সমসাময়িক

মানুষই জয়লাভ করবে

কামরুল হাসান বাদল

ত্রিপুরায় বিজয়ের মধুচন্দ্রিমার রেশ শেষ হতে না হতেই ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার রীতিমতো একটি ধাক্কা খেল মহারাষ্ট্রে। কেন্দ্র ও রাজ্যে শাসক দলের কাছে কৃষকদের এই দাবিগুলো শাঁখের করাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। না মানলেও বিপদ মানলেও বিপদ।
সম্প্রতি ত্রিপুরা রাজ্যের নির্বাচনে সিপিএমের পরাজয় এবং বিজেপির জয়ে ভারতের রাজনীতিতে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছিল। বাম ঘরানার রাজনীতিতে নেমে এসেছিল এক প্রকার হতাশা। তাদের অপ্রত্যাশিত পরাজয়ে যখন নানা ধরনের হিসাব-নিকাশ চলছে, আত্মসমালোচনা এমনকি দোষ চাপানোর মতো ঘটনাও ঘটছে তখন মহারাষ্ট্রের রাজধানী, ভারতের অর্থনীতির কেন্দ্রমূল মুম্বাই অভিমুখে লাখো কৃষকের পদযাত্রা বা লংমার্চ নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে বাম তথা সাধারণ মানুষের মুক্তি নিয়ে রাজনীতি করা লোকদের। নাসিক থেকে ছয়দিন ধরে হাঁটাপথে ১৮০ কিলোমিটার পাড়ি দেওয়া লাল ঝাণ্ডা হাতে লাখো কৃষকের এই অভিযাত্রা যেন আবার জানান দিল মানুষ পরাজিত হয় না।
অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের মৃত্যু নেই। মানুষ জাগবে, প্রয়োজনে অসংখ্যবার জাগবে। কারণ পৃথিবীর ইতিহাস, মানুষের ইতিহাস, সংগ্রামের ইতিহাস, দাবি আদায়ের ইতিহাস।
খাদ্য নেই,পানীয় নেই, প্রখর রোদ ও গরমকে উপেক্ষা করে নাসিক থেকে পদযাত্রা শুরু করে কৃষকরা। কারো পা ফেটে রক্ত ঝরছে, কেউ গুরুতর অসুস’ হয়ে পড়ছে কিন’ তারপরও পদযাত্রা থেমে যায়নি। অনেক সাধারণ মানুষ, পথচারী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, এমনকি ডাব্বাওয়ালা, যারা সারা মুম্বাই শহরে অফিসে অফিসে মানুষের খাবার সরবরাহ করে তারাও খাবার নিয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকদের পাশে। কৃষকদের এই অভূতপূর্ব জাগরণ দেখে অনেকে বিস্মিত। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী টুইট মারফত প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেছেন, মানুষের শক্তি কী বিপুল। এই পদযাত্রা তার প্রমাণ। কংগ্রেস কৃষকদের পাশে রয়েছে। নাসিকে কৃষক সমাবেশে এনসিপি নেতা শারদ পাওয়ার কেন্দ্র ও রাজ্যের কৃষকবিরোধী সরকারকে উৎখাতের ডাক দিয়েছেন। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে বিজেপির শরিক শিবসেনাও পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। মুম্বাইয়ে কৃষকদের সঙ্গে দেখা করে তাদের পাশে থাকার কথা জানিয়ে এসেছেন শিবসেনাপ্রধান উদ্ধভ ঠাকুরের ছেলে আদিত্য ঠাকুর। অন্যদিকে রাজ ঠাকরে কৃষকদের উদ্দেশে বলেছেন, সরকার আপনাদের জন্য কিছুই করতে পারবে না।
সিপিএমের সারা ভারত কিষাণ সভা এই পদযাত্রার আয়োজক। দুই বছর ধরে রাজ্য জুড়ে চলছে এই আন্দোলন। ২০১৬ সালে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ছয় মাসের মধ্যে দাবি মানার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন’ তারা সে প্রতিশ্রুতি রাখেনি। ২০১৭ সালে কৃষকরা ধর্মঘট করে। এরপর রাজ্য সরকার একটি কমিটি গঠন করেছিল। সুরাহা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এই পদযাত্রা বা লং মার্চের আয়োজন করা হয়। মুম্বাই এসে বিধানসভা ঘেরাওয়ের কর্মসূচি থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা করতে হয়নি। সরকার আপাতত মেনে নিয়েছে তাদের দাবি। তবে অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছে শেষ পর্যন্ত দাবি বাস্তবায়িত হবে কি না তা নিয়ে। কৃষকদের দাবির অন্যতম কৃষিঋণ মওকুফ। এর সাথে অন্যান্য দাবিগুলো হচ্ছে, ফসলের ন্যায্য দাম, পানি-বিদ্যুতের বিল মওকুফ, খেতমজুরদের জন্য পেনশন এবং আদিবাসীদের জমি ও জঙ্গলের অধিকার দেওয়া। সংশয়ের কারণটি হচ্ছে প্রথম থেকেই কৃষিঋণ মওকুফ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির প্রবল অনাগ্রহ ও আপত্তি। নতুন করে ত্রিপুরা দখলে নিলেও রাজস’ান ও মধ্য প্রদেশের উপনির্বাচনে বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে জনগণ।
গত বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ডায়মন্ড সিমেন্টের সেলস কনফারেন্সে যোগ দিতে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা গিয়েছিলাম। বাংলাদেশে উৎপাদিত কোনো পণ্য ভারতে বাজারজাত করা খুব কঠিন। ভারতের সেভেন সিস্টারে বাংলাদেশি অনেক পণ্যের চাহিদা, জনপ্রিয়তা এবং ব্যবসায়িক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সে দেশের কিছু স’ানীয় ব্যবসায়ী ও সে দেশের ব্যবসায়ীদের সংগঠনের অদৃশ্য বাধায় ও অসহযোগিতার কারণে খুব বেশি সম্ভব হয় না। ডায়মন্ড সিমেন্টের পরিচালক আলহাজ হাকিম আলির নিকট থেকে আমন্ত্রণ ও ডায়মন্ড সিমেন্ট ত্রিপুরায় বিক্রি হয় জানতে পেরে উৎসাহের সাথে তাঁর সঙ্গেই আগরতলায় গিয়েছিলাম। সে যাত্রায় চট্টগ্রামের একদল সাংবাদিকও ছিলেন। প্রেস ক্লাবের বর্তমান সভাপতি কলিম সরওয়ার ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক কবি ও সাংবাদিক রাশেদ রউফও ছিলেন। এ সময় সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের হয়ে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। তাঁর সাধাসিদে অনাড়ম্বর জীবনযাপন ও পাণ্ডিত্যের কথা আগেই জেনেছিলাম। সেবার তা খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করে মুগ্ধ হয়েছিলাম। পরে ত্রিপুরা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দুয়েকজনের সঙ্গেও মত বিনিময়ের সুযোগ হয়েছিল। সে সময় তাঁরা কোড আনকোড অনেক কথাই বলেছিলেন। বিশেষ করে রাজ্যে বিজেপির উত্থান, রাজ্য সাম্প্রদায়িকরণে বিজেপির কোটি কোটি রুপি বিনিয়োগের অনেক তথ্য সেদিন জেনেছিলাম তাঁদের কাছ থেকে। ডাল মজুদ করে এক ব্যবসায়ীকে হাজার কোটি টাকা অবৈধ আয় করিয়ে দিতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রচেষ্টার সংবাদটিও জেনেছিলাম সেবার।
এক রাতেই ত্রিপুরায় তিনটি ধর্মীয় মিছিল দেখে আঁচ করেছিলাম সিপিএমের ভবিষ্যৎ এই রাজ্যে কী হতে যাচ্ছে। ফলে ত্রিপুরার নির্বাচনে মানিক সরকারের বা তাঁর দলের পরাজয়ে দুঃখ পেলেও বিস্মিত হইনি। কারণ করপোরেট পুঁজি ধর্মকে ব্যবহার করে তার সর্বগ্রাসী থাবা বিস্তারের যে কৌশল ভারতে নিয়েছে সে হিসেবে এটি যেন অবধারিতই ছিল।
ত্রিপুরায় নির্বাচনের অব্যবহিত পর বামপন’ী তাত্ত্বিক নেতা বদরুদ্দীন উমর ‘ত্রিপুরার নির্বাচন ও সিপিএমের দেওলিয়া রাজনীতি’ শীর্ষক একটি কলাম লিখেছেন যুগান্তরে। সেখানে তিনি এক পর্যায়ে লিখেছেন, ‘পর্যালোচনার আগে যে ভুলটি চোখে পড়ার মতো তা হলো, ত্রিপুরায় আদিবাসী এলাকার দিকে ঠিকমতো নজর না দেয়া। সেখানে আরএসএস ও বিজেপির প্রচারকরা যে লেগে পড়ে থেকে নির্বাচন সামনে রেখে তাদের কাজ একটানাভাবে করে এসেছে তার কোনো হিসাব না রাখা।’ বদরুদ্দীন উমর সাহেব জ্ঞানী মানুষ। তিনি একজন তাত্ত্বিক। ফলে মাঠের প্রকৃত অবস’া অনুধাবন করা অনেক সময় তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না। একথা বলছি এ কারণে যে, কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতায় করপোরেট পুঁজির জোয়ারেই সেখানে সব ভেসে গেছে। মানিক সরকার বা তাঁর দলের দুর্বলতা বা অদক্ষতা সেখানে সামান্যই।
ত্রিপুরায় বিজেপির জয়ের পর লেনিনের মূর্তি ভেঙে ফেলার মতো ঘটনায় সারা ভারত জুড়ে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ভারতের বামপন’ী ছাত্র সংগঠনের কর্মীরাও পাল্টাপাল্টি ভাঙচুরের ঘোষণা দিয়েছিল। এরই মধ্যে মহারাষ্ট্রে কৃষকদের লংমার্চ নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি করেছে বামঘরানার রাজনৈতিক মহলে। এই ঘটনা আরেকটি দিক উন্মোচিত করেছে তা হলো, মহারাষ্ট্রের মতো একটি প্রদেশে সিপিএসের কার্যক্রম অব্যাহত ও শক্তিশালী রাখা। ত্রিপুরার নির্বাচনের পর হতাশার স’ানে এই ঘটনাটি অনেক বড় উদ্দীপনা তৈরির কাজ করেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটি ভাববার এখনো সময় আসেনি যে, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে অথবা সবকিছুই নষ্টদের অধিকারে গেছে। বরং এই প্রেরণা তৈরি করেছে যে, মানুষ জাগছে। মানুষ জাগবে এবং শেষ পর্যন্ত মানুষই জয়লাভ করবে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক