স্বাধীনতার বইমেলা উদ্বোধনে আহমদ রফিক

বিশ্বনাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে পাঠক-লেখক-প্রকাশক ও বইপ্রেমীদের পদচারণায় গতকাল শুরু হয়েছে পাঁচদিনব্যাপী স্বাধীনতার বইমেলা। চট্টগ্রাম একাডেমি আয়োজিত এ মেলা উদ্বোধন করেন বর্ষীয়ান লেখক ও ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক। তিনি বলেন, বইমেলা মানে লেখক-পাঠক ও প্রকাশক তিনের বন্ধন। মেলার মাধ্যমে মানুষে-মানুষে সমপ্রীতি গড়ে ওঠে। বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয়নি। বই কিনতে হবে এবং পড়তে হবে। কেননা বই মননশীলতাকে শাণিত করে। মনের নানান দরজা খুলে দেয়। মনুষ্যত্ববোধকে জাগ্রত করার ক্ষেত্রে বইয়ের ভূমিকা অপরিহার্য। দেশের বই কেবল নয়, বিশ্বসাহিত্যও পাঠ জরুরি। এখন বিশ্বায়নের যুগ। এ সময় বিশ্বসাহিত্য পাঠের মাধ্যমে বিশ্বনাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা ছাড়া তা সম্ভব নয়। লেলিন যেমন রুশে শিক্ষা ছড়িয়েছেন, শ্রীলঙ্কায় যেমন শিক্ষিতের হার বেড়েছে, তেমনি গোটাজাতিকে শিক্ষিত
করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, অশিক্ষিত জাতি মানবসম্পদ নয়, জাতির বোঝা। আমি মনে করি, সদিচ্ছা ও আন্তরিক চেষ্টা নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে গেলে শিক্ষিত জাতি পাওয়া অসম্ভব নয়। নারীদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় তথা আদর্শের জন্য তরুণসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণসমাজই পারে ক্যারিয়ার ঠিক রেখে একুশের চেতনায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আদর্শ সমাজ, বৈষম্যহীন সমাজ তথা অসামপ্রদায়িক সমাজ গড়ে তুলতে। তিনি বইমেলাকে আরও প্রসারিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, উচ্চমানসম্পন্ন বই প্রকাশ করতে হবে। মানসম্পন্ন বই প্রকাশের ক্ষেত্রে লেখক-প্রকাশককে ভাবতে হবে। পাঠককে বইমুখী করার জন্যে বইমেলায় ভালো-ভালো প্রকাশনা সংস’াকে যুক্ত করতে হবে।
সভাপতিত্ব করেন একাডেমির চেয়ারম্যান, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম একাডেমি সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে ভূমিকা রাখছে। সভ্যতাকে রক্ষা করে চলেছে। তাই বইয়ের প্রতি আমাদের ভালোবাসা আছে। থাকবে। চট্টগ্রামে এখন ভালো ও বিশ্বমানের বই পাওয়া যায়। তিনি বইপড়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, চট্টগ্রাম একাডেমি লেখক, পাঠক তৈরির ক্ষেত্রে প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক অধ্যাপক আবুল মোমেন, প্রাবন্ধিক-কলাম লেখক মাজহারুল ইসলাম বাবলা ও ওয়েল গ্রুপের ব্যবস’াপনা পরিচালক সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম। অধ্যাপক আবুল মোমেন বলেন, চট্টগ্রাম একাডেমি একটি সক্রিয় প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সাহিত্য-সংস্কৃতির কার্যক্রম জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দিয়েছে এ প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠান মনীষীদের স্মরণ করে গৌরবজনক কাজ করেছে। তিনি সংশয় প্রকাশ করে বলেন, মানুষ বই আসলে পড়ে কিনা। শিক্ষার্থীরা প্রশ্নের উত্তর শেখে। মূল বই পড়ে না। পূর্ণাঙ্গ বই না পড়ে অনার্স-মার্স্টাস পাস করা যায়। কিন’ সাহিত্য নিয়ে তর্ক-বিতর্ক-আলোচনা-বিতর্ক শোনা যায় না। এখন তারা মুঠোফোনে ব্যস্ত। এদেরকে বইয়ের সাধনায় ফিরিয়ে আনতে হবে। মহিলারা যেমন কৃষিকে, সমাজকে রক্ষা করেছে এবার বইকে রক্ষার দায়িত্ব নিতে পারে।
মাজহারুল ইসলাম বলেন, বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। বই চেতনাকে, মননশীলতাকে শাণিত করে। মন ও জ্ঞানকে ঋদ্ধ করে। বইমেলা কেবল বিভাগীয় শহর নয়, জেলা-উপজেলা-গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। তৈরি করতে হবে পাঠক ও পাঠাগার। নতুন প্রজন্মের উন্নত মানস গঠনে বই ও বইমেলা সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম কমু বলেন, বাঙালি জাতির আজ সুখের দিন। মাথা উঁচু করে সামনে এগিয়ে যাওয়া দিন। দেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০২১ সালে এ স্বীকৃতি পরিপূর্ণতা পাবে। ২০৪১ সালে দেশ মধ্যআয়ের দেশে পরিণত হবে।
বক্তব্য রাখেন বইমেলা উদযাপন পরিষদ আহ্বায়ক একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা রাশেদ রউফ। সূচনা বক্তব্য দেন একাডেমির মহাপরিচালক কবি জিন্নাহ চৌধুরী। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বইমেলা উদযাপন পরিষদ মহাসচিব নেছার আহমদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন আবৃত্তিশিল্পী আয়েশা হক শিমু।
এর আগে বিকাল ৪টায় বিভিন্ন মনীষীর নামে দেয়া ১৮টি কর্নার উদ্বোধন করা হয়। বইমেলা আগামী ২৬ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে।

আজকের কর্মসূচি
সকাল ১০টায় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। সাড়ে ১০টায় লেখক-পাঠক সম্মিলন। বিকেল ৩টায় আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতা। উদ্বোধক : সংগীত শিল্পী মৃণালিনী চক্রবর্তী। বিকেল ৫টায় লেখক ও শিক্ষাবিদ ড. বদরুল হুদা খানের সভাপতিত্বে শবনম খানম শেরওয়ানী শিক্ষাবৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি : চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার প্রাবন্ধিক ও গবেষক মো. আবদুল মান্নান। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ছড়া উৎসব।