চকলেটের মতই

জাকির হোসেন কামাল

জাফ্না জ্বালাচ্ছে খুব। জন্ম থেকেই ও একরোখা। কাঁদছে তো কাঁদছেই। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবেই। আর জাওয়াদটাও হয়েছে বদের হাড্ডি। মেয়েটাকে কাঁদাবেই। কাঁদিয়েই তার সুখ। ভাইবোনের এতো টান। অথচ প্রতিদিন স্কুল থেকে এসেই জাফ্নাকে কাঁদানো তার রুটিন কাজের অংশ। আরে বাবা চকলেট খাবেতো বাইরে খেয়ে আসো। মেয়েটার সামনে কেন? অথচ জাওয়াদ প্রতিদিন স্কুল থেকে এসে একটা কাঠি লজেন্স মুখে পুরে জাফনার সামনে গিয়ে ঘুরবে। আর জাফনা তার পেছন পেছন ঘুরবে, কাঁদবে, কেঁদে সারা বাড়ি এক করবে।
আজও একই অবস’া। আমি এসব দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই ভাই-বোনের খুনসুটি নিয়ে তেমন কিছু বলি না। পারত পক্ষে আমি রাগ করি না কিন’ রাগলে মাথা ঠিক থাকেনা। বাচ্চারা সেটা জানে। জানে তাদের বাবাও। ছেলেটা কাল চলে যাবে, বেড়াতে বেশ কদিনের জন্য মামার বাড়ি। আজ তার এরকম না করলেও হতো। ভেবে মনটা বিষিয়ে গেল। কড়া চোখে ডাকলাম। জাওয়াদ, ও আমার চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝলো, আজ রক্ষা নেই। দিল ভোঁ দৌড়।
অমনি ছেলেটা চৌকাঠে লেগে উল্টে পড়ে গেল। সিঁড়ির কোণায় লেগে কপাল ফেটে রক্ত বেরুচ্ছে । আর মাগো মা বলে চিৎকার করছে। দৌড়ে গিয়ে ছেলেটাকে কোলে নেই। ঘরে এনে রক্ত মুছে দেই। কাপড় চাপা দিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করি। অনেকক্ষণ চেষ্টায় রক্ত পড়া বন্ধ হয়েছে। স্যাভলন ক্রীম দিয়েছি। রাগটা এখন জাফনার উপর। ও বুঝতে পেরে কাছে আসছে না। দূর থেকে কাঁদছে। আর বলছে আমি আর কোনদিন চকলেট খাবো না মা, আমি আর কোনদিন চকলেট খাবো না। তবুও রাগটা এখনো আমার মাথায়। কাছে পেলে একটা শক্ত থাপ্পর বসিয়ে দেই ওর নরম গালে।
এরই মধ্যে দুধওয়ালা এলো। মা গো মা, দুধটা রাহেন। বুড়োর ব্যাবহার অনেক ভালো। তার প্রবেশাধিকারও বাড়ির ভেতরে অন্দর মহলে। অন্যদের চেয়ে ওনার দুধ অনেক ভালো। কোন পানি মেশানো বা ভেজাল নেই। দামও বেশি। লোকটার সাথে ঠিক আমার বড় চাচার চেহারার অদ্ভুত মিল। ওনি হাসেনও তেমন করে। যদি ফান করে বলি আপনাকে আর দুধের টাকা দেব না। তবুও লোকটা হাসবে। বলবে, না দেন আম্মা, তবুও আপনেরে দুধ দেমু। দুধটা নিয়ে ঘরে এসে দেখি ভাই বোন এক সাথে। জাফনা বলছে, ভাইয়া আমাকে মাফ করে দে। আমি আর চকলেট খাবো না। আমি দূর থেকে দেখি, আর চোখ মুছি। কেন যে আমার দুটি চোখ ভারী হয়ে এলো। এ মুহূর্তে আমার আর কোন রাগ নেই।
অনেক রাত। ঠিক কতটা জানি না, দু’টা বা তিনটা হবে হয়তো। সাধারণত রাত এগারটায় শুয়ে পড়ি ও ঘুমিয়ে যাই। আজ ঘুম আসছে না। ছেলেটা চলে যাবে কাল, বেশ কয়েকদিনের জন্য। এই চিন্তা ছাড়াও ওর বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামী বছর থেকে ওকে ঢাকাতে মামার বাসায় রেখেই পড়ালেখা করাবে। ওর ব্যবসায়িক বাবা কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক বুদ্ধি খুব কাজ করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে সে ভীষণ উদার।
এ বিষয়টা ওকে বুঝাতে চেষ্টা করি, গ্রামে থেকেও তো অনেক ছেলে মেয়ে অনেক বড় হয়েছে। আর ও তো জেলা শহরের স্কুলে পড়ছে। না, ওর একই কথা, ভালো ক্যারিয়ারের জন্য ঢাকায় পড়ালেখার কোন
বিকল্প নেই। ভেবে ভেবে কষ্ট পাচ্ছি খুব। আজকাল বাচ্চাদের উপর পড়ালেখার এতো চাপ। হারিয়ে যাচ্ছে ওদের আনন্দময় শৈশব। বেড়ে উঠছে শৈশবহীন শিশু। বেড়ে যাচ্ছে শৈশব
হারানোর মাত্রা। কী হবে আমার ছেলেটার? ছোটবেলা থেকেই ও মায়ের নেওটা। প্রথম প্রথম স্কুলে দিতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি নিয়ে আমাকে ক্লাসের বাইরে বারান্দায় ওর দৃষ্টিসীমার মধ্যে বসে থাকতে হয়েছে।
সেই ছেলেটা কিভাবে যে মা-বাবাহীন থাকবে, ভেবেই পাচ্ছি না।
আজ মেয়েটার ভীষণ মন খারাপ। ওর মন খারাপ থাকলে মেজাজটা খিটখিটে হয়ে যায়। সারাদিন ঘ্যানর ঘ্যানর করে। আমি বুঝতে পারি আজ জাওয়াদ না থাকায় তার মনটা ভীষণ খারাপ। তাই আজ আর ওকে কিছু বলি না। আজ সারাদিন ও যা চাচ্ছে তাই দিচ্ছি। ঠান্ডা লাগবে জেনেও ওকে একটু আগে আইসক্রিম খেতে দিয়েছি। সারাদিন বলেছে, ভাইয়াকে কেন যেতে দিলে? বলেছি, তুমি তো ওকে শুধু মারো। এজন্যই ও চলে গেছে। মেয়ে আমার বার বার বলছে আর মারবো না মা। ভাইয়াকে আসতে বলো। ওকে বুঝিয়েছি, মাত্র ক’টা দিন পরেই আসবে। মেয়ে মোটেই বুঝতে চায় না। অথচ প্রতিদিন কারণে অকারণে জাওয়াদকে মারা ওর স্বভাব। ছেলেটা বুঝে। বোনের মার খেলেও কিছু বলে না। এমনকি মায়ের কাছে নালিশ পর্যন্ত করে না। ছেলেটার জন্য আজ আমারও মনটা ভীষণ রকম খারাপ। আজ জাফনা চকলেটও চাচ্ছে না। অন্যদিন হলে চকলেট আদায় করে ছাড়তো। এজন্য তাকে কতো বলি। দাঁতগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কে শোনে কার কথা। একদিন জাফনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ও তখন আরো ছোট, ভাইয়াকে তুমি ভালোবাসো? জাফনা মাথা নেড়ে উত্তর দিয়েছিল, বাসি। আবার প্রশ্ন করি, কেমন ভালোবাসো? ও জবাব দিয়েছিল, আমি ভাইয়াকে চকলেটের মতো ভালোবাসি। আজ মনে হচ্ছে জাফনা জাওয়াদকে চকলেটের মতোই ভালোবাসে।কারণ চকলেট তার খুবই প্রিয়।
বিকাল হয়ে এলো। এতক্ষণে ওরা হয়তো ঢাকায় পৌঁছে গেছে। ছেলেটা বুঝি একেবারে শূন্য করে গেল। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, ও যাওয়ার আগে কি যেন বলতে চেয়েছিল।
শেষে আর বলাই হলো না। ও হ্যাঁ কি যেন একটা কাগজ নাকি টেবিলের ওপর কৌটায় রেখে গেছে। সারাদিন কাজের চাপে দেখাই হলো না। মনে পড়তেই, কৌটা খুলে দেখি, অনেকগুলো চকলেট আর একটি কাগজ। তাতে লেখা, মা জাফনাকে আমি খুব ভালোবাসি। ওর জন্য প্রতিদিন ৩টি চকলেট আনি। স্কুল থেকে এসেই একটি খেতে দেই। একটি সন্ধ্যার সময় ও আরেকটি সকাল বেলা। সন্ধ্যা আর সকালে চকলেট ওর হাতে দেই না। আমার আলনায় ঝুলানো শার্টের পকেটে রাখি। ও গোপনে চুরি করে নিয়ে খেয়ে ফেলে। ওকে বললে ও বলে ইঁদুর খেয়ে ফেলেছে ভাইয়া। ওকে প্রতিদিন ৩টি করে চকলেট দিও মা। চিরকুটটি পড়তে পড়তে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। আর পাশের রুমে তাকিয়ে দেখি জাফনা জাওয়াদের শার্টে হাত দিয়েছে। কিছু খুঁজছে। এখন মনে হচ্ছে, সত্যি ভাই বোনের ভালোবাসা চকলেটের মতোই।