প্রবাসী শিল্পী মনসুর কাযী চিত্রে বিষয়-বিবেচনা

প্রসঙ্গ পরিবেশ ও বন

আজিজুল কদির
3-3-18

শিল্পী মুহাম্মদ মনসুর কাযী নিরন্তর সাধনা ও সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে বিশ্ব-পরিমণ্ডলে স্বদেশী শিল্প সংস্কৃতি, প্রকৃতি, সৃষ্টি কৃষ্টি, ঐতিহ্যকে সম্মানের সাথে তুলে ধরেন তাঁর চিত্রে। সে মূলত দেশে ও বিদেশে তথা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিল্পীদের সাথে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।
ওমান প্রবাসী এই শিল্পী যেন ওমানে থেকেও স্বদেশেই বাস করেন। প্রবাস জীবনের সব সৃষ্টি, ভালোলাগা, দেশপ্রেম মিলে, দুই ভুবনের প্রাকৃতিক রূপ, ঘ্রাণ তাঁর অন্তরের ভেতর মিশে গেছে। সৃষ্টি করেন এক অনির্বচনীয় অনুভূতির। সেই অনুভূতিই যেন আঁকিয়ে নিয়েছে তাঁকে দিয়ে অসাধারণ সব শিল্পকর্ম।
প্রবাসী এই শিল্পী মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন, মানুষ যতই প্রবাসে থাকুক না কেন কিন’ তার প্রাণ পড়ে থাকে স্বদেশে। স্বদেশের শেকড় থাকে বলেই শৈল্পিক সুষমা বৃহৎ জীবনের ছন্দকে উম্মোচিত করেন তা সৃজন সৃষ্টি কর্মের মাধ্যমে। শিল্পীসম্প্রতি আঁকা চিত্রকর্মগুলো মূলত প্রকৃতি, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ, বনায়ন, বন উজাড়, ন্যাড়া পাহাড় তথা পার্বত্য জেলার পাহাড়িয়া পরিবেশ, জুমচাষ এর ফলে মাটিক্ষয়, পানি দূষন বায়ু দূষণসহ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা সহ বিভিন্ন বিষয় ফুটিয়ে তোলেন তাঁর কাজে।
মৌসুমীবায়ু অঞ্চলের জলীয়বাষ্প পূর্ণ এই আমাদের বাংলাদেশ। কৃষি প্রধান এদেশে বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি, বন্যা, নদীর পাড় ভেঙে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হেতু এদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহ বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
এসব সমস্যাগুলো চিত্রে উপজীব্য হিসাবে ফুটিয়ে তোলেন শিল্পী তাঁর চিত্রে। এসব চিত্রগুলো দেখলে মনে হবে গ্রামীণ ও পাহাড়িয়া মানুষের জীবনের আনন্দ বেদনা, নৈরাশ্য অথবা দুঃখের অনুভূতিগুলোই যেন বিমূর্ত হয়ে উঠেছে।
উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বন্যার হেতু জলবন্দি মানুষ বাড়ির ঘরের ভেতর আটকা পড়েছে। এই দুর্যোগ এর ঘূর্ণি শিল্পী কে পরিবেশের উপর কাজ করতে প্রেরণা জুগিয়েছে।
এসব দুর্দশার মধ্যে সেই যে প্রত্যক্ষ করেছিলেন জল ঘূর্ণি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবেশের ভারসাম্য ইত্যাদি তার সৃষ্টি সত্তায় লগ্ন হয়েছিল। এখানে আমাদের দেশের মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁর স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকে।
বিশেষ করে আমাদের পরিবেশের উপর বিভিন্ন ফ্যাক্টরি কৃত্রিম প্লান্ট এর দূষিত বর্জ্য এবং ভয়াল ধোয়া যা এক দানবের উপসি’তি যেন তিনি অনুভব করেন। বিশ্বের আবহাওয়া পরিবর্তন, পরিবেশের দূষণ এবং বন উজাড়, এসব সিরিজ চিত্রে শিল্পী দেশ সমাজ এবং তাঁর চোখে দেখা নানা বিষয় ফুটে তোলেন অসাধারণ দক্ষতার মাধ্যমে।
“ চিটাগাং হিলট্রেক ” নামক শিল্পীর আঁকা চিত্রে রয়েছে পানির উপর ভাসছে কিছু নৌকা। এখানে পানি রূপ কে কিছু কালো রঙ্গের দেখানো হয়েছে। পরিবেশ দূষণ, জুমচাষ এর ফলে মাটি ক্ষয় এবং পাহাড়ের বন উজাড়, এছাড়াও কিছু কিছু পাহাড় আধা বিমূর্ত রূপে বিভিন্ন রঙ্গের প্রলেপ দেখা যায়। কেন না পাহাড়গুলো ন্যাড়া মানুষ বৃক্ষরোপণ তথা বনায়ন না করে বনের গাছ কাটার প্রতিযোগিতার ফলে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে এবং ভারসাম্য হারাচ্ছে।
এখানে পাহাড় ও নৌকা কিংবা মাটির ফর্ম কে বিন্যাস করার মধ্য থেকে মূর্ত থেকে বিমূর্তে পৌঁছবার এক অভিনবত্ব শিল্পী প্রকাশ করেন। মনে হবে শিল্পী আধুনিক বটে তবে স্বদেশের শেকঁড়ে মাটির উপর দাঁড়িয়ে ই তাঁর এই আধুনিক রূপানুসন্ধান। জলমগ্ন নৌকা এবং ন্যাড়া পাহাড় গুলো যেন স্বাদেশিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এখানে ভরা বর্ষা আসবে পুনরায় মানুষ বনায়ন করবে নৌকা পুনরায় পানিতে ভাসবে।
শিল্পীর আঁকা এবারের কাজগুলো বিভিন্ন আকারের বোর্ডের উপর পটভূমিতে আঁকা। বৈপরিত্যের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল এবং গাঢ় রঙ এবং টেক্সচার এঁকেছেন। এখানে রঙের ও ফর্মের কম্পোজিশনই শিল্পীর হাতিয়ার। চিত্রগুলোর ভারি কম্পোজিশনই শিল্পীর হাতিয়ার। চিত্রগুলো ভারি দৃষ্টিনন্দন হয়েছে শিল্পীর দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় ও টেকনিক প্রয়োগের মুন্সিয়ানায়। কোথাও কোথাও ব্যবহার করেছেন কোলাজ বা কাগজ কেটে বসিয়েছেন নিপুণ ভাবে।
উল্লেখ্য এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে একটা দলীয় প্রদর্শনীতে অংশ নিতে দেশে আসছেন প্রবাসি শিল্পী মনসুর কাযী।
এছাড়া আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে বাংলাদেশে তাঁর তৃতীয় একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।