সমসাময়িক

সোনালি আঁশ পাটের সুদিন : টেকসই ব্যবস্থাপনা চাই

মোতাহার হোসেন

রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের পাশে পাট সম্পর্কে নানা রকম ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন দেখে স্কুল শিক্ষার্থী ১২ বছরের রবিন তার মাকে প্রশ্ন করছে, আম্মু- পাট নিয়ে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা লেখা পড়লাম- এসব কেন? উত্তরে মা বললেন,পাট আমাদের অন্যতম অর্থকরী ফসল। এক সময় এই পাট রপ্তানি করে আমাদের বহু বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতো। কিন্তু বিগত দিনে এ নিয়ে যথাযথ উদ্যোগ না থাকায় পাটের সেই সুদিন অনেকটাই বিলুপ্তপ্রায়। কিন্তু বর্তমান সরকার আবার পাটের সেই সুদিন ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। এ জন্যই রাজধানীর রাস্তায় ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন দিয়ে মানুষকে পাটের অতীত সম্পর্কে মনে করিয়ে দিচ্ছে। স্কুল ছাত্রের মনে উদয় হওয়া এ প্রশ্নের মধ্যদিয়ে মূলত পাট সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির একটি প্রয়াস বলে মনে করেন রবিন এর মা।
ইতোপূর্বে গণমাধ্যেমে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় বস্ত্র ও পাটপ্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেন, পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি পাট পণ্যের বহুমুখী ব্যবহার, চাল, আটা, চিনিসহ ১৮টি পণ্যের মোড়কে পাটের ব্যাগের বাধ্যতামূলক ব্যবহার, পাট চাষে উৎসাহ দিতে চাষিদের প্রণোদনা, সরকারি উদ্যোগে পাট ক্রয়, পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একক প্রচেষ্টা, আন্তরিকতায় পাট খাতের সুদিন ফিরিয়ে আনতে সব রকম সহায়তা দেয়া হচ্ছে। পাট খাতের লোকসান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত এরাশদ, জিয়া, খালেদা জিয়ার সরকার তাদের ভ্রান্তনীতি, দুর্নীতি, অনিয়মের কারণে পাটে সোনালি দিন ধ্বংস করা হয়। তিনি বলেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজী জুট মিল বন্ধ করা ছিল সবচেয়ে আত্মঘাতী ও ভুল সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, দেশের পাট খাতের রক্তক্ষরণ শুরু হয় সেখান থেকেই। এ অবস’ার উত্তরণে বর্তমান সরকার পাট খাতের সোনালী দিন ফিরিয়ে আনতে সব রকম প্রস্তুতি এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলেও জানান তিনি।
এক সময়ে কৃষি ও অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি দেশের পাট শিল্পখাত। তবে সেই দিন কাটিয়ে আবারও সোনালি আঁশের সেই সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার। এরই মধ্যে পাটের উৎপাদনে এসেছে গতি। পাটজাতীয় পণ্যের উৎপাদনও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। পাটকলগুলোতেও সরকারের রয়েছে বিশেষ নজর। আর আগামী ৬ মার্চ জাতীয় পাট দিবসকে ঘিরেও চলছে বহুমুখী প্রস’তি। ২০১০ সালে সারাদেশে পাটের চাষ হয়েছিল সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর জমিতে। ওই সময় পাটের উৎপাদন ছিল গড়ে ৭০ থেকে ৮০ লাখ বেল। এর পরের বছরগুলোর চিত্রও ছিল একই। তবে ২০১৭ সালে মোট ৮ দশমিক ১৭ লাখ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। এ বছর ৯২ লাখ বেলেরও বেশি পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে তা হবে পাটের আবাদি জমি ও উৎপাদনের নতুন রেকর্ড।
দেশে পাটের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ খাতে গবেষণা বাড়ানো, নতুন পাটনীতি প্রণয়ন, জুটমিল করপোরেশনকে সংস্কারের আওতায় আনা, পাট পণ্যের ব্যবহার উদ্বুদ্ধ করতে পলিথিনের ওপর ইকো ট্যাক্স আরোপ ইত্যাদি উদ্যোগ নিয়ে সরকার কাজ করছে। পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি এসব পণ্য বিদেশে রফতানির দিকেও মনোযোগ রয়েছে সরকারের। এর মাধ্যমে এ খাতের বিশাল বাজার তৈরি করে কর্মসংস’ান বাড়াতে চায় সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে রফতানি বাজার সমপ্রসারণ, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, পরিবেশ সুরক্ষা ও কর্মসংস’ান তৈরির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে পাট। তাই পাট নিয়ে গবেষণা করে এর বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। পাটের বহুমুখী ব্যবহারের অংশ হিসেবে ব্যাগ ও বস্তার বাইরে এখন পাট দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে জুতা, স্যান্ডেল, রুমাল, কাপড়, বিছানার চাদর, টুপিসহ বিভিন্ন ধরনের সৌখিন সামগ্রী।
এর বাইরেও বিভিন্ন আসবাব, তৈজসপত্র, পোশাক, শীতবস্ত্র, সোফা, বিভিন্ন ধরনের কাগজ, হার্ডবোর্ড তৈরিতেও পাট ব্যবহৃত হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব বলে বিশ্বব্যাপী এগুলোর চাহিদা বাড়ছে। বিভিন্ন পণ্যের মোড়ক বা প্যাকেজিং করতে এখন পাটের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। দেশের বস্ত্র কারখানাগুলোয় এখন তুলার সঙ্গে পাট মিশিয়ে সুতা তৈরি করা হচ্ছে। সেগুলো দিয়ে তৈরি হচ্ছে কাপড়। এসব পোশাক বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন বাংলাদেশ থেকে পাটের বস্তা কেনার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর কাঁচা পাট রফতানিতে প্রবৃদ্ধি এখন ৪৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
গত কয়েক বছরে পাটের ব্যবহার বাড়তে থাকায় তাই আবার পাট নিয়ে ইতিবাচক দিকে হাঁটছে সরকার। এ কারণেই গত বছর থেকে সরকার পালন করতে শুরু করেছে জাতীয় পাট দিবস। এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো দিবসটি পালিত হবে আগামী ৬ মার্চ। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য রাখা হয়েছে ‘সোনালি আঁশের সোনার দেশ, পাট পণ্যের বাংলাদেশ’।
দেশে পাটের ব্যবহার ও রফতানি বাড়াতে জাতীয় পাট দিবসে বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। কেবল রাজধানী নয়, জেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যন্ত পালিত হবে এসব কর্মসূচি। পালিত হবে তিন দিনব্যাপী পাটজাত পণ্যের মেলা। দেশের বাইরেও কর্মসূচি রাখা হয়েছে। পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেন, ‘দেশে পাটের বাজার বাড়াতে ধান, গম, চাল, ভুট্টা, চিনি, মরিচ, হলুদ, আদা, পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়া, আটা, ময়দা, খুদ, কুড়াসহ ১৭টি পণ্যের মোড়কে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাট খাতের উন্নয়নে সরকার পাট আইন- ২০১৭ প্রণয়ন করেছে। বিশ্ববাজারে পাটকে তুলে ধরতে ২৩৫ ধরনের পাটজাত পণ্য উদ্ভাবন করেছে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি)। ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করায় অভ্যন্তরীণ বাজারে একশ কোটি পাটের বস্তার চাহিদা তৈরি হয়েছে। পাট চাষিদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি ‘বাংলার পাট বিশ্বমাত’ শীর্ষক শ্লোগান নিয়ে পাট শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পণ্যের মোড়কে পাটের ব্যাগ ব্যবহারের আইন শতভাগ কার্যকর করা প্রয়োজন।’
পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৯ দশমিক ৬২ লাখ বেল পাট ও পাটজাত দ্রব্য রফতানি করে সাত হাজার ২৯৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা আয় করেছে বাংলাদেশ। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই পরিমাণ ৮৭৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বেশি। এ ছাড়া, বছরে ১২ লাখ বেল কাঁচা পাটও রফতানি হচ্ছে। পাটজাত পণ্যকে কৃষিপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের তালিকাভুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী পাট শিল্পের ব্লক ঋণ ফেরত দেওয়ার সময় ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়েছে। ইডিএফ ফান্ডের মতো পাট শিল্পের জন্য ২ ভাগ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন তহবিল তৈরির বিষয়েও বিজেএমসি’র পাটকলগুলো ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯৫ হাজার মেট্রিক টন পাটপণ্য উৎপাদন করেছে। এই অর্থবছরে বিজেএমসি’র মোট আয় একহাজার ১৫৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, ব্যয় এক হাজার ৮৫০ কোটি ৯ লাখ টাকা। গত অর্থবছরেও বিজেএমসি’র পাটকলের লোকসান ছিল ৬৯৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। তবে এ বছর তা অনেক কমে গেছে।
বিজেএমসি’র লোকসান প্রসঙ্গে ইতোপূর্বে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেছিলেন, ‘এ বছর বিজেএমসি’র লোকসান ১৮০ কোটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে বিজেএমসি রাষ্ট্রের ‘ডিজ্যাবল’ সন্তান। রাষ্ট্র বিজেএমসির প্রতি বিশেষ নজর রাখছে। আমাদের প্রত্যাশা পাট খাত পুনরায় দেশের মানুষ এবং অর্থনীতিকে নতুন করে আশার আলো দেখাবে। আর এ জন্য সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মহলকেও যথাযথ ভূমিকা নিতে হবে। এসব করা গেলেই পাট নিয়ে আমাদের অতীত হারানো গৌরব ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট