জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে

উখিয়ায় চলছে পাহাড় কাটা

পরিবেশ বিপর্যয়ের শংকা

নিজস্ব প্রতিনিধি, উখিয়া

উখিয়ার বনভূমিতে প্রায় ৭লক্ষাধিক রোহিঙ্গার আশ্রয় নিশ্চিত হওয়ার পরও পাহাড় কাটা থামেনি। রোহিঙ্গাদের প্রয়োজন ছাড়াও কতিপয় এনজিও সংস’া মানবিক সেবার নাম ভাঙ্গিয়ে তাদের আখের গোছানোর জন্য বনভূমির জায়গায় বসতবাড়ি,অফিস,গুদাম, গাড়ি পার্কিংসহ নানা স’াপনা তৈরী করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন প্রকার অনুমতি ব্যতিরেখে নির্বিচারে পাহাড় কেটে তাদের ব্যক্তিগত গাড়ী চলাচলের জন্য তৈরি করা হচ্ছে রাস্তা। পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ যত্রতত্র পাহাড় কাটার ফলে জীববৈচিত্র্য, বন্যপশু প্রাণি বাস’চ্যুত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বন সম্পদ ধ্বংসের কারণে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়েছে। সরেজমিন উখিয়ার ম্বাশিয়া,মধুরছড়া, ময়নারঘোনা, তাজনিমারখোলা ক্যাম্প ঘুরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সরকারি ও বেসরকারি ভাবে যাবতীয় ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হলেও তাদেরকে জ্বালানি সরবরাহ দেওয়া হয়নি। তাই তাদেরকে বাধ্য হয়ে বনের গাছ কেটে জ্বালানির চাহিদা পুরণ করতে হচ্ছে। পাহাড় কাটার ব্যাপারে রোহিঙ্গারা জানান, এখানে আশ্রয় নেওয়ার মতো রোহিঙ্গা নাই। তারপরও এনজিওরা তাদের প্রয়োজনীয় তাগিদের কথা বলে পাহাড় কাটা অব্যাহত রেখেছে। প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গাদের অভিযোগ পাহাড় কাটার ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের দায় করলেও মূলত এনজিওরাই তাদের ইচ্ছামতো পাহাড় কেটে স’াপনা ও রাস্তা-ঘাট তৈরি করছে বলে জানা যায়। ঘটনাস’লে গিয়ে এনজিও সংস’ার কাউকে পাওয়া যায়নি। সেখানে উপসি’ত মধুরছড়া রোহিঙ্গা মাঝি হামিদ হোসেন জানায়, বেশ কয়েকটি এনজিও সংস’া ইদানিং প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদে বুল ডোজার দিয়ে পাহাড় কেটে পাহাড়ের শ্রেণি পরিবর্তন করছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, উখিয়ার ৮টি ক্যাম্পে আশ্রিত ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বনভূমির শতাধিক পাহাড় কেটে বিরান ভূমিতে পরিণত করেছে। যে কারণে শতশত একর ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। বন্য পশুপ্রাণি বাস’চ্যুত হয়ে মাঝেমধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হামলা করছে। এতে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। নির্বিচারে পাহাড় কাটার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে কঙবাজার দক্ষিণ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আলী কবির জানান, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের জন্য ৫হাজার একর বনভূমি দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই আরো ৫শ একর বনভূমি চাহিদা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য বনভূমির জায়গা দেওয়া হলেও পাহাড় কাটার কোন প্রকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। কিন’ কতিপয় এনজিও সংস’া কারো আদেশ নির্দেশের তোয়াক্কা না করে নির্বিচারে পাহাড় কেটে শ্রেণি পরিবর্তন করায় বনসম্পদ,জীববৈচিত্র্য ও বন্য পশুপ্রাণি বিলুপ্তির পথে। তিনি পাহাড় কাটার ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট অবহিত করা হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান।
কঙাবাজর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাইফুল আশরাফ জানান, মানবিক কারণে সরকারি বনাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হলেও পাহাড় কাটার কোন অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি জানান, পাহাড়ের উপর বসবাস করার মতো পরিবেশ থাকা সত্বেও এনজিও সংস’া গুলো তাদের ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে মানবিক সেবার নামে পাহাড় কেটে বিরান ভূমিতে পরিণত করেছে। তিনি বলেন, এলাকার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বন্য পশুপ্রাণি সংরক্ষণে নির্ধারিত অভয়ারণ্যের এসব পাহাড় কাটার ফলে পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকা থাকায় সরেজমিন তদন্ত করে দেখা হবে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন জানান,মানবিক কারণে সরকার রোহিঙ্গাদের বনভূমিতে আশ্রয় দিয়েছে থাকার জন্য। কিন’ এনজিও সংস’াগুলো কোন প্রকার অনুমতি ছাড়া তাদের সুবিধার্থে পাহাড় কর্তন করে থাকলে সংশ্লিষ্ট এনজিওদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস’া নেওয়া হবে।তবে রোহিঙ্গারা যাতে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারে সেদিকেও সরকারের নজর রয়েছে। কঙবাজার শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম জানান, সরকার মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। তাদের সুবিধার্থে বনভূমির ক্ষতি হলেও কিছু কিছু পাহাড়ের শ্রেণী পরিবর্তন করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, যে সব রোহিঙ্গারা ঝুকিপূর্ণ অবস’ায় রয়েছে তাদেরকেও নিরাপদ জায়গা সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।