ইউএস বাংলার উড়োজাহাজ কাঠমাণ্ডুতে বিধ্বস্ত, ৫০ আরোহীর মৃত্যু

নামলো বিমান থামলো জীবন

অবতরণের আগে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আছড়ে পড়ে, আগুনে দগ্ধ হয়েই মৃত্যু, নিখোঁজ ৯, বেঁচে গেলেন পাইলট, বিমানে ছিলেন রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজের ১৩ নেপালি শিক্ষার্থী, ত্রিভুবন বিমানবন্দরে উঠানামা বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
BS-211-US-Bangla-airlines-a

কয়েক মিনিট পরেই উড়োজাহাজ থেকে নিরাপদে নামতে শুরু করতেন আরোহীরা। কে জানতো, আপদ তাদের সঙ্গেই ছিলো। নেপালের কাঠমান্ডুতে অবতরণের ঠিক আগ মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রানওয়ের পাশে একটি ফুটবল মাঠে আছড়ে পড়লো ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ। ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া উড়োজাহাজটিতে ছিলেন ৬৭ জন যাত্রী, দুজন পাইলট এবং দুজন কেবিন ক্রু। তাদের মধ্যে ৫০ জনের নিহত হওয়ার খবর দিচ্ছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। গতকাল সোমবার বেলা আড়াইটার কিছুক্ষণ পরে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ঘটে।
বিমানবন্দরে অবতরণের ঠিক আগেই উড়োজাহাজটি নিয়ন্ত্রণ হারায় বলে রয়টার্সের খবরে বলা হয়। রানওয়ের কাছে একটি ফুটবল মাঠে সেটি ক্র্যাশ ল্যান্ডিং করে। আগুন ধরে যায় গোটা উড়োজাহাজে। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মুখপাত্র প্রেমনাথ ঠাকুর গণমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশি উড়োজাহাজটিতে ৬৭ জন যাত্রী ছিলেন। ছিলেন ৪ জন কেবিন ক্রু। যেভাবে প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে উড়োজাহাজটি এবং যে রকম লেলিহান শিখা
গ্রাস করেছিল সেটিকে, তাতে অধিকাংশ আরোহীর মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র গকুল ভান্দুরীর বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, এ দুর্ঘটনায় অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৯ জন। দুর্ঘটনার
পরপর ২৫ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাদের মধ্য থেকে ৮ জন মারা যান। তবে বিমানটির পাইলট বেঁচে যান বলে একটি সূত্র দাবি করেছে।
বিধ্বস্ত উড়োজাহাজটিতে ছিলেন সিলেটের রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজের ১৩ জন নেপালি শিক্ষার্থী। গত রোববার এমবিবিএস ১৯তম ব্যাচের ফাইনাল প্রুফ পরীক্ষা দিয়ে দুইমাসের ছুটিতে তারা সবাই এই উড়োজাহাজে নেপালে নিজেদের পরিবারের কাছে ফিরছিলেন। ওই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১১ জন মেয়ে ও দুইজন ছেলে বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনায় তাদের সবাই নিহত হয়েছেন বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।
এছাড়া উড়োজাহাজটিতে ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের দুই কর্মকর্তা উম্মে সালমা ও নাজিয়া আফরিন চৌধুরী। একটি কর্মশালায় অংশ নিতে তারা কাঠমান্ডু যাচ্ছিলেন। উম্মে সালমা সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অনুবিভাগে সিনিয়র সহকারি প্রধান এবং নাজিয়া আফরিন চৌধুরী আন্তর্জাতিক অর্থনীতি অনুবিভাগে সিনিয়র সহকারি প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন।
স্বামীকে নিয়ে বিনোদন ছুটিতে যাচ্ছিলেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সহকারি অধ্যাপক ইমরানা কবীর হাসি। তিন বছর শিক্ষকতা করার পর শ্রান্তি বিনোদন ছুটিতে তিনি যাচ্ছিলেন নেপাল ভ্রমণে। হাসি নেপালের একটি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন বলে জানা গেলেও তার স্বামী রাকিবুল হাসানের ব্যাপারে কোনো তথ্য মেলেনি।
রুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক কামরুজ্জামান সরকার জানান, হাসি ছিলেন কম্পিউটার সাইন্স বিভাগের সহকারি অধ্যাপক। তার বাড়ি টাঙ্গাইলে। আর স্বামীর বাড়ি ঢাকায়। তার স্বামী ঢাকার একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে সিনিয়র প্রকৌশলী পদে কর্মরত।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সমন্বয়ক সানজিদা হক বিপাশাও ছিলেন এই উড়োজাহাজে। সঙ্গে ছিলেন স্বামী-সন্তানও। এখানে ছিলেন গাজীপুরের একই পরিবারের পাঁচ সদস্যও। ওই পাঁচজনের মধ্যে বাবা-মেয়ের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এমন অনেক বিনোদনপ্রেমী যাচ্ছিলেন হিমালয়কন্যা নেপালে। ছুটি নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নেপাল থাকে পছন্দের তালিকায়। সেই নেপালে যাওয়ার পথেই গতকাল ঘটে গেলো ট্র্যাজেডি।
তবে ঠিক কী কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটল, তা স্পষ্ট নয়। অবতরণের আগে উড়োজাহাজের চাকায় গোলোযোগ দেখা দিয়েছিল বলে একটি সূত্রে জানা গেয়ে। অবতরণের আগেই উড়োজাহাজটিতে আগুন ধরে যায় বলে, অন্য একটি সূত্রে জানা যায়।
নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ডিজি সঞ্জীব গৌতমের বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট লিখেছে, ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ মডেলের ওই উড়োজাহাজ ত্রিভুবনে নামার কথা ছিল রানওয়ের দক্ষিণ দিক দিয়ে। কিন্ত সেটি নামার চেষ্টা করে উত্তর দিক দিয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, পাইলট কোনো ধরনের কারিগরি জটিলতায় পড়েছিলেন।
উড়োজাহাজটি দুপুর ২ টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত কলকাতা বিমানবন্দরের এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের (এটিসি) আওতায় ছিল বলে জানা গিয়েছে। ঢাকা থেকে ছেড়ে গিয়ে কলকাতা এটিসি-র আওতা থেকে বেরিয়ে ১৮ কিলোমিটার যাওয়ার পর উড়োজাহাজটি দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয় বলে কলকাতা বিমানবন্দর সূত্রের খবর।
দুর্ঘটনা তদন্তে সিভিল এভিয়েশন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ দুর্ঘটনার পরপর কাঠমাণ্ডুর এই বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। বাতিল করা হয় সব ফ্লাইট।
উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের এ ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী নিহতদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করেছেন এবং আহতের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী, আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন সংগঠন এ দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশের কোনো উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে ১৯৮৪ সালে। ওই বছর ৫ আগস্ট বাংলাদেশ বিমানের একটি ফকার এফ-২৭ বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে ঢাকা বিমানবন্দরের কাছে বিধ্বস্ত হলে ৪৯ জন নিহত হন।
যেভাবে ঘটে দুর্ঘটনা
বিমান চলাচলের একটি ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ইউএস বাংলার উড়োজাহাজটি নেপালের স্থানীয় সময় বেলা ২ টা ২০ মিনিটে অবতরণ করে। নেপালে বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক সঞ্জীব গৌতম বলেছেন, উড়োজাহাজটিকে দক্ষিণ দিক থেকে নামার অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু এটি নামে বিমানবন্দরের উত্তর দিক থেকে।
তবে তিনি বলেন, ‘উড়োজাহাজটির অস্বাভাবিক এই অবতরণের কারণ সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত করে এখনও কিছু বলতে পারছি না।’
দুর্ঘটনাকবলিত উড়োজাহাজের এক যাত্রী বেঁচে গিয়ে নিজেকে সৌভাগ্যমান মনে করছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, খুব স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করেছিলো উড়োজাহাজটি। কিন্তু কাঠমান্ডু এয়ারপোর্টের কাছাকাছি গেলে এটি অদ্ভুত আচরণ করতে থাকে।
কাঠমান্ডু পোস্টকে তিনি বলেন, ‘হঠাৎ এটি প্রচণ্ড জোরে কাঁপতে থাকে এবং তারপর বিকট জোরে শব্দ হয়। আমি জানালার পাশেই বসেছিলাম। বিধ্বস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাশের জানালা ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হই।’
বিধ্বস্ত হওয়া উড়োজাহাজটিতে উড়েই দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আশীষ কুমার সরকার। কিন্তু ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের আগেই বিধ্বস্ত হয় বিমানটি।
আশীষ জানিয়েছেন, উড়োজাহাজটি রানওয়েতে নামতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। অবতরণ করার সাথে সাথেই উড়োজাহাজটি কাঁপছিলো। তারপরই হঠাৎ একসময় তাতে আগুন ধরে যায়।
তিনি বলেন, ‘বোর্ডিং পাস শেষ করে আমি অপেক্ষমান ছিলাম। বিমানবন্দরে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ছবি তুলছিলাম মোবাইলে। আমি দেখলাম ল্যান্ড করার সাথে সাথে উড়োজাহাজটি কাঁপছিলো। মনে হচ্ছিলো যে ওটা মনে হয় ঠিক মতো ল্যান্ড করতে পারছিলো না। তারপর দেখলাম যে হঠাৎ করে উড়োজাহাজে আগুন ধরে গেছে।’
যাত্রী ছিলেন যারা
উম্মে সালমা, মো. রফিকুজ্জামান, মো. নুরুজ্জামান, মো. অনিরুদ্ধ জামান, সৈয়্যদা কামরুন্নাহার স্বর্ণা, শেখ রাশেদ রুবায়েত, তাহিরা তানভীন শসী রেজা, পিয়াস রায়, ইমরানা কবির হাসি, কবির হোসেন, সানজিদা হক, হাসান ইমাম, রায়েনা আব্দুল্লাহ, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, মিনহাজ বিন নাসির, এসএম মাহমুদুর রহমান, মো. মতিউর রহমান, মেহেদী হাসান, রকিবুল হাসান, নাজিয়া আফরিন চৌধুরী, শাহীন বেপারী, আক্তারা বেগম, নুরুন্নাহার বানু, বিলকিস আরা, আলমিন নাহার এ্যানি আলিফুজ্জামান, ইয়াকুব আলী, শাহরিন আহমেদ, ফয়সাল আহমেদ, আলিফুজ্জামান, রিজওয়ানুল হক, আশনা সানিয়া, সানাম সানিয়া, কৃষ্ণ কুমার শাহানী, আঞ্জিল শ্রেষ্ঠা, সারুনা শ্রেষ্ঠা, হরি প্রসাদ সুবেদী, দয়ারাম কর্মকার, বাল কৃষ্ণ থাপা, শ্বেতা থাপা, কিশোর ত্রিপাতি, অবদেশ কুমার যাদব, দিনেশ হিমাগায়েন, শ্রেয়া ঝা, পূর্ণিমা লোহানী, মিলি মেহেরজান, নেগা মেহেরজান, সঞ্চয় মেহেরজান, জন মিং, আখি মনি, পেশব পান্ডে, প্রসন্ন পান্ডে, বিনোদ রাজ পদুয়াল, হরি শংকর পদুয়াল, সঞ্চয় পদুয়াল, আশিষ রঞ্জিত, তাহাররা প্রিয়ন্বয়ী, এফএইচ প্রিয়ক, সাজানা দেবকোটা, বসন্ত বহরা, রবীন্দ্র বহরা, মিসেস গিয়ানি গুরুং, মিসেস প্রিন্সি ধাম, প্রবীণ চিত্রকর, সামিরা বায়ানজানকার, চারু বড়াল, আলগিনা বড়াল ও শিলা বাজগাইন।