২৬ মরদেহের অপেক্ষা

বিমানমন্ত্রীকে নিয়ে ত্রিভুবনের আকাশে এক ঘণ্টা ঘুরলো বিমান বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

নেপালের মাটিতে বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের নিহত আরোহীদের মধ্যে ২৬ জন বাংলাদেশি। তবে বেশিরভাগ মরদেহ পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়ায় গতরাত পর্যন্ত তাদের সকলের পরিচয় শণাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অবশ্য এ নিয়ে বেশ জোরেশোরে কাজ করছেন দু’দেশের বিশেষজ্ঞরা। নিহতদের মরদেহ পেতে ব্যাকুল হয়ে আছেন তাদের স্বজনেরা। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা ছুঁয়ে গেছে হতাহতদের স্বজন ছাড়াও দেশ-বিদেশের কোটি মানুষের হৃদয়। সবারই এখন একটাই অপেক্ষা- কবে নাগাদ দেশে ফিরছে নিহতদের মরদেহ।
গত সোমবার ইউএস বাংলার উড়োজাহাজ বিএস ২১১ বিধ্বস্ত হয়ে ৫০ আরোহী প্রাণ হারান। আরও অনেকে হাসপাতালে ছটফট করছেন। এ দুর্ঘটনায় নিয়ে যখন রানওয়ে প্রসঙ্গে আসছে ঘুরেফিরে, তখন আবারও একই দুর্ভোগে পোহাতে হলো বাংলাদেশের আরেকটি উড়োজাহাজকে। সোমবারের ঘটনায় হতাহতদের অবস’া জানতে নেপালে যান অনেকে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজে বিমানমন্ত্রী, সরকারের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকেরা যাচ্ছিলেন। কিন’ সময়মতো রানওয়ে খালি করতে না পারায় উড়োজাহাজটিকে প্রায় ঘণ্টাখানেক আকাশে থাকার পরামর্শ দেয় ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। আকাশে উড়ন্ত উড়োজাহাজটি কয়েকবার ঝাঁকুনিও দেয় বলে অনেকের দাবি।
এদিকে, দুর্ঘটনায় হতাহতদের ৪৬ স্বজনকে গতকাল নেপালে নিয়ে যায় ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ। প্রতিষ্ঠানটির তরফে বলা হয়েছে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরোহীদের সব ধরনের চিকিৎসা ব্যয় তারা বহন করবে। মরদেহে দেশে আনার পাশাপাশি নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণও দেয়া হবে।
নিহতদের মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস’াপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফরেনসিক প্রতিবেদনসহ মেডিক্যাল প্রসিডিউর শেষ হওয়ার পর তাদের মরদেহ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে। আহতদের চিকিৎসার সব ধরনের সহযোগিতা দিতে ইউএস বাংলা প্রস’ত রয়েছে।’ ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনায় সহযোগিতা এবং হতাহতদের সার্বিক ব্যবস’াপনার লক্ষে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্তা গতকালই কাঠমান্ডু পৌঁছেছেন বলে জানান তিনি।
হতাহতদের তালিকা প্রকাশ
বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের
হতাহত বাংলাদেশিদের তালিকা প্রকাশ করেছে কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাস। তালিকায় উল্লেখ করা হয়, ওই উড়োজাহাজে আরোহী ৭১ জনের মধ্যে ৩৬ জন বাংলাদেশি। দুজন পাইলট, দুজন কেবিন ক্রু এবং ২২ যাত্রী মারা গেছেন। আহত অবস’ায় নেপালের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ১০ জন।
দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি অসিত বরণ সরকার জানিয়েছেন, উড়োজাহাজের ৭১ আরোহীর মধ্যে ৪৯ জন মারা গেছেন। ২২ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
জানা গেছে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১০ জনের অবস’া ভালো না। এদের মধ্যে ইমরানা কবির হাসি, শাহরিন আহমেদ, শেখ রাশেদ রুবাইয়াত, আলমুন নাহার অ্যানি, মেহেদী হাসান, সাঈদা কামরুন্নাহার স্বর্ণা, কবির হোসেন ও মো. শাহীন বেপারি কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ইয়াকুব আলী নরভিক হাসপাতালে এবং রিজওয়ানুল হক ওম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বিমানের পাইলট ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান চিকিৎসাধীন অবস’ায় গতকাল মঙ্গলবার সকালে মারা যান। ফার্স্ট অফিসার (কো-পাইলট) প্রিথুলা রশিদ, ক্রু খাজা হোসেন মো. শাফি ও শারমিন আক্তার নাবিলা ঘটনার দিনই প্রাণ হারান।
যাত্রীদের মধ্যে নিহত হয়েছেন- ফয়সাল আহমেদ, আলিফুজ্জামান, বিলকিস আরা, বেগম হুরুন নাহার বিলকিস বানু, আখতারা বেগম, নাজিয়া আফরিন চৌধুরী, রকিবুল হাসান, হাসান ইমাম, মো. নজরুল ইসলাম, আঁখি মনি, মিনহাজ বিন নাসির, ফারুক হোসেন প্রিয়ক, তার তিন বছর বয়সী শিশু কন্যা প্রিয়ন্ময়ী তামারা, মতিউর রহমান, এস এম মাহমুদুর রহমান, তাহিরা তানভিন শশী রেজা, পিয়াস রায়, বেগম উম্মে সালমা, মো. নুরুজ্জামান, রফিক জামান, তার স্ত্রী সানজিদা হক বিপাশা, তাদের ছেলে অনিরুদ্ধ জামান (শিশু)।
সবাই চিৎকার করছিলো আর দোয়া পড়ছিলো
এক বন্ধুর সঙ্গে ওই উড়োজাহাজে ছিলেন ঢাকার একটি স্কুলের শিক্ষক শাহরিন আহমেদ। তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও মারা গেছেন তার সেই বন্ধু। বিবিসি নেপালি সার্ভিসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তার সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন ২৯ বছরের শাহরিন। তিনি বলেন, ‘তখন সবাই ভয়ে চিৎকার করছিল আর আল্লাাহর কাছে দোয়া চাইছিল।’
দুর্ঘটনায় শাহরিনের শরীরের অনেক জায়গা পুড়ে গেছে। বর্তমানে তিনি কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ টিচিং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি আরও বলেন, ‘বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা থেকে আমরা উড্ডয়ন করি। দুপুর আড়াইটার দিকে কাঠমান্ডু পৌঁছে পাইলট প্রথমে অবতরণ করার চেষ্টা করেন। কিন’ পারেননি। পরে ঘুরে ঘুরে আবার যখন দ্বিতীয়বার অবতরণের চেষ্টা করে, তখন উড়োজাহাজটি বাঁ দিকে কাত হয়ে যায়। তখনই আমি বলি, বাঁ-দিকটা উঁচু হলো কেন, আর তখনি (উড়োজাহাজ) বিধ্বস্ত হলো!’
উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার আগে কোন আভাস দেয়া হয়েছিল কি-না বা তারা কিছু টের পেয়েছিলেন কি-না- এ প্রশ্নের জবাবে শাহরিন বলেন, ‘একেবারে স্বাভাবিকভাবেই উড়োজাহাজটি নামছিল। একদম হঠাৎ করে সবকিছু হয়ে গেল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগুন লাগার আনুমানিক প্রায় ২০ মিনিট পর সাহায্য আসে। সে পর্যন্ত আমি ও আরেকজন ভেতরেই বসে ছিলাম। প্রচণ্ড ভয় লাগছিল আর হেল্প হেল্প বলে চিৎকার করছিলাম। কারণ আমি জানতাম, আগুন লাগার পর অনেকে দমবন্ধ হয়েই মারা যায়।’
বাংলাদেশি শাহরিন জানান, উদ্ধারকারীরা আগুন নেভানোর পর উড়োজাহাজটির একটি অংশ খসে পড়ে। আর বাইরে থেকে পরিষ্কার বাতাস ভেতরে আসতে শুরু করে। বাইরে আসার সময় দেখতে পান, একজন উড়োজাহাজের মেঝেতে পড়ে আছে, তার হাত ঝুলছিলো। তবে তিনি বেঁচে আছেন কি-না, সেটি বুঝতে পারেননি শাহরিন।
ত্রিভুবনের আকাশে এক ঘণ্টা ঘুরলো বিমান বাংলাদেশ
অপরদিকে, গতকাল আবারও শংকা বিরাজ করে নেপালের আকাশে। বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রীকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটকে অবতরণের অনুমতি না দিয়ে আকাশে ঘুরায় ত্রিভুবন এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ। এক ঘণ্টা বিলম্বে অবতরণের আগে বিমানটি কয়েকবার ঝাঁকুনিও খায়। এ সময় উড়োজাহাজে থাকা যাত্রীদের অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাঠমান্ডুগামী ফ্লাইট বিজি-০০৭১ ময়ূরপঙ্ক্ষী নামে উড়োজাহাজটি মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়ে। নেপালের স’ানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এটি অবতরণ করার কথা। দুর্ঘটনা-পরবর্তী পরিসি’তি দেখতে কাঠমান্ডু যাচ্ছিলেন বিমানমন্ত্রী এ কে এম শাহজাহান কামালসহ সিভিল এভিয়েশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। উড়োজাহাজটিতে ছিলেন অর্ধশতাধিক বাংলাদেশি সাংবাদিকসহ শতাধিক যাত্রী।
দুপুর ১২টা ১০ মিনিটের দিকে গন্তব্যস’ল থেকে মাত্র ৪৯ মাইল দূরত্বে থাকাকালীন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট নুসরাত জানান, কাঠমান্ডুর আকাশে ঝলমলে রোদ। কিন’ ট্রাফিক জটলা থাকায় আমাদের ৩০ মিনিট পর উড়োজাহাজটি অবতরণের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এর কয়েক মিনিটের মধ্যে আবার কন্ট্রোল টাওয়ারের বরাত দিয়ে আরও ৩০ মিনিট অর্থাৎ এক ঘণ্টা পর অবতরণের কথা জানান ফ্লাইটের কো-পাইলট। এ সময় উড়োজাহাজটি এয়ারপোর্টের আশপাশের আকাশে ঘুরতে থাকে।
কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগের পর ক্যাপ্টেন বলেন, ‘আমাদের এখনও ল্যান্ডিং টাইম দেওয়া হয়নি। আশা করি ৩০ থেকে ৪০ মিনিট অতিরিক্ত ফ্লাই করে বিমানবন্দরে ল্যান্ড করতে পারব।’ এর ১০ মিনিট পর ক্যাপ্টেন আবার জানান, ‘ল্যান্ডিং টাইম পেয়েছি। স’ানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে অবতরণের কথা থাকলেও সময় দেওয়া হয়েছে দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে। আশা করছি আমরা সময়মতো অবতরণ করতে পারব।’
এই উড়োজাহাজে অবস’ানকারী একাধিক সাংবাদিক গতকাল সুপ্রভাতকে জানান, নেপালের আকাশে ওড়ার সময় কয়েকবার ঝাঁকুনি খায় উড়োজাহাজটি। ভেতরের আরোহীরা বেশ অস্বস্তিতে পড়েন, অনেকে আতংকিত হয়ে যান। সোমবারও এ ধরনের কোনো পরিসি’তি তৈরি হয়েছে বলে তাদের শংকা। আর, এই অস্বস্তিকর পরিসি’তির ইতি ঘটে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে।