সমসাময়িক

নির্বাচনে কী অর্জিত হতে পারে

আবুল মোমেন

২০১৪-এর নির্বাচনের আগে-পরে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক আন্দোলন চালিয়েছিল দেশের অপর প্রধান দল বিএনপি। তারা নির্বাচন বর্জন করে এ ধরনের গণবিরোধী নেতিবাচক আন্দোলনের পথ ধরে ভুল করেছিল। সে উপলব্ধি তাদের হয়েছে ভালোভাবে। ফলে পরবর্তী চার বছর বিএনপি আর আন্দোলনের পথই মাড়ায়নি।
এ বছর নির্বাচন হবে, সরকার-প্রধান নির্বাচনী সভা-সমাবেশ শুরু করে দিয়েছেন। বিদেশি দূত ও আন্তর্জাতিক মহল দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনও মাঝে মাঝে তাঁদের নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিকল্পনার কথা বলেছেন। ফলে বিএনপি আবার গুছিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তবে সরকার আইনি পথে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় দলের নেতা-কর্মীদের দমিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। দলের দুই শীর্ষ নেতা তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার শাস্তি সত্ত্বেও বিএনপি সংযত থাকার পরিকল্পনাই নিয়েছে। কারণ ২০১৪-র বাড়াবাড়ির খেসারত তাদের ভালোভাবে দিতে হয়েছে। তবে দেশের প্রধান একটি দল হিসেবে মত প্রকাশ ও রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে তারা কতদিন এভাবে চলবে – এটা সমর্থক এবং জনমনে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালাও-পোড়াও ভিন্ন কার্যকর আন্দোলনের কথা তারা কেন ভাবতে পারছে না সেটাও ভাবার বিষয়। সময় কিন’ এগিয়ে চলেছে, নির্বাচনও ঘনিয়ে আসছে। চাপের মুখে থাকা দলকে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে দ্রুত পরিবর্তমান পরিসি’তিতে ঘন ঘন কর্মসূচি দিতে হয়। কিন’ তাতে দলের অনুকূলে ফল না এলে হতাশা বাড়বে, এবং সদর্থক আন্দোলনেও কর্মীদের নামানো কঠিন হবে।
বিপরীত দিকে ২০১৪ এর মোটামুটি ভোটারবিহীন নির্বাচন যাতে আবার অর্ধেকের বেশি আসনে সরকারি দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছিলেন তার গ্রহণযোগ্যতা তো গোড়া থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। সংবাদপত্র এ নিয়ে প্রচুর লিখেছে, বিদেশিরাও অনেক কথা বলেছে। কিন’ বিএনপি সরকারি দলের এ দুর্বলতাকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেনি মূলত সংসদে অনুপসি’তির কারণে। সরকারের এই গোড়ার গলদ নিয়ে খুব বেশি দূর এগুতে পারেনি বিএনপি। ফলে আওয়ামী লীগ প্রাথমিক সমস্যাগুলো কাটিয়ে দেশের উন্নয়নের দিকে মন দিতে পেরেছে। সংসদে ও সংসদের বাইরে বিরোধীদলবিহীন অবস’ায় সুশাসন নিশ্চিত করা মুশকিল।
ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট হলেও সরকারের বড় দুর্বলতা থেকে গেল সুশাসনের অভাব, তা থেকে সৃষ্ট দুর্নীতি, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ এবং সমাজে অপরাধপ্রবণতার বৃদ্ধি। একথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।
বিএনপির সমর্থক অর্থাৎ ভোটার আছে পর্যাপ্ত এ কথা দলের নেতৃত্ব ভালোভাবেই জানে। ফলে তারা নির্বাচন নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। কিন’ নির্বাচন কেমন হবে সেটাই তাদের প্রধান বিবেচ্য বিষয়। সম্ভবত বিএনপি চাইছে যে কোনো অবস’াতে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন হোক। তাতে তারা ক্ষমতায় ফিরতে না পারলেও ভালোভাবে সংসদে থাকতে পারবে। এ কারণে তারা আন্দোলনকে সংযত রাখার কৌশলেই থাকতে চাইছে। এদিকে অবস’াদৃষ্টে মনে হচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সুষ্ঠু নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নিশ্চিত নয় বলেই মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের নীরব সংখ্যাগুরু ভোটারগণ ব্যালট বাক্সে কোন্ ইতিহাস রচনা করবে তা পরিস্কার নয়। যতই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা বলা হোক তার চেয়ে এখন দেশের মানুষের মধ্যে ধর্মভিত্তিক চিন্তা-চেতনাই বেড়েছে। আওয়ামী লীগ চেষ্টা করছে সব কুল রক্ষা করতে। তারা হেফাজত এবং আরো কিছু ধর্মভিত্তিক প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তার গোষ্ঠীর সাথে আপস করছে। কিন’ তাদের ভোট পাওয়ার ব্যাপারে কি আওয়ামী লীগ নিশ্চিত হতে পারে?
বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে সেনা ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং বণিক শ্রেণির সমর্থন বড় ভূমিকা পালন করে। বাইরের শক্তির ক্ষেত্রে সম্ভবত ভারতের মনোভাবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য পশ্চিমা দেশ ভারতের মাধ্যমেই মূলত স্বার্থরক্ষা করতে চায়। এসব দিক মোটামুটি আওয়ামী লীগের অনুকূলে রয়েছে। তবে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে গেলে বিএনপি যে তাদের সমর্থন পাবে না তা নয়। তখন সকলেই সরকারের সাথে মানিয়ে নিয়ে কাজ করতেই চায়। অতীতে আমরা আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও তাই দেখেছি।
মামলার কারণে এরশাদকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে তা কি খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে সম্ভব হবে? তা হবে না কারণ তিনি ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের বিকল্প শক্তি, জনগণও সেই ভাবমূর্তিতেই তাঁদের জানে এবং সেই অনুযায়ীই যারা সমর্থন দেওয়ার তারা দেয়। ফলে মামলায় শাস্তি পেয়ে তিনি জেলে থাকলেও তাঁর পক্ষে আপসের পথে হাঁটা সম্ভব নয়। বরং আমাদের দেশের ইতিহাস বলে রাজনীতিবিদ জেল-জুলুম অত্যাচারের শিকার হলে তাঁর ভাবমূর্তি বাড়ে – সে মামলা দুর্নীতির দায়ে হলেও। এ পথে খালেদা জিয়ার একজন তহবিল তছরুপকারীর কলঙ্কের চেয়ে নির্যাতিত রাজনীতিকের ভাবমূর্তি অর্জনের সম্ভাবনাই বেশি। সেটা বিএনপিকে দলীয় নেত্রীর অনুপসি’তিতেও নির্বাচনে ভালো করার সুযোগ করে দেবে।
ফলে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচন নিয়ে সত্যিই বড় ধরনের উদ্বেগ ও শংকার মধ্যে আছে। নিজেদের ভাবমূর্তির জন্যেই আসন্ন জাতীয় নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য হওয়া জরুরি। আবার দলের জন্যে নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এ কেবল চলমান উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার তাগিদেই নয়, বরং বেশি প্রয়োজন বর্তমানে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যে পুলিশি ব্যবস’া নেওয়া হচ্ছে তার পাল্টা ব্যবস’ার শিকার হওয়ার সম্ভাবনার কারণে। প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীরা খালেদা জিয়া ও আরো কিছু নেতার বিরুদ্ধে এমন সমালোচনা চালিয়ে থাকেন যা তাদের গায়ে লাগবে এবং ক্ষোভের কারণ হতে পারে। ক্ষোভ প্রতিহিংসার জন্ম দেয়। ফলে বেগম জিয়া প্রতিহিংসার পথে না হাঁটার প্রতিশ্রুতি দিলেও মনের শংকা কি দূর হবে?
বাংলাদেশ কীভাবে দ্বিপাক্ষিক হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসবে তা ভাববার বিষয়। এটা ঠিক বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধেরই ফসল, তাই এই যুদ্ধের পেছনে যে আদর্শ ও মূল্যবোধগুলো ছিল তাকে ধারণ করতে হবে আমাদের সব দলকে ও সব দলের রাজনীতিকেই। ইতিহাসের বড় ঘটনাগুলো এবং নায়কদের বিষয়েও ঐকমত্য তৈরি হতে হবে। তা না হলে সংঘাতের রাজনীতি চলতেই থাকবে এবং এই গোলমালের মধ্যে পাকিস্তানের প্রত্যাখ্যাত রাজনীতি, ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িকতার মত প্রবণতা দেশে থেকেই যাবে। আর এর ফলে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের আশংকাও দূর হবে না। আবার এইসব ধ্বংসাত্মক ও হিংসাত্মক প্রবণতার আড়ালে সমাজে সাধারণ অপরাধও বেড়ে যেতে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি বাংলাদেশে যে গণতন্ত্র আছে তা না থাকার মতই। প্রায় ত্রিশ বছরেও গণতান্ত্রিক ব্যবস’া সমাজ থেকে হিংসা-প্রতিহিংসার প্রবণতা দূর করতে পারেনি, সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদের আশংকা নির্মূল করতে পারেনি, পারেনি সমাজে পরমত-সহিষ্ণুতা ও সমঝোতা-শান্তির বাতাবরণ তৈরি করতে। এসবও কিন’ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জাতির অন্যতম অর্জন লক্ষ্য ছিল। ফলে এ অসম্পূর্ণ কাজের দায়ভার আওয়ামী লীগও অস্বীকার করতে পারে না।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক