মাতৃত্বের মায়া

অবশেষে রুমার ঠাঁই হলো শিশু আরাফাতের সঙ্গে

সিফায়াত উল্লাহ
Sifat.News.Arafat.Ruma

ফেলে যাওয়া অসুস’ শিশু আরাফাতকে দেড় বছর ধরে নিজের সবটুকু দিয়ে লালন-পালন করেছেন কক্সবাজারের তরুণী রুমা আকতার (২৩)। অবিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও মাতৃত্বের মায়া যেন আকড়ে ধরেছিল রুমাকে। তাই তিনি আরাফাতকে ছেড়ে বেঁচে থাকতে অস্বীকৃতি জানান। এতে বেকায়দায় পড়ে সমাজসেবা অধিদপ্তর।
পরে কর্তৃপক্ষ আরাফাতকে নগরীর রৌফাবাদের সরকারি শিশু আশ্রয়কেন্দ্র ছোটমণি নিবাসে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সঙ্গে রুমাকে ওই আশ্রয়কেন্দ্রের বেসরকারি আয়া হিসেবে চাকরির ব্যবস’া করে সমাজসেবা অধিদপ্তর।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে তাদের দুজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্রয়কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। এসময় হাসপাতালের পরিচালক, ওয়ার্ডের চিকিৎসক, রোগী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপসি’ত ছিলেন।
এ ব্যাপারে রোগী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সমাজসেবা অফিসার অভিজিৎ সাহা সুপ্রভাতকে বলেন, আইন অনুযায়ী অভিভাবকহীন শিশুদের সরকারি শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠাতে হয়। তাই আমরা আরাফাতকে সেখানে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন’ রুমা তার কাছ থেকে আরাফাতকে নিয়ে গেলে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। তখন আমরা মানবিক দিক চিন্তা করে বিকল্প ব্যবস’া গ্রহণ করি।
তিনি বলেন, রুমার মা-বাবা কেউ নেই। সে আরাফাতের কাছাকাছি থাকতে চায় বলে আমাদের জানায়। এরপর আমরা ওই আশ্রয়কেন্দ্রে তাকে বেসরকারি আয়া হিসেবে যোগদান করতে বললে সে রাজি হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার দিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের গাড়িতে করে তাদের দুজনকে আশ্রয়কেন্দ্রের উপ-তত্ত্বাবধায়ক নুরুন নাহার জান্নাতীর বরাবরে হস্তান্তর করা হয়।
জানা যায়, ২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সজল দাশ নামে এক ব্যক্তি শিশু আরাফাতকে হাসপাতালে ভর্তি করান। কিন’ সেদিন রাতেই তাকে ফেলে রেখে চলে যায় লোকটি। আরাফাতের জন্মগত হার্নিয়া, হাইড্রোক্যাফালাস (মাথা বড় হয়ে যাওয়া) ও মেরুদণ্ডে সমস্যা ছিল।
অন্যদিকে বাচ্চাটির পাশের বেডেই চিকিৎসাধীন বোনের মেয়েকে পরিচর্যা করতে হাসপাতালে এসেছিলেন রুমা আকতার। এসময় তিনি বাচ্চাটির দেখভালের দায়িত্ব নেন। নাম রাখেন ইয়াসিন আরাফাত। এরপর থেকে রুমা মাতৃত্বের পরম মমতায় লালন-পালন করতে থাকে আরাফাতকে। অভাগা সেই শিশুর মায়ায় পড়ে প্রায় দেড় বছর হাসপাতালে রয়ে যান তিনি। মাতৃত্বের স্নেহে ধীরে ধীরে সুস’ করে তুলেন আরাফাতকে। ডালপালা মেলতে থাকতে আরাফাতকে নিয়ে রুমার স্বপ্ন। কয়েক দফা অপারেশন শেষে প্রায় সুস’ হয়ে ওঠে আরাফাত। এরপর তাকে নিজের সন্তান হিসেবে নেয়ার দাবি করেন রুমা আকতার।
কিন’ আইনের কাছে সবকিছু যেন হারিয়ে যেতে বসেছিল রুমার। অবিবাহিত হওয়ায় আরাফাতকে তার কাছে দিতে অস্বীকৃতি জানায় কর্তৃপক্ষ। কিন’ যার জন্য নিজের আপনসত্তাকে ত্যাগ করে দিনের পর দিন হাসপাতালে পড়েছিল, তাকে কী আর নিজের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যেতে দেয়া যায়! তাই রুমাও জানিয়ে দেন, আরাফাতকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হলে তিনি আত্মহত্যা করবেন।
এ ব্যাপারে রুমা আকতার সুপ্রভাতকে বলেন, ‘ফেলে যাওয়ার পর বাচ্চাটি আমাদের পাশের বেডেই ছিল। কিন’ কেউ তাকে পরিচর্যা করতো না। শুধু সময় অনুযায়ী এসে তাকে খাওয়ানো হতো। এটা দেখে আমার মায়া হয়। তার দায়িত্ব নিতে চাইলে কর্তৃপক্ষ আমাকে অনুমতি দেয়।
তিনি বলেন, বোনের মেয়ে সুস’ হয়ে বাড়ি চলে যায়। কিন’ু শিশুটির জন্য আমি হাসপাতালে থেকে যাই। নিজের সবটুকু দিয়ে আমি তাকে সুস’ করে তুলেছি। কিন’ অবিবাহিত হওয়ায় তারা আমাকে বাচ্চা দিতে চায়নি। পরে তারা আমাকে আরাফাতের সঙ্গে যাওয়ার কথা বললে আমি রাজি হই।
রুমা বলেন, আরাফাতকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবে, সেটা আমি ভাবতে পারি না। তাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না। সেজন্য আমি তার সঙ্গে শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাচ্ছি।
অন্যদিকে দেড় বছরের মধ্যে রুমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। কিন’ আরাফাতের দায়িত্ব নেয়ার জন্য রুমা সেই বিয়েতে রাজি হননি। রুমার পরিবারও চায়, আরাফাতকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে। কিন’ আইন অনুযায়ী সেটি দিতে অস্বীকৃতি জানায় কর্তৃপক্ষ।