দৃষ্টিপাত

গৌরবোজ্জ্বল পথচলার ২৫ বছর

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ফাইন্যান্স বিভাগ

সফিক চৌধুরী

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের আওতাধীন ফাইন্যান্স বিভাগের সংশ্লিষ্ট সকলের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ১৫-১৬ মার্চ ২০১৮ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শিক্ষক, প্রাক্তন এলামনাই আর বর্তমান শিক্ষার্থীদের জমজমাট অংশগ্রহণে দু’দিনব্যাপী মিলনমেলা ও বিভাগের ২৫ বছর পূর্তি উদযাপন অনুষ্ঠান। ১৫ মার্চ সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে প্রথমবারের মতো “ঋরহধহপব ভড়ৎ ঝঁংঃধরহধনষব এৎড়ঃিয ধহফ উবাবষড়ঢ়সবহঃ শিরোনামে একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স। যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপসি’ত থাকবেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী এবং সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপসি’ত থাকবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মাননীয় গভর্নর, অর্থ সচিব, চবি’র ভিসি ও প্রো-ভিসি, বাণিজ্য অনুষদের ডীন সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীগণ। এতে সভাপতিত্ব করবেন ফাইন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান মহোদয়। পরদিন ১৬ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে সকলের অংশগ্রহণে আড্ডা ও প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানমালা।
ফিরে দেখা চবি ফাইন্যান্স বিভাগ
বহু অনুষদ ভিত্তিক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় শুরু হতে হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস’াপনা বিভাগ নিয়ে বাণিজ্য অনুষদ থাকা সত্ত্বেও নব্বই দশকের শুরুতে ক্রমবর্ধমান ব্যবসা বাণিজ্য ও বিশ্বায়নের যুগে আধুনিক ও যুগোপযোগী বাণিজ্যমনস্ক শিক্ষার্থী গড়ে তোলার প্রয়াসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাণিজ্য অনুষদে ফাইন্যান্স ও মার্কেটিং বিভাগ চালু করে ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদে রূপান্তরের মাধ্যমে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। যা পরবর্তীতে চবি’র তৎকালীন উপাচার্য সহ সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদনে ১৯৯২ সালের ২৮ অক্টোবর পূর্ণতা লাভ করে এবং আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে চবি ফাইন্যান্স বিভাগ।
২৮ অক্টোবর ১৯৯২ ফাইন্যান্স বিভাগ তার অনুমোদন পেলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ১ নভেম্বর হিসাববিজ্ঞান বিভাগ হতে ফাইন্যান্স বিভাগে সংযুক্ত প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি প্রথিতযশা অধ্যাপক ড. মো. জহিরুল হকের সুযোগ্য নেতৃত্বে অন্যান্য আরও সুযোগ্য অধ্যাপক ড. কাজী আহমদ নবী, মো. হারুন-উর-রশীদ, ড. আ.ন.ম আব্দুল মোক্তাদির এবং সহকারী অধ্যাপক বেগম ইসমত আরা হকের সমন্বয়ে ফাইন্যান্স বিভাগ তার যাত্রা শুরু করে। যাত্রার শুরু হতে এ পর্যন্ত ১১ জন সুযোগ্য শিক্ষক বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমান সভাপতি হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালন করছেন বিভাগের প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. শামীম উদ্দিন খান। বিভাগের একমাত্র নারী সভাপতি হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন সকলেরই প্রিয় মুখ অধ্যাপক ড. বেগম ইসমত আরা হক। শুরুতে অল্প কয়েকজন শিক্ষক নিয়ে যাত্রা শুরু হওয়া ফাইন্যান্স বিভাগে বর্তমানে শিক্ষক প্রায় ২৩ জন (নারী শিক্ষক প্রায় ২০ শতাংশ), শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৮৮৫ জন এবং নন-একাডেমিক কর্মী সংখ্যা প্রায় ৭ জন। ফাইন্যান্স বিভাগে বর্তমানে বিবিএ, এমবিএ, পিএইচডি ও এমফিল প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। যাত্রা শুরুর পর হতে এখন পর্যন্ত বিভাগের পাস করে বের হওয়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ফাইন্যান্সের গৌরব ও অহংকারের প্রতীক হয়ে কর্মজীবনে নিজেদের যোগ্যতার সাথে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। এর মাঝে না ফেরার দেশে চলে গেছেন ফাইন্যান্স বিভাগের দুইজন সুযোগ্য ও প্রিয় শিক্ষক প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. জহিরুল হক ও অধ্যাপক ড. মো. লোকমান সহ বিভিন্ন ব্যাচের প্রায় ১৪ জন শিক্ষার্থী।
যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্যই শুধু পঠন-পাঠন নয়। একটি পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান অর্জন, সৃষ্টি ও তা বিতরণের পাশাপাশি গবেষণার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের এ মৌল উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে চলেছে ফাইন্যান্স বিভাগ। যথাযথ ও আধুনিক মানের শিক্ষা প্রদানে ফাইন্যান্স বিভাগ কখনোই আপোষ করে না, যার প্রমাণ আমরা পাই শিক্ষার্থীদের বহুমুখী অর্জনে। অসাধারণ ও অনন্য ফলাফলের জন্য এই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যাচের ছয় জন শিক্ষার্থী অর্জন করেছেন মূল্যবান প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক, তিনজন পেয়েছেন সম্মানজনক গুলমেহের স্বর্ণপদক এবং রচনা প্রতিযোগিতায় সেরা অবস’ানের কারণে বিভাগের দুইজন পেয়েছেন চ্যান্সেলর স্বর্ণপদক।
আমাদের সমাজ আজ অনেক ক্ষেত্রেই জরাগ্রস্ত। একটি সুস’, সুন্দর, সজীব ও প্রাণবন্ত সমাজের জন্য যে মানবিক ও সহনশীল শিক্ষা তৈরি করা প্রয়োজন সে রকম মানবিক, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা থেকে আজ আমরা অনেকটাই দূরে সরে গেছি। অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষা আজ শুধু বৈষয়িক শিক্ষায় শিক্ষিত নাগরিক সমাজ তৈরি করছে! সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে আজ আমাদের উৎসাহ কম। কিন’, এখানেও ব্যতিক্রম চবি ফাইন্যান্স বিভাগ। সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াসে বিভাগের সুযোগ্য শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে গঠিত হয়েছে ফাইন্যান্স বিজনেস ও ডিবেটিং এসোসিয়েশন (এফবিডিএ) ও ফাইন্যান্স হিউমেনিটেরিয়ান এইড(এফএইচএ)। এই দুই সংগঠনের অর্জনও কম নয়। এফবিডিএ’র তুখোড় বিতার্কিকদের সফল পদচারণায় মুখরিত দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেরও বিতর্ক অঙ্গন। অপরদিকে এফএইচএ ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর হতেই যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবিক বিপর্যয়ে মানবতার হাত বাড়িয়ে চলেছে নিরন্তর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোকে বলা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার প্রজনন ক্ষেত্র। গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান সৃষ্টি, উদ্ভাবনী চিন্তা চেতনার বিকাশ প্রধানত বিভাগগুলোকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির এই যুগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য আধুনিক বিশ্বের জন্য সময়োপযোগী জ্ঞান ও গবেষণাধর্মী শিক্ষার বাতাবরণ তৈরি করা। কিন’ শিক্ষার এই বাতাবরণ তৈরি করতে হলে দরকার আধুনিক ও অবকাঠামোগত প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা। ফাইন্যান্স বিভাগের সমৃদ্ধ লাইব্রেরিকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান আরও বাড়াতে হবে। নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জনের জন্য সহ-শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও জোরদার করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা ফাইন্যান্স বিভাগ হতে হবে সম্পূর্ণ সেশনজটমুক্ত। একটি বিভাগ যখন জ্ঞান ও গবেষণায় এগিয়ে যায়, তখন মূলত এগিয়ে যায় সেই বিশ্ববিদ্যালয়, একই সাথে দেশ ও সভ্যতা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের এলামনাই পুনর্মিলনী ও ২৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আমাদের প্রত্যাশা দেশের সার্বিক উন্নয়নে এ বিভাগ বিগত দিনের মত ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

লেখক : বিতার্কিক