তোমাদের জন্য বই

একাত্তরে দুই কিশোর

বিপুল বড়ুয়া
EKATTURE-DUI-KISHORE-ABARER

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে বড়দের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে অমিত তেজে যুদ্ধ করার গৌরব গাথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। শিশু-কিশোররা কখনো সম্মুখ যুদ্ধে কখনো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগী-সহযাত্রী হয়ে অসামান্য অবদান রেখেছে- মুক্তিযুদ্ধের গল্প কথা-পূর্বাপর নানা ইতিহাসে সমবয়সী ছোটদের কাছে সগৌরবে বর্ণনা করে তাদের মনে প্রাণে দেশপ্রেমের অনির্বাণ শিখা জ্বালিয়ে দিয়েছে।
কবি লেখক প্রাবন্ধিক গল্পকার কলাম লেখক নিবেদিত উন্নয়ন সংগঠক সাঈদুল আরেফীনের চমৎকার দ্বিতীয় গল্পগ্রন’ ‘ একাত্তরে দুই কিশোর’ পাঠে উল্লেখিত প্রাক কথার যথার্থ সাক্ষ্য মেলে। গল্পকার সাঈদুল আরেফীনের ‘একাত্তরে দুই কিশোর’ গল্পগ্রনে’ সু-মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের তিনটি গল্প রয়েছে- ১. সাজিদের যুদ্ধযাত্রা ২ .একাত্তরে দুই কিশোর ৩. যুদ্ধে যাবার স্বপ্ন ছিলো। লেখক গ্রনে’র তিনটি গল্পেই মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের পাকিস্তানি সেনাদের নির্মম ক্রুরতা, অমানবিক আচরণ, বাংলাদেশ- বাঙালি জাতিকে ধ্বংসের নৃশংসতার পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভীক সংগ্রাম ত্যাগ-তিতিক্ষা, যুদ্ধে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গের অমলিন গাথা তার চমক দেয়া লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। গল্পগুলোতে তার কথনে বারবার ওঠে এসেছে বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য আমাদের জাতির জনক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টে নির্মমভাবে হত্যার কথা, সর্বস্তরের বাঙালি জন মানুষের প্রাণ রক্ষার জন্য বাড়ি ঘর, সহায়-সম্পদ ফেলে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এথায় হোথায় পালিয়ে বেড়ানোর কথা, মা বাবার কাছে যুদ্ধদিনের বিভীষিকার কথা। সর্বোপরি যুদ্ধজয়ের বেদনা মধুর দিন গুলোর কথাও।
‘সাজিদের যুদ্ধযাত্রা’গল্পগ্রনে’র প্রথম গল্প। এ গল্পে দেখা মেলে আত্মসচেতন অনুসন্ধিৎসু সাজিদকে। তার কাছে দূরের স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবহ দিনগুলোর কথা। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার নৃশংসতার কথা। পাকিস্তানি হানাদারদের নির্যাতন, তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার আলবদরদের নৃশংসতা, স্মৃতির প্রিয় প্রাঙ্গণ লামাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহপাঠীদের নিয়ে স্বাধীনতার টুকরো টুকরো স্মৃতি মনে করা, যুদ্ধের ভয়াবহ দিনে পাকিস্তানি সৈন্যের চিল চাউনি পেরিয়ে শহরের নানুবাড়িতে ফেরা, সবাইকে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করার নানা বিষয় প্রসঙ্গে সত্যিই আলোকিত ‘সাজিদের যুদ্ধযাত্রা’। আরমান আর মাহিন-দুই কিশোরকে নিয়ে গল্পগ্রনে’র দ্বিতীয় গল্প ‘একাত্তরে দুই কিশোর’। মাহিন বাবার সাথে শহর ছেড়ে বাড়ি পালাচ্ছে পলাশডাঙা গ্রামে। ভয়ংকর বিপদসংকুল পথ ঘাট লঞ্চ যাত্রা। কোনোরকমে বাড়ি ফিরে সহপাঠী আরমানের সাথে দেখা। দু’জনে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যোগ দেয়া, চালাকি করে পাকিস্তানি মিলিটারি ক্যাম্পে কাজ নেয়া, তাদের খবরাখবর কৌশলে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে কমান্ডার নিজামের নেতৃত্বে পাক সেনাদের অভিযানে হামলা করে তাদের পরাস্ত করা-সাপ দেখিয়ে ভড়কে দেয়া-এতসব ছিলো একাত্তরের যুদ্ধদিনের নিত্য নৈমিত্তিক চিত্র- যা লেখক বেশ কুশলতার সঙ্গে প্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছেন। সফল ও হয়েছেন।
রিয়াদ-মুনীরের গল্প চারপাশের গল্প-যুদ্ধদিনের গল্প-নিজেদের চেতনাকে শাণিত করার গল্প। গল্পকার সাঈদুল আরেফীনের ‘একাত্তরে দুই কিশোর’ এর শেষ গল্প ‘ যুদ্ধে যাবার স্বপ্ন ছিলো’। যুদ্ধের ভয়াবহতা, নানুবাড়ি হামলা-পাঞ্জাবি সৈন্যের ক্রুরতা কি ভোলা যায়। রিয়াদ মুনীর শামীম যুদ্ধকালীন পাকিস্তানি মিলিটারির নৃশংসতার গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে। সমবয়সীরা ভয়ে তটস’ হয়ে পড়ে-সেইসব শুনে-ঘৃণায় থুতু ছিটায় পাকিস্তানিদের উদ্দেশে।ওরা আবার স্বাধীন বাংলাদেশকে নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে নতুন করে গড়তে এক নতুন যুদ্ধে নেমে পড়ে। অপার দেশপ্রেমে স্বদেশকে রাঙিয়ে তুলে। লেখক এই গল্পে যুদ্ধশেষে স্বদেশ চেতনাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার অপরূপ ব্যঞ্জনা ছড়িয়েছেন যা লেখকের লেখনীর শক্তিমত্তার জানান দেয়।
বিষয় বৈচিত্র্য ও বর্ণনা চাতুর্যে লেখক সাঈদুল আরেফীনের স্বভাব কুশলতা এ গল্পগ্রনে’ সহজেই চোখে পড়ে। মাঝে মাঝে বানান বিভ্রাট পাঠককে ভোগালেও বন্ধুবৎসল আদ্যোপান্ত- অক্ষরবৃত্তের চমৎকার এ প্রকাশনা। অলংকরণে ফারজানা পায়েলের কুশলতা বেশ চোখে পড়ে। ২৪ পৃষ্ঠার গল্পগ্রনে’র মূল্য একশত ষাট টাকা মাত্র।