মন্টুর পাঠশালা

আলমগীর শিপন

পূর্ব প্রকাশের পর
(৩)
একদিন, দুইদিন, তিনদিন। মন্টুর দেখা নেই। কোথায় গেল ছেলেটা! আনিস মামাও নেই। বুকটা হাহাকার করে ওঠলো। সপ্তাহখানেক বাদে আনিস মামা ফিরে এলেও, মন্টুর দেখা নেই। যুদ্ধটুদ্ধ নিয়ে আগে থেকেই মামা আমাকে কিছইু বলতো না। আমিও না। কেবল মন্টুর জন্যই সেদিন বিনা অনুমতিতে মামার ঘরে ঢুকলাম। আমায় দেখে মামা বললেন, ‘আমি জানি, তুই কী বলতে এসেছিস, শুনে কষ্ট পাবি, তবে মন্টুর আম্মাকে কিছুই বলিস না।’
আমার কলজেটা শুকিয়ে গেল। নিশ্চয় মন্টুর কোন বিপদ হয়েছে! মামা বললেন, ‘মন্টু আর ফিরবে না শীলা। কোনো দিন না।’
শুনে আনিস মামার মুখের দিকে কতক্ষণ হা হয়ে তাকিয়ে ছিলাম, জানা নেই আমার। মনে হল-পুরো আসমান আমার মাথার ওপর চাপা পড়েছে। আনিস মামা বললেন, ‘মন্টু শহীদ হয়েছে শীলা। বাঁচিয়েছে চল্লিশ জন মুক্তিযোদ্ধাকে। এমন সাহসী ছেলে আর হয় না, বলে মামা থেমে গেলেন। নিচের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ডান হাতের পিঠ দিয়ে চোখজোড়া মুছে বললেন, ‘কথাছিল সদর থানা আক্রমণ করার। প্রস’তি নেয়ার আগে পাকবাহিনী জেনে যায়। অকস্মাৎ মুক্তিবাহিনীকে ঘিরে ফেলে। যোদ্ধারা নিরুপায়। নিশ্চিত মৃত্যু জেনে একাই ব্যাগভর্তি গ্রেনেড নিয়ে এগিয়ে যায় মন্টু। এলোপাথাড়ি গ্রেনেড ছুড়ে নাস্তানাবুদ করে দেয় ক্যাম্প। ক’জন পাকহানাদার স্পটে মারা যায়। পাকবাহিনী রাতের অন্ধকারে পিছু হটে। সুযোগে মুক্তিবাহিনী উল্টো আক্রমণ চালায়। পাকবাহিনী পিছু হটলেও মন্টু ফিরতে পারেনি। ওরা মন্টুকে তুলে নিয়ে যায়, হত্যা করে লাশ গাছের সাথে পেরেক দিয়ে গেঁথে রাখে।’
আনিস মামা থামলেন। বাকরুদ্ধ আমি। ক্ষণিকের জন্য চোখের জল শুকিয়ে গেছে আমার। মন্টুর দেয়া সেই বকুল ফুলের মালাটা গলায় হাত দিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরলাম। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম-মন্টুর হাসিমাখা ফুটফুটে মুখখানা ভেসে উঠলো বকুল ফুলের মালায়।
(৪)
দেশ স্বাধীন হয়। ঢাকায় ফিরি। এরপর কত ঈদ এলো গেলো! মন্টু নেই, বকুল ফুলের মালা বানিয়ে কেউ এসে বলেনি, ‘শীলাদি, নাও, তোমার পরনের শাড়ির সাথে বেশ মানাবে। টিপটা মিলামিল পরলে কী সুন্দর লাগবে তোমায়! পরিও হারমানাবে তোমাকে। সেটি ছিল মন্টুর সাথে আমার শেষ ঈদ। হুট করে এসে বলবে না- শিলাদি, তুমি বিয়ে করবে না? বিয়ের পর মন্টুকে ভুলে যাবে না তো? হাত বাড়িয়ে সালাম করে কেউ বলবে না-শিলাদি, চার আনা হবে না, দু’টা সিকি চাই আমার, এক টাকা/দু’ টাকা নয়, তামার দুটো সিকি দিলেই হবে।’
স্বাধীনতার যতগুলো বছর পার করেছি, মন্টু ততটা দিন আমার হৃদয়ে খুব কাছে এসে কথা বলতো। আমি নীরবে কাঁদতাম। অল্প সময়ের জন্য পৃথিবীতে এলো মন্টু, আবার চলেও গেল। কেবলই ঋণী করে গেলে আমায়। আমার মতো সাত কোটি বাঙালিকে।
আনিস মামার সাথে যোগাযোগ ছিল কেবল মন্টুর জন্যই। আনিস মামার বয়স এখন সত্তোরোর্ধ্ব। নবগ্রাম হাইস্কুল এখন কলেজ হয়েছে। এত বছর পর হলেও নতুন ভবনে একটি গ্রন’াগার করেছে ক্ষুদে মুক্তিযোদ্ধা মন্টুর নামে। নামকরণ করেছে ‘মন্টুর পাঠশালা’। সেটিও করেছে আনিস মামা, মন্টুর লিডার। আমি বলি, ‘জানিস মন্টু, আনিস মামা যেদিন প্রস্তাব নিয়ে ঢাকায় এসেছে তোর শিলাদি’র কাছে। বুকটা কিছুটা হালকা হল। তোর শিলাদি তোর ঋণ শোধ করার অন্তত একটা সুযোগ পেয়েছে এতো বছর পর। ক্ষুদে মুক্তিযোদ্ধা মন্টুর স্মৃতিফলক উদ্বোধন করবে তোর শিলাদি ‘শিক্ষা সচিব ফারজানা শিলা’।
মন্টু, তোরও আজ খুশির সীমা নেই! তোর শিলাদি আসছে ‘নবগ্রাম’। তুই নেই। ভাবতে গেলে মনটা হু হু করে ওঠে। হয়ত নেই পুকুরপাড়ের বকুল ফুলের গাছও। কে তোর শিলাদিকে বকুল ফুলের মালা বানিয়ে দেবে আজ? আজ তোর বলা না বলা সব কথা শোনাবে তোর শিলাদি নতুন প্রজন্মের কাছে। তুই ওদের গর্ব। আমিও জোর গলায় গর্ব করে বলে যাবো- মন্টুরা দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তান। ‘মন্টুর পাঠশালায়’ মনোনিবেশ করলে তোমরা খুঁজে পাবে সাহসী বীর মন্টুকে।’ মন্টুরা মরে না, মরতে পারে না। যুগের পর যুগ চলে যাবে, লাল-সবুজের পতাকায় রয়ে যাবে হাজারো মন্টুরা।’
এতটা সময়ের ব্যবধান; জানি না, মিতাখালা আমাকে মেনে নেবে কী না। এত স্বার্থপর মানুষ হতে পারে? স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দীর পর এক সাহসী মুক্তিযোদ্ধার মায়ের খোঁজ নিতে যাবো, সেটি কী স্বার্থপরতা নয় মন্টু? আমি জানি মিতাখালা, তুমি, তোমরা কেউ আমাকে ক্ষমা করবে না। মন্টু, ভাই আমার। আমি নবগ্রাম যাইনি ঠিক; তবে একদিনের জন্যও তোকে ভুলিনি, ভুলতে পারেনি। জানিস, আমার সন্তানের নাম রেখেছি ‘মন্ট’ু। আমার সন্তানের মাঝে তুমি সবসময় আছো আমার পাশে, আমার হৃদয়ে এবং সবসময় থাকবে লাল-সবুজের পতাকায় লক্ষ কোটি বাঙালির প্রাণে-বকুল ফুলের সৌরভে।
(সমাপ্ত)