চবির আবাসন সংকট

বাড়তি ভাড়ার কটেজে দুর্ভোগে শিক্ষার্থীরা

রায়হান উদ্দিন, চবি
_DSC0008

প্রতিষ্ঠার ৫২ বছর পরও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) কাটছে না আবাসন সংকট। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে গড়ে ওঠা কটেজ (ছাত্রাবাস) গুলোতে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
তাছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, অপরিচ্ছন্ন সেমি পাকা ঘর, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস’ার অভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কটেজে অবস’ানরত শিক্ষার্থীদের। শুধু তাই নয় এসব কটেজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে না থাকায় ফায়দা
লুটছে এর মালিকরা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ২৩ হাজার ৮৩৬ জন। কিন’ ১০টি হল ও একটি হোস্টেল মিলিয়ে মোট ৪,২৯৫টি আসন রয়েছে। সে হিসেবে মাত্র ২০ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন ব্যবস’া রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর ফলে প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার অপরিচ্ছন্ন ও বসবাসের অনুপযোগী কটেজ অথবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২২ মাইল দূরে শহরে ব্যয়বহুল বাড়িভাড়া করে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
কটেজগুলোতে (ছাত্রাবাস) সরেজমিনে দেখা গেছে, নোংরা অস্বাস’্যকর পরিবেশ, বাথরুমের অবস’া নাজুক। রয়েছে পানির স্বল্পতাও। কোথাও পড়ে আছে ময়লার স্তূপ। কটেজের আশপাশে অবস’া আরো করুণ। কক্ষগুলোর ভেতরে নেই পর্যাপ্ত আলো ও জায়গা। থাকতে হচ্ছে গাদাগাদি করে। দেয়ালজুড়ে জন্মেছে আগাছা। দেয়ালের পলেস্তরা খসে দেখা যাচ্ছে ইট-সুরকির গাঁথুনি। যার ফলে ঝুঁকিপূর্ণভাবে থাকছে শিক্ষার্থীরা। কটেজগুলোতে নেই কোন রান্নার ব্যবস’া। খাবার খেতে শিক্ষার্থীদের ছুটে আসতে হয় হলগুলোতে। শুধু তাই নয়, এসব অস্বাস’্যকর পরিবেশে থাকা সত্ত্বেও কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে কটেজ মালিকরা বছর বছর বাড়াচ্ছে ভাড়া। যেসব কটেজে গতবছর ভাড়া ছিল ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। সেসব কটেজে এখন নেয়া হচ্ছে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা।
কটেজে অবস’ান করা অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ সুপ্রভাতকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস’া নিশ্চিত করতে না পারায় ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হচ্ছে এ সব জরাজীর্ণ ছাত্রাবাসগুলোতে। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে টিনের ফুটোয় রুমের ভিতরে পানি পড়ে। প্রায় সময় রুমের ভিতর ঢুকে পড়ে বিষাক্ত সাপ। এছাড়াও কটেজগুলোতে নেই কোনো নিরাপত্তা। যার ফলে প্রায়ই খোয়া যাচ্ছে মূল্যবান জিনিসপত্র।’
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আনিসুর রহমান বলেন, ‘প্রতি বছর ডিপার্টমেন্টের ফাইনাল পরীক্ষাকালীন ক্যাম্পাসের কটেজগুলোতে অবস’ান করি। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন’ গতবছর যে কটেজে ৮০০ টাকা দিয়ে ছিলাম, এখন সে কটেজে ১০০০ টাকা দিয়ে থাকতে হচ্ছে। এ অবস’ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি কটেজগুলোর নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।’
নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক সোহরাওয়ার্দী হলের বাংলা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘হলে অবস’ান করতে হলে জড়াতে হয় রাজনীতিতে। নিজের বৈধ সিট থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক আধিপত্যের কাছে হার মেনে অনেক সময় রাত্রি যাপন করতে হয় বাহিরে। তাই হল ছেড়ে কটেজে উঠেছি। কিন’ তাতেও দুর্ভোগ লাঘব হয়নি। দিন শেষে ক্লান্ত হয়ে থাকতে হয় অস্বাস’্যকর পরিবেশে। আমার মনে হয় না কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ রকম ছাত্রাবাস আছে ?’।
বিষয়টি অস্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বি সুজন বলেন, ‘ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীর অধিকার আন্দোলনের কথা বলে। কাউকে জোর করে রাজনীতি করানো ছাত্রলীগের আদর্শ নয়। বৈধভাবে হলে অবস’ান করা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ছাত্রলীগ সব সময় সর্বাত্মক সহযোগিতা করে আসছে। কেউ যদি ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে সিট দখলের চেষ্টা করে। তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস’া নেয়া হবে’।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদেরও পোহাতে হচ্ছে আবাসন সংকটের অবর্ণনীয় যন্ত্রণা। হলে গাদাগাদি করে এক রুমে ৮-৯ জন করে থাকতে হয় তাদের। আবার অনেকে থাকছেন গণরুমগুলোতে। আর যাদের এই সব গণরুমেও ঠাঁই হয়নি তাদের বাধ্য হয়ে থাকতে হচ্ছে ক্যাম্পাসের আশপাশের মেসগুলোতে। এ সব এলাকাতেও নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস’া।
ক্যাম্পাসের মেসে অবস’ানরত প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিদা চৌধুরী সুপ্রভাতকে বলেন, ‘হলে সিট না পাওয়ায় কিছুদিন গণরুমে ছিলাম। পরে বাধ্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাহ আমানত আবাসিক এলাকায় একটি মেসে উঠি। ক্যাম্পাসে গ্যাসের ব্যবস’া না থাকায় খাবার রান্না করতে হয় সিলিন্ডার ব্যবহার করে। এছাড়া মালিক পক্ষও ভাড়া নিচ্ছে দ্বিগুণ। ফলে মাস শেষে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা।’
বাড়তি ভাড়া নেওয়ার কথা অস্বীকার করে কটেজ (ছাত্রাবাস) মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম সুপ্রভাতকে বলেন, ‘প্রত্যক কটেজে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে স্বাভাবিক ভাড়া নেয়া হচ্ছে। এছাড়া ছাত্রাবাসগুলোতে যেহেতু শিক্ষার্থীরা বসবাস করে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব তাদেরই। আর যেসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কটেজ মালিকদের দায়বদ্ধতা রয়েছে, সেসব বিষয়ে মালিক পক্ষকেও অবহিত করা হচ্ছে।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর মোহাম্মদ আলী আজগর চৌধুরী সুপ্রভাতকে বলেন, ‘যেহেতু কটেজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে নয়, সেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলেও এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নিতে পারে না।’
আবাসিক সংকটের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘সংকট নিরসনে একটি ছাত্র হল ও একটি ছাত্রী হল খুব শিগগিরই খুলে দেওয়া হবে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সংকট অনেকাংশে নিরসন হবে বলে আশা করছি।’