করে প্রকাশ করা একজন সাংবাদিকের মহান দায়িত্ব। দায়িত্ব পালনে সাংবাদিককে অনেক সময় জীবনের ঝুঁকি নিতে দেখা যায়। অনাহারে অনিদ্রায় কাল যাপন করে সংবাদ সংগ্রহ করেন। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ সাংবাদিক কাজীর কালের সাক্ষী ‘যে নির্বাচনে ভোটার ছিল না’ ও ‘গুড হিলে বিনিদ্র রজনী’ নিবন্ধ দু’টি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে করে সন্দ্বীপ যাওয়া। কাদামাটি মাড়ায়ে অর্ধাহারে অস্বাস’্যকর হোটেলে রাত্রি যাপনের পর নির্বাচনী সংবাদ সংগ্রহের বিরল ঘটনা পাঠককে ভাবিয়ে তোলে। রাজাকার সাকা চৌধুরীকে আটক একটি সংবেদনশীল সংবাদ। সংবাদটি সংগ্রহ করতে গিয়ে লেখকের দায়িত্বশীলতার যে পরিচয় পাওয়া যায়, তা আগামী সাংবাদিকদের দায়িত্বে সচেতনতার নিয়ামক।
পরিবার পারিপার্শ্বিকতাকে স্মৃতির খাতায় আবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। ‘বাবা’ ও ‘মায়ের সাথে হজ’ প্রবন্ধ দু’টিতে লেখকের সেই সহজাত প্রবৃত্তির প্রতিফলন ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধে লেখকের অসামপ্রদায়িক পিতার ভূমিকায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাঁর পিতার মহান দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সন্তানকে মানুষ গড়তে পিতা-মাতার কঠোর পরিশ্রমের বর্ণনা, পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য সম্পর্কে সন্তানকে সচেতন করবে। মাকে সাথে নিয়ে লেখকের হজ পালনের নির্মল অনন্দ, হজের অনন্দঘন মুহূর্তগুলি পাঠকের হৃদয়ে মমতাময় পিতা-মাতাকে নিয়ে নানা স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে। মায়ের প্রতি লেখকের কর্তব্য এবং ধর্মের প্রতি আনুগত্য, দুই এর সমন্বয় পাঠককে স্বীয় কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ করে দেয়। লেখক মহসীন কাজীর দীর্ঘ হজ পরিক্রমা নতুন হজ যাত্রীকে হজ পালন সম্পর্কে নানা অভিজ্ঞতার সন্ধান দেবে।
গুনীজনকে সমাদর, তাদের দুর্দিনে সহানুভূতির হাত বাড়ানোর বিশেষ মানবিক গুণের প্রকাশ পাওয়া যায় ‘জ্ঞানের বাতিঘর’ নিবন্ধে। ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত লেখক-সাংবাদিক সিদ্দিক ভাইকে বাঁচানোর জন্য সহকর্মী মহসীন কাজীর সহমর্মিতা প্রদর্শন একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত । লেখকের অভিজ্ঞতামূলক প্রবন্ধ ‘আলো আসার আগে’। প্রিয়জনের কষ্টে মানুষ অনেক সময় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। এমন পরিসি’তির মোকাবেলা করতে গিয়ে লেখক উপলব্ধি করেছেন হাসপাতালের নানা অনিয়ম,অবহেলা, ডাক্তারদের দায়িত্বহীনতা ও মানবিকতার নানা বিপর্যয়। আবার অন্যদিকে উপলব্ধি করেছেন বিপদে বন্ধু-বান্ধবদের সহানুভূতির অভিজ্ঞতা। হাসপাতাল সম্পর্কে, জনসাধারণের অনেক অজানা তথ্য এই প্রবন্ধে সন্নিবেশিত হয়েছে। যা পাঠকের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করবে।
লেখক মহসীন কাজীর নিবন্ধ তিনটি-‘গৌরব আর উদ্বেগের চট্টগ্রাম কলেজ’, ‘১০ ট্রাক অস্ত্র’ ও ‘সিনেমা হলের সুদিন দুর্দিন’ কালের উজ্জ্বল সাক্ষী। লেখক ১৯৮১ হতে গত তিন দশক চট্টগ্রাম কলেজে শিবিরের নির্মম রাজনীতির চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বেশি গভীরে প্রবেশ করেননি।
অনেক গভীরে যাবার সুযোগ থাকলেও তিনি সুযোগ গ্রহণ করেননি। বর্তমান ছাত্রলীগের লাগামহীন রাজনীতির ক্ষেত্রেও তাঁর একই নীতি দৃশ্যমান। ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ চোরাচালান ও এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। লেখক অতি সংবেদনশীল সংবাদটিকে কালের সাক্ষী করে প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। অতীতের সেরা বিনোদনের স’ান ছিল সিনেমার হল। সেইদিনের সিনেমা হল আজ কালের সাক্ষী। সিনেমার দুর্দিন নিয়ে লেখকের সার্থক রচনার মধ্যে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কালের সেতুবন্ধনে খুঁজে পাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
প্রবন্ধ ‘পণ্যমূল্যে কারসাজি ও মজুদদারি’ সাংবাদিক মহসীন কাজীর একটি সাহসী পদক্ষেপ এবং এ‘ নিবন্ধে তাঁর গভীর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে। তিনি যুক্তিপূর্ণ লেখনীর মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের আসল চেহারা খুলে দিয়েছেন। এদেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী মুসলমান। তারা ধর্মকে পুঁজি করে ব্যবসা করা সম্পর্কে নানা অজানা তথ্য প্রবন্ধটিতে প্রকাশ করায় রচনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গণসচেতনামূলক প্রবন্ধ ‘ভেজালের জাল’ মহসীন কাজীর একটি সুন্দর উপস’াপনা,বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রবন্ধ পাঠে পাঠক অনেক অজানা সত্যের সন্ধান লাভে উপকৃত হবেন।
‘হুমকির মুখে সাগরের মাছ’ প্রবন্ধটি ‘সময়ের কাটাছেঁড়া’ গ্রনে’র তথ্যবহুল নিরীক্ষাধর্মী রচনা। মৎস্যসম্পদ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স’ান দখল করে আছে। সেইদিক থেকে প্রবন্ধটির গুরুত্ব অপরিসীম। লেখকের উত্থাপিত মূল্যবান তথ্য আগামী প্রজন্ম ও মৎস্য গবেষকদের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান রাখতে পারে। গ্রনে’র লেখক সাংবাদিক হওয়ায়, তাঁর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি থেকে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার হালচালও এড়িয়ে যেতে পারেনি। তাই তাঁর লেখনীতে উঠে এসেছে, শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্র-শিক্ষক, শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্ক, উঠে এসেছে শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির নানা দিক।
সাংবাদিক মহসীন কাজীর প্রথম গ্রন’ “সময়ের কাটাছেঁড়া” স্বাভাবিক রচনা থেকে কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির সৃষ্টি। তাঁর সাংবাদিক জীবনের নিরীক্ষাধর্মী প্রতিবেদনগুলোকে সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কালের সাক্ষী হিসাবে দাঁড় করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর নিরন্তর চেষ্টা অনেকখানি সার্থক বলে মনে হয়। অর্থবহ চিত্র সম্বলিত ঝক্ঝকে মলাটের গায়ের লেখক পরিচিতি এবং বইটির উপর সাংবাদিক কথাসাহিত্যিক জাহেদ মোতালেবের সংক্ষিপ্ত অনুভূতি পাঠককে আকৃষ্ট করে। বইটির মূল্য দুইশত পঞ্চাশ টাকা। সাধারণের নাগালে থাকায় ক্রয়ের সুযোগ থাকছে। এটি প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের আবির প্রকাশন।