কাল বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস

ই-কেনাকাটার নামে অনলাইন প্রতারণা!

কামরুন নাহার সানজিদা

চায়না ফ্যাশন বিডি নামের অনলাইন পেইজটিতে একটি ব্লেজার খুব পছন্দ হয় সোহেল সাখাওয়াতের। তাদের সাথে যোগাযোগ করে পরদিন দুপুরেই পণ্য পেয়ে যান তিনি। তার আগে বিকাশে অগ্রিম ও কন্ডিশন পেমেন্ট করেন। কিন’ ব্লেজারটি হাতে নিয়ে দেখেন তা অনলাইনে দেখানো সেই ব্লেজার নয়। এমনকি মানও খুবই নিম্ন। তাদের পেইজটি আবার চেক করে দেখেন, এর আগেও তারা অনেকের সাথেই প্রতারণা করেছে।
বাজারে ভেজাল পণ্যের মত ভেজাল ছড়িয়ে পড়েছে ই-কমার্স বা ডিজিটাল বাজার ব্যবস’ায়ও। যে বাজার ব্যবস’ার শুরুটা হয়েছিলো কেনাকাটাকে আরো সহজ করতে, সেই বাজারেই এখন চলছে ভোক্তাকে ঠকানো। তাই বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবসে বেছে নেয়া হয়েছে ই-কমার্সকেই। আগামীকাল (১৫ মার্চ) পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস। এবারের বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল বাজার ব্যবস’ায়
অধিকতর স্বচ্ছতা ও নায্যতা নিশ্চিতকরণ’।
‘পণ্যে ভেজাল’ বিষয়টি এখন আমাদের দেশে ‘ওপেন সিক্রেট’। এক সময়ে মানুষ অধিকাংশ ভাল মানের পণ্য থেকে দু’-একটি ভেজাল পণ্যকে সহজেই পৃথক করতে পারতেন। কিন’ এখন অবস’া সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন অধিকাংশ ভেজাল পণ্যের মধ্য থেকে দু’-একটি ভাল পণ্যকে খুঁজে নিতে হচ্ছে। ভেজালের রয়েছে নানা রকমফের।
সেবা ও পণ্যের মান যথাযথ না হওয়া, বিক্রয়োত্তর সেবা না পাওয়া, গ্যারান্টি বা ওয়ারেন্টির নামে ধোঁকাবাজি, ওজনে কারচুপি, প্যাকিং ও লেবেলিং-এ সুক্ষ্ম কারচুপি ইত্যাদি নিত্য নৈমিত্তিক ও একটি অতি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাত্র কয়েক বছর হলো, বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ই-কমার্স। অনলাইনে কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, ব্যাংক একাউন্টে ট্রানজেকশন’র মাধ্যমে যানজটের ঝামেলা পোহাতে হয় না, ব্যস্ত নাগরিক জীবনে অনেক সময়ও বেঁচে যায়। তাই ক্রেতাদের কাছে বাজার বা শপিংমলে গিয়ে কেনাকাটার চেয়ে অনলাইনে কেনাকাটা আরো সুবিধাজনক।
কিন’ এই অনলাইন শপিংকে লক্ষ্য করেই প্রতারণা করে বেড়াচ্ছে কিছু চক্র। বেসরকারি চাকরিজীবী সোহেল সাখাওয়াতের মতো অনেকেই পণ্য পছন্দ করে। কোনো বিক্রেতা এসএ পরিবহনে কন্ডিশন পেমেন্টের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে বলেন। কিন’ ক্রেতা মূল্য পরিশোধের আগ পর্যন্ত পণ্যটি চোখে দেখতে পান না। ফলে হাতে পাওয়ার পর নিম্নমানের পণ্য নিয়ে প্রতারিত হন।
আরেকদল প্রতারক আছেন, যারা পণ্যের পুরো বা অর্ধেক মূল্য আগেই বিকাশ করতে বলেন। পণ্য নিশ্চিতকরণের জন্য এই ব্যবস’ার কথা বলা হলেও, পণ্য পাওয়ার দিন তাদের ফোন নম্বর আর খোলা পাওয়া যায় না।
ই-কমার্স নামক এই ডিজিটাল বাজার ব্যবস’ার প্রচলন কেনাকাটাকে সহজ করলেও এরজন্যই অনেকে প্রতারিত হচ্ছেন বললেন ভোক্তাদের অধিকার আদায়ের জন্য গঠিত সংগঠন কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, ‘অনলাইন কেনাকাটায় অনেক ভোক্তা প্রতারিত হন। ওয়েবসাইটে এক ধরনের পণ্য দেখিয়ে দেয়া হয় নিম্নমানের পণ্য।’
‘মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো থেকে নানা ধরনের অফার দেয়া হয়, এত টাকা রিচার্জ করলে এই অফার পাবেন। কিন’ তার সবটা দেয়া হয় না। অনলাইন কেনাকাটায় সঠিক পণ্যটি না পেলে কমপ্লেনও করা যায় না। এর জন্য সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। অনলাইন বিক্রেতাদেরও লাইসেন্স থাকা উচিত।’
ডিজিটাল বাজার ব্যবস’ায় ভোক্তারা যাতে প্রতারিত না হন, সে বিষয়ে সচেতন করতেই আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক হাসানুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘ই-কমার্সে ভোক্তাদের করণীয়, পণ্য ক্রয়ের আগে তা যাচাই করে নেয়া। বিক্রেতার পেইজে বা ওয়েবসাইটে গিয়ে রিভিউ দেখে নেয়া। পণ্যের মডেল নম্বরসহ স্ক্রীনশট নিয়ে নেয়া। মূল্য পরিশোধের আগে তাদের দেয়া বিকাশ নম্বরটিতে ফোন করে নিশ্চিত হওয়া। এছাড়া তাদের টার্ম এন্ড কন্ডিশনগুলোও ভালো করে জেনে নেয়া উচিত।’
প্রতারিত হলে আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ আছে বলে জানান এই কর্মকর্তা। তিনি সুপ্রভাতকে বলেন, ‘ভোক্তা যদি তার প্রতিশ্রুত পণ্যটি না পান, প্রতারিত হন সেক্ষেত্রে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কাছে প্রমাণসহ অভিযোগ করতে পারবেন। ২০০৯ সালের ৪৫ ধারা অনুযায়ী প্রতিশ্রুত পণ্য সরবরাহ না করলে এক বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয়দণ্ডের বিধান আছে। তবে আপোষের ক্ষেত্রে বিক্রেতার কাছ থেকে সঠিক পণ্যটি আদায় করে দেয়া যেতে পারে।’
বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস উপলক্ষে কাল নগরীতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে। সকাল ৯ টায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণ থেকে র্যালি ও সকাল ১০টায় সার্কিট হাউস সম্মেলন কক্ষে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে।