বিএস ২১১

আবিদে শুরু আবিদেই শেষ

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা

নীলাকাশে সাদা মেঘের ভেলায় আর কখনও ভাসা হবে না আবিদ সুলতানের। উড়োজাহাজের ককপিটে বসে আর কখনও খোঁজা হবে না দূর আকাশের সীমানা। তিনি নিজেই যে চলে গেছেন জীবনের সীমানা পেরিয়ে; যেখান থেকে এই ভূবনের আর কিছুই দেখা মেলে না। বিএস ২১১ এমন এক ট্র্যাজেডির নাম, যেটি নীল করে দিয়েছে আবিদের জীবন। ২০১৫ সালে আবিদের হাত ধরে কানাডার
আকাশ থেকে উড়ে এসেছিলো এই উড়োজাহাজ। নেপালের মাটিতে গিয়ে সেই আবিদের হাতেই এর নিঃশেষ।
ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ছিলেন আবিদ। ১৯৮৪ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। ছিলেন বাংলাদেশ এয়ার ফোর্সের ফ্লাইট ল্যাফটেনেন্ট। বিমান বাহিনীর বিগ-২১ উড়োজাহাজ চালানোর অভিজ্ঞতাও ছিলো এই বৈমানিকের।
জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৬ মে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসে যোগ দেন আবিদ সুলতান। এর কিছুদিন পরেই ‘ডে হাভিল্যান্ড বোম্বার্ডিয়ার অ্যারোস্পেস’ এর তৈরি বোম্বার্ডিয়ার ড্যাশ এইট কিউ সিরিজের উড়োজাহাজটি কানাডা থেকে উড়িয়ে আনেন। তারপর থেকে নিয়মিত এই উড়োজাহাজটির দায়িত্বে ছিলেন। এর মধ্যে এটি নিয়ে উড়েছেন অনেকটা পথ। এমনকি দুর্ঘটনার দিনও এটি নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে আসা-যাওয়া করেছেন চারবার। এরপর দুপুরে রওনা করেন নেপালের দিকে। নেপালের মাটি ছুঁয়েও ফেলেন। তারপরই ধেয়ে আসে ট্র্যাজেডি। বিধ্বস্ত উড়োজাহাজে দাউ দাউ আগুন। তারপর সব শেষ।
নওগাঁ জেলার রাণীনগরের এম এ কাশেম ছিলেন বৈমানিক। তাঁর পাঁচ ছেলে। অন্য চারজনই নানা খাতে প্রতিষ্ঠিত। তবে বাবার যোগ্য উত্তরসূরী আবিদ সুলতান। বেছে নেন বাবার পেশাকেই। পাইলট হিসেবে খুব নামডাক ছিলো আবিদের। সহপাঠী এবং সহকর্মীদের কাছে একজন ‘ব্রাইট অফিসার’।
সোমবারের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সেই ব্রাইট অফিসারকেই হারালো দেশ। স্ত্রী আফসানা খানম হারিয়েছেন বেঁচে থাকার প্রেরণা। ছেলে তানজিব বিন সুলতান হারিয়েছে মাথার ওপরের সবচেয়ে বড় ছায়া। জীবন চলার পথে যেন সবটাই ঠিকঠাক চলছিলো। হঠাৎ এক ঝড় এসে লণ্ডভণ্ড করে দিলো তাদের জীবন-সংসার।
গত সোমবার নেপালের কাঠমান্ডুতে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণকালে রানওয়ের পাশে আছড়ে পড়ে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ বিএস-২১১। ঘটনার দিনই ৫০ জন নিহতের খবর পাওয়া যায়। তখনও বেঁচে ছিলেন আবিদ। গতকাল পর্যন্ত চিকিৎসাধীন ছিলেন কাঠমান্ডুর নরভিক হাসপাতালে। আবিদ সুস’ হয়ে ফিরবেন- এমন আশাতেই ছিল তার পরিবার। গতকাল মঙ্গলবার মৃত্যুর কাছে হেরে গেলেন তিনিও।
রাজধানীর উত্তরা পশ্চিমের ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের বাসিন্দা ছিলেন আবিদ সুলতান। পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকেন একটি ভাড়া বাসায়। আবিদের স্ত্রী বলেন, ‘ও (আবিদ) ও খুব ইনোসেন্ট এবং দক্ষ। এমন করে চলে যাওয়া কল্পনাতীত। ওর মতো মানুষ দুর্ঘটনায় পড়ে যাবে ভাবনাতীত।’
আবিদের একমাত্র সন্তান তানজিব বিন সুলতান মাহি এবার ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা দেবে। আবিদের মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরাও। সবাই একবাক্যে বলছেন, তিনি খুব পারদর্শী ছিলেন।
আবিদের দক্ষতার প্রশংসা করছেন ইউএস বাংলার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। গতকাল সকালে পাইলটের মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস’াপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বলেন, আবিদ সুলতান খুবই দক্ষ পাইলট ছিলেন। ৭০০ ঘণ্টার বেশি তিনি বিভিন্ন উড়োজাহাজ নিয়ে আকাশে উড়েছেন। এমনকি নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও অবতরণ করিয়েছেন শতাধিকবার।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এম নাইম হাসানও এই ক্যাপ্টেনের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘আবিদ খুব ভালো পাইলট ছিলো। ভালো ক্রিকেট খেলতে পারতো। আমার ছাত্র ছিলো। অনেকেই বলেছে সে ড্যাশ-৮ এর ভালো পাইলট ছিলো।’
সবসময়ের সঙ্গী বাবা সেদিন যাননি
স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতে সবসময় প্রিথুলা রশীদের সঙ্গে থাকতেন বাবা আনিসুর রশীদ। একপর্যায়ে আনিসুর চলে যান প্রবাসে। এই ফাঁকে বৈমানিক হওয়ার পথেই এগিয়ে যান মেয়ে। প্রশিক্ষণ শেষে যোগ দেন ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসে। এর মধ্যে প্রবাসের হিসাব চুকিয়ে আনিসুর চলে আসেন দেশে। আবার শুরু হয় বাবা-মেয়ের একসঙ্গে পথচলা। যেদিন মেয়ের ফ্লাইট থাকতো, সেদিন বিমানবন্দর পর্যন্ত এগিয়ে দেন বাবা। এটি প্রায় নিয়মিত চিত্র ছিলো।
প্রিথুলা ছিলেন বিধ্বস্ত উড়োজাহাজটির ফার্স্ট অফিসার (কো-পাইলট)। গত সোমবার ফ্লাইট থাকলেও প্রিথুলার সঙ্গে বিমানবন্দরে যাননি আনিসুর। এয়ারলাইনসের গাড়ি এসে প্রিথুলাকে নিয়ে যায়। কে জানতো, এই একাকি যাত্রাই যে তার জীবনের শেষ যাত্রা হতে চলছিলো। নেপালের মাটিতে উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হলে ঘটনাস’লেই প্রাণ হারান আনিসুরের সবসময়ের সঙ্গী আদরের মেয়ে প্রিথুলা রশীদ।
এমন ছোট ছোট স্মরণের আর বেদনার গল্পগুলো এখন বড় হয়ে উঠছে। জীবনের এই গল্পগুলো শুধু আবিদ সুলতান এবং প্রিথুলী রশীদের না। বিএস ২১১ উড়োজাহাজের নিহত ৫০ আরোহীর প্রত্যেকের ঘরে ঘরে এখন কান্না আর আহাজারি। নিহতদের মধ্যে ২৬ জনই বাংলাদেশি। এদের বেশিরভাগই বেড়াতে যাচ্ছিলেন হিমালয়কন্যা নেপালে। কেউ ছুটি পেয়ে, কেউ ছুটি নিয়ে যাচ্ছিলেন। আনন্দের এই যাত্রা শেষপর্যন্ত বিষাদেই শেষ হলো।