দৃষ্টিপাত

শিক্ষা, শিক্ষক ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মোহাম্মদ হেদায়েত উল্যাহ

শিক্ষা ব্যক্তির দেহ-মনের সুষম বিকাশের মাধ্যমে একদিকে যেমন আধুনিক ও কর্মোপযুক্ত করে তুলে অন্যদিকে প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে টিকে থেকে নিজের যোগ্যতাকে প্রমাণের মানসিকতা তৈরি করে। শিক্ষা ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি এবং জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। সমাজ ও রাষ্ট্রের বিদ্যমান মূল্যবোধ ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সম্পন্ন যোগ্য নাগরিক গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই সঙ্গত কারণে একটি আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও উন্নত জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষা মানুষের অধিকার। এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদেও এটি নাগরিকের অধিকার হিসেবে বিবেচিত। সংবিধানে একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস’া প্রতিষ্ঠার কথা বলা থাকলেও এখনও পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তার জন্য হয়তো নানা আর্থ-সামাজিক কারণ থাকতে পারে। তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে যে বাংলাদেশের অর্জন বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে কারো দ্বিমত থাকার কথা না। তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি যে শিক্ষক সমাজ তা জোর দিয়ে বলা যায়। শিক্ষকদের বৃহৎ অংশই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমর্রত। দেশের নব্বই ভাগেরও বেশি শিক্ষার্থী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকরা দেশের শিক্ষা ব্যবস’ার মূল চালিকা শক্তি। তাই বেসরকারি শিক্ষকদের যথাযথ উন্নয়ন ছাড়া শিক্ষা ব্যবস’ার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস’া নিয়ে অনেক উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয়ভাবে মেধাক্রম অনুসারে নিয়োগ প্রক্রিয়া অবশ্য একটি সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত যদিও মেধাক্রম ও উপজেলাভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। শুধুমাত্র নিবন্ধন পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মেধাক্রম তৈরি করা কতটুকু যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত তা নিয়ে কিছুটা মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। তবে জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০১০ এর ঘোষণা মতে শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশা অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য মেধাভিত্তিক ও উপযুক্ত শিক্ষক নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারি কর্ম কমিশনের অনুরূপ একটি বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলে শিক্ষক সমাজ আরও বেশি খুশি হতো। অন্যদিকে শিক্ষা বিধিতে পেশাগত উন্নয়ন এবং শিক্ষার সুষ্ঠু ও সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পরিষদ গঠনের কথাও বলা হয়েছে। তবে অনেক প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ ভোটে শিক্ষক পরিষদ ও শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস’া থাকে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা স্বৈরতান্ত্রিক ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে উঠেন যা পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও পুরো শিক্ষা ব্যবস’াকে ক্ষতিগ্রস’ করছে। তাই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়গুলো তদারকি করা প্রয়োজন।
শিক্ষা ব্যবস’া জাতীয়করণের দাবি দীর্ঘদিনের। কেননা শিক্ষা মানুষের অধিকার রাষ্ট্র কিংবা সরকারের কোন ধরনের দান বা সহযোগিতা নয়। ফলে গোটা শিক্ষা ব্যবস’া জাতীয়করণের দাবী বহুকাল আগ থেকে। যতদিন শিক্ষা ব্যবস’া জাতীয়করণ হচ্ছে না ততদিন রাষ্ট্র কর্তৃক বেসরকারি শিক্ষকদের সম্মানজনক ও বাস্তবভিত্তিক সুযোগসুবিধা দেয়া যেতে পারতো। কিন’ তাও অনেকাংশে সম্ভব হয়ে উঠেনি। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের নিয়োগ, পদোন্নতি, আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে নানা অসঙ্গতি ও বঞ্চনার ইতিহাস। একই পদে সারা জীবন চাকরি করে অবসর নেয়ার মত বিষয় যেমন আছে তেমনি একই বেতন স্কেলে বছরের পর বছর থাকার বিষয়টিও রয়েছে। পেশাগত প্রশিক্ষণ, গবেষণা কিংবা উচ্চতর ডিগ্রির কোন পেশাগত স্বীকৃতি নেই। সরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ন্যায় এমফিল, পিএইচডি’র মত উচ্চতর ডিগ্রি কিংবা গবেষণার জন্য পেশাগত উৎসাহ ও পদোন্নতির ব্যবস’া থাকলে শিক্ষকরা উচ্চতর গবেষণার প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠত যা মানসম্মত শিক্ষার পথকে গতিশীল করতো।
অনুপাত প্রথার জন্য একজন শিক্ষক প্রভাষক পদে যোগদান করলে তিনি বিশ/পঁচিশ বছর চাকরি করলেও সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান না আর সহযোগী অধ্যাপক কিংবা অধ্যাপকের পদতো শুধুই স্বপ্ন যার বাস্তবতা নেই। এ ধরনের ব্যবস’া শুধু অযৌক্তিক ও অবাস্তবই নয় অমানবিকও বটে। কিন’ দুঃখের বিষয় হলেও সত্য এ নিয়ে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে রাজপথে থাকতে হচ্ছে। বছরের পর বছর একই পদে থাকতে থাকতে অনেকে যে আগ্রহ ও উৎসাহ নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আসে তা হারিয়ে ফেলে। যে শিক্ষক নিজ শিক্ষার্থীদের উৎসাহ ও আশার আলো দেখান তিনি নিজেই শেষ জীবনে এসে হতাশায় নিমজ্জিত হন। এক্ষেত্রে অনুপাত প্রথা বাতিল করে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, উচ্চতর ডিগ্রি ও গবেষণাকে গুরুত্ব দিয়ে পদোন্নতির ব্যবস’া করা সময়ের দাবি। অন্যদিকে সারা দেশে গ্রামে-গঞ্জে বেসরকারি কলেজগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স কোর্স চালুর অনুমোদন দেয়া হচ্ছে যা উচ্চ শিক্ষা প্রসারের পথকে প্রশস্ত করছে। কিন’ অনার্স কোর্সে পাঠদানের জন্য নিয়োগকৃত শিক্ষকদের কোন এমপিও নেই। তাই অধিকাংশ কলেজেই তারা খুব কম বেতন-ভাতা পেয়ে থাকে যা পরিবার-পরিজন নিয়ে চলার জন্য মোটেও উপযোগী নয়। জ্ঞানীরা বলে থাকেন একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। যথাযথ শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতির শিখরে উঠতে পারে না কেননা শিক্ষাই জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি। আর শিক্ষা ব্যবস’ার উন্নয়ন ও যথাযথ শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষা ব্যবস’ায় বিদ্যমান অসঙ্গতি দূর করতে হবে। শিক্ষকদের যথাযথ সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের পদোন্নতি ও পেশাগত মানোন্নয়ন এবং সম্মানজনক আর্থিক সুবিধা ও উচ্চরতর ডিগ্রির পেশাগত স্বীকৃতির দীর্ঘ দিনের দাবি পূরণ করতে হবে। এসব বিষয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা, উদ্যোগ, বাস্তব সিদ্ধান্তই আগামী দিনে আরও যোগ্য ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে উঠার পথকে প্রশস্ত করবে। আমার বিশ্বাস যৌক্তিকতা ও বাস্তবতার নিরিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে আন্তরিক হবেন।
লেখক : কলেজ শিক্ষক