সমসাময়িক

শেখ হাসিনার মুকুটে আরেকটি পালক

কামরুল হাসান বাদল

বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সিঙ্গাপুরভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘দ্য স্ট্যাটিস্টিকস ইন্টারন্যাশনাল’এর জরিপে শেখ হাসিনা বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক এক জরিপে যোগ্য নেতৃত্ব, রাষ্ট্রনায়কোচিত দক্ষতা মানবতা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বিষয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে সর্বোচ্চ উপসি’তির জন্য শেখ হাসিনাকে বিশ্বে দ্বিতীয় সেরা প্রধানমন্ত্রীর স্বীকৃতি দেওয়া হয়। জরিপটিতে রোহিঙ্গা বিষয়ে ভূমিকা, তাদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়। শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের সসম্মানে প্রত্যাবর্তনে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সফল কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। জরিপে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গা ইস্যুটি বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে শেখ হাসিনা যেভাবে সফল হয়েছেন, খুব কম রাষ্ট্রনায়কই তা পারেন। এর আগে এই শতাব্দির সবচেয়ে দুদর্শাগ্রস্ত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের এই দেশে আশ্রয় দিয়ে শেখ হাসিনা ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধিতে ভূষিত হন। আলোচনায় যাওয়ার আগে এ পর্যন্ত তাঁর স্বীকৃতি ও সম্মানসমূহের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি তুলে ধরতে চাই।
১. চ্যাম্পিয়ন অব দি আর্থ-২০১৫, ২. আইসিটি টেকসই উন্নয়ন-২০১৫, ৩. কালচারাল ডাইভারসিটি-২০১২, ৪. ডক্টর অব লিটারেচার-২০১২, ৫. ফেলোশিপ-২০১১, ৬. সাউথ-সাউথ-২০১১, ৭. ইকোনমিক কমিশন ফর আফ্রিকা-২০১১, ৮. এমডিজি পদক-২০১১, ৯. ইন্দিরা গান্ধী-২০০৯, ১০. মেটাল অব মেরিট-২০০৫, ১১. পার্ল এম বাক-২০০০, ১২. অনারারি ডক্টর অফ হিউম্যান লেটাস-২০০০, ১৩. পার্সন অব দ্য ইয়ার-২০০০, ১৪. অনারারি ডক্টর অব ল-১৯৯৯, ১৫. ডক্টর অব ল-১৯৯৯, ১৬. সেরেস মডেল-১৯৯৯, ১৭. দেশিকোত্তম-১৯৯১, ১৮. মেডেল অফ ডিস্টিংশন, ১৯. এম কে গান্ধী, ২০. মাদার তেরেসা, ২১. ফেলিক্স হোফে-বইনি শান্তি-১৯৯৮, ২২. পল হ্যারিস ফেলো-১৯৯৭, ২৩. নেতাজী সুভাষ চন্দ্র-১৯৯৭, ২৪. লিবারেল আর্টসে অনারারি পিএইচডি-১৯৯৭, ২৫. ডক্টর অফ ল-১৯৯৭ (জুলাই), ২৬. ডক্টর অফ ল-১৯৯৭ (ফেব্রুয়ারি), ২৭. দোফি বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণপদক, ২৮. পিস ট্রি- অন্যতম।
এই উপাধি, সম্মান ও স্বীকৃতি সবগুলোই বিদেশ থেকে অর্জিত। শেখ হাসিনার কর্মদক্ষতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতির ফল এইসব উপাধি ও সম্মাননা। যদিও কোনো জননেতা কোনো সম্মাননা বা স্বীকৃতির আশায় রাজনীতি করেন না তবুও একজন নেতাকে অনুপ্রাণিত করতে, আরও বেশি জনবান্ধব হতে এ ধরনের স্বীকৃতির মূল্য আছে নিসন্দেহে। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে কিংবা একজন দূরদর্শিতাসম্পন্ন রাজনীতিক হিসেবে শেখ হাসিনার সঠিক মূল্যায়ন যে দেশে হয়নি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগবিরোধী শিবিরের অপপ্রচার এবং দেশের একশ্রেণির সুশীলদের প্রবল সমালোচনা ও বিরোধিতার কারণে শেখ হাসিনার প্রকৃত মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। বহির্বিশ্ব যখন তাঁর কর্ম ও সাফল্যের মূল্যায়ন করছে এবং তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি দিচ্ছে তখন দেশের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তি, মৌলবাদী গোষ্ঠী, এক শ্রেণির সুশীল, বাইরে যারা অসাম্প্রদায়িক অথচ ভেতরে ভেতরে চরম ফ্যাসিবাদি এবং কিছু বাম রাজনৈতিক দলের কাছে তাঁর সমস্ত কাজই বিতর্কিত, নিন্দনীয়। এর কারণ আছে বৈকি। তা হচ্ছে, বাঙালি প্রধানত প্রশংসাকৃপণ একটি জাতি। বাংলাভাষায় সবচেয়ে কম উচ্চারিত শব্দটি হলো ধন্যবাদ। ভদ্রতা করে ধন্যবাদ জানাতে হলেও আমরা প্রাণ খুলে ধন্যবাদ জানাতে পারি না। সে ক্ষেত্রে আমরা বলে থাকি ‘ধন্যবাদ জানিয়ে খাটো করতে চাই না’। ধন্যবাদ জানালে ধন্যবাদপ্রাপ্য ব্যক্তি কেন খাটো হবেন তা আমার বোধগম্য হয়নি আজও।
ফলে এ দেশে ভালো কাজের খুব একটি স্বীকৃতি নেই। ভালো কাজের প্রচারও নেই। কারো কোনো বদনাম যত সহসা ছড়িয়ে পড়ে তার তুলনায় সুনাম বা প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে না। এ দেশের মানুষ কারো কোনো দুর্বলতা পেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এদের স্বভাব মাছির মতো। শুধু ক্ষত খুঁজে বেড়ায়।
একটি প্রবাদ আছে, ঘরকা মোরগ ডাল বরাবর। বাঙালির ক্ষেত্রে একথা যথার্থভাবে খাটে। এরা বিদেশিদের তোয়াজ করে নিজ দেশের মনীষীদের উপেক্ষা করে। এরা নিজ নেতাদের হত্যা করে বিদেশিদের পায়ে তেল মর্দন করে। এরা কথায় কথায় বিদেশি রাষ্ট্রনায়কদের উদাহরণ দেয় আর নিজ দেশের নেতাদের অসম্মান করে মাটিতে মিশিয়ে দেয়। এরা মাহাথির মোহাম্মদকে প্রাতঃস্মরণীয় মনে করে অথচ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, জাতির জনককে অশ্রদ্ধা ও অসম্মান করে। এরা বিদেশি কুকুরকেও সম্মান সমীহ করে। নিজ দেশের সম্পদকে অপচয় করে। এরা দেশের বাইরে গেলে সুবোধ বালকের মতো আইন মান্য করে। দেশে এলে আইন অমান্য করার প্রতিযোগিতা করে। এরা অন্য দেশের রাষ্ট্রদূতকে পরিত্রাতা মনে করে। নিজ দেশের নেতাদের অবমূল্যায়ন করে। ফলে এদের কাছে শেখ হাসিনা কিংবা তাঁর অর্জনগুলো কোনো অর্থ বহন করে না। বর্তমানে শেখ হাসিনা আছেন বলেই প্রকৃত বাংলাদেশ আছে। মানুষ যেমন পৃথিবীতে বাস করে বাতাসের অস্তিত্ব অনুধাবন করতে পারে না ঠিক তেমনি বাংলাদেশের অনেকেই অনুধাবনই করতে পারছেন না, শেখ হাসিনা আছে বলেই বাংলাদেশের অস্তিত্ব আছে।
আওয়ামী লীগের অনেক দোষ-ত্রুটি আছে। দেশ পরিচালনায় অনেক দুর্বলতা আছে। যুবলীগ, ছাত্রলীগের অনেক খারাপ কাজ আছে। তারপরও বলতে হবে আজ বাংলাদেশ যতটুকু একাত্তরের বাংলাদেশ আছে, আজ বাংলাদেশ যতটুকু অসাম্প্রদায়িক আছে। আজ বাংলাদেশ যতটুকু বাসযোগ্য আছে তা এই দলের কারণেই আছে, আর এই দলটির ঐক্যের প্রতীক হয়ে আছেন শেখ হাসিনা। তাঁর অবর্তমানে এই বৃহৎ রাজনৈতিক দলটির ঐক্য নিয়ে, শক্তি নিয়ে অনেক সন্দেহ আছে, ফলে এই কথাটি আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি যে, বাংলাদেশকে বাংলাদেশ করে রাখতে আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তির কোনো বিকল্প নেই। আর আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ, সংঘবদ্ধ করে রাখতে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। ফলে বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখতে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই।
মাত্র কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকার অভিযাত্রায় যুক্ত হয়েছে। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে ২০২১ সালের মূল্যায়ন সভায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হবে না এবং তার ফলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পাবে। এই অর্জন শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ বিরোধীদের কাছে সঠিকভাবে মূল্যায়িত হবে না।
কিন’ বিশ্ববাসীর সাথে এদেশের প্রকৃত দেশপ্রেমীরা জানে একদিন যাকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে ব্যঙ্গ করা হয়েছিল, সে দেশটি প্রকৃতপক্ষে গত দশ বছরে কত উন্নতি সাধন করেছে। এক সময় বঙ্গবন্ধুকে খাটো করার অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর সাথে একজন সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানকে তুলনা করা হয়েছে। কিন’ ইতিহাস বলে, বঙ্গবন্ধু জন্ম দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আর মুক্তিযুদ্ধ জন্ম দিয়েছিল এগারজন সেক্টর কমান্ডারকে। কখনো মাওলানা ভাসানীকে বঙ্গবন্ধুর ওপরে স’ান দেওয়ায় চেষ্টা করা হয়েছে। কিন’ ইতিহাস যার যার স’ান নির্ধারণ করে দিয়েছে। বর্তমানে শেখ হাসিনাকে খাটো করার জন্য কাউকে ‘আপোষহীন নেত্রী’ বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’র অনুকরণে গণতন্ত্র হত্যাকারীদের নেতাকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ নামে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এক সময় একটি ব্যাংকের এমডির সঙ্গেও শেখ হাসিনার তুলনা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন’ সময় সব নির্ধারণ করে দিয়েছে। সময়ের স্রোতে সব মিথ্যা এবং বানোয়াট অভিধাগুলো ভেসে গেছে আর তার পাশাপাশি শেখ হাসিনা তাঁর স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে উঠছেন দেশে এবং সে সঙ্গে বহির্বিশ্বেও।
আজও শেখ হাসিনার প্রকৃত মূল্যায়ন হয়নি। হয়ত তাঁর জীবিতকালে তেমন হবেও না। কারণ বাঙালি দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না। তবে একদিন অবশ্যই এই দেশ, এদেশের ইতিহাস, বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস, গণতন্ত্র ও মানবতাবাদের ইতিহাস শেখ হাসিনাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করবে এবং তাঁর যোগ্য আসন বিশ্বসভায় নির্ধারণ করে দেবে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক