সমসাময়িক

বাংলাভাষার সংগ্রামের আন্তর্জাতিক প্রভাব-প্রতিক্রিয়া

মো. কায়ছার আলী
Kaisar Ali

“নানান দেশের নানান ভাষা, বিনে স্বদেশী ভাষা, পুরে কি আশা”? মাতৃভাষা সমাসবদ্ধ পদ। ব্যাকরণের দিক দিয়ে ৬ষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস। অভিধানে লেখা আছে স্বদেশের ভাষা। ভাষা খেলা করে জিবের ডগায়। ঘোষিত হয় গলার মধ্যদিয়ে। প্রাণ লাভ করে ফুসফুসে। আসলে ওর জন্ম বুকের মধ্যে। উৎস মানুষের মন। প্রতিটি শিশুর জন্য মায়ের দুধ যেমন পুষ্টিকর ঠিক তেমনি প্রতিটি মানুষের জীবনের উন্নতির জন্য মাতৃভাষা পুষ্টিকর। ভাষা যে কোন জাতির সৃজনশীল ধী শক্তির অপূর্ব সৃষ্টি। জাতির মেধার অনন্য লালন ক্ষেত্রে। জাতির মননের আকর্ষণীয় স’াপত্য।
সারাবিশ্বে প্রায় সব ক্ষেত্রে ভাষার ভূমিকা এ রকমই হয়ে থাকে। আজ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি-বাঙালির ভাষার মাস। শুধু বাংলা ভাষাই নয়, পৃথিবীর ছোট-বড় সব জাতির মাতৃভাষার মর্যাদা আর গুরুত্ব তুলে ধরার মাস। কৃষ্ণচূড়ার রক্ত লালে রাঙানো বসন্তে আবার ফিরে এসেছে সেই ফেব্রুয়ারি মাস। মাতৃভাষাকে চির অম্লান করে সংগ্রামের জাগ্রত চেতনার মাস।
একটি লাল তারিখের অণু-পরমাণুতে গড়া নবচেতনার মাস, জীবন দর্শনের মাস। স্বার্থসিদ্ধির কালো মেঘের বক্ষ বিদীর্ণ করে সূর্য ওঠার মাস। বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার দাবি তথা বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সোপানের মাস। আর্থ-সামাজিক অধিকারবঞ্চিত বাঙালি জাতি তার সকল বঞ্চনা এ ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে মূর্ত করতে চায়। ফলে দেখা যায় যে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার পরও এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশে শহিদ দিবস ও শহিদ মিনারের আবেদন এতটুকু কমেনি। ইতিহাস গড়ে উঠে, ইতিহাস রচিত হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ইতিহাস এমনিভাবে প্রাণ পেয়েছে যদিও তার প্রতি বাঁকে বাঁকে রয়েছে নির্মল রক্তকণিকার মণিমুক্তা।
পাকিস্তানের শাসকেরা বাংলাভাষাকে কোনদিন সু-নজরে দেখেনি। তাদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, বাংলা হিন্দুর ভাষা, হিন্দু সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। তাই শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্র শুরু করলো। ১৯৪৯ সালের ১২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত খান গণপরিষদের সদস্যদের মধ্য থেকে একটি ‘মূলনীতি কমিটি’ গঠন করেন এবং পাকিস্তানের সংবিধান রচনার মৌল বিষয়বস’ নির্ধারণের ভার এই কমিটির উপর ন্যস্ত করা হয়।
১৯৫০ সালে ‘মূলনীতি কমিটির’ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এই রিপোর্ট পূর্ববাংলার জনগণ বিক্ষুব্ধ করে তোলে। পূর্ব বাংলার নেতৃবৃন্দ এতদিন যা দাবি করে এসেছে অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস’া, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন তার কোনটিতে তা স’ান পায়নি।
১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর লিয়াকত আলী খান আততায়ীর হাতে নিহত হলে খাজা নাজিমুদ্দীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হলেন। তিনি ঢাকায় এসে ১৯৫২ সালের প্রথম দিকে ভাষার প্রশ্নটি আবার উত্থাপন করেন এবং পল্টন ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর উক্তিটি আবার ঘোষণা করেন- ‘একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। এবার কিন’ প্রতিবাদের ঝড় তুমুল আকার ধারণ করল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য প্রাদেশিক পরিষদের আসন্ন অধিবেশন সামনে রেখে দেশব্যাপী আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করেন।
২১ ফেব্রুয়ারির পূর্বে কয়েকটি পথসভা, পতাকা দিবস পালন এবং সর্বত্রই জনগণের উৎসাহ উদ্দীপনা প্রকাশিত হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা জনগণের ভাষার এই মৌলিক দাবিটি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে তা ব্যাপক ভিত্তিক এক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে। কিন’ প্রতিক্রিয়াশীল সরকার এই আন্দোলনকে চেয়েছিলো বানচাল করতে যদিও আন্দোলনের যৌক্তিকতা ছিল সন্দেহাতীত।
পাকিস্তানের শতকরা আটজন লোক উর্দুতে কথা বলে। অথচ তা হবে রাষ্ট্রভাষা এবং যে ভাষায় দেশের শতকরা ৫৬ জন লোক কথা বলে তা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করবে না- এই যুক্তি একমাত্র নির্বোধ ছাড়া সকলেই বোঝে।
কিন’ পাকিস্তান সরকার ছিল বলদর্পী ও ক্ষমতালোলুপ। তাই একুশে ফেব্রুয়ারি হরতালকে বানচাল করার জন্য শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। রফিক, জব্বার, শফিউর রহমান প্রমুখ অকালে ঢলে পড়ল, ঢাকার রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হলো এবং সবকিছুই শুধুমাত্র মাতৃভাষার দাবিতে। পরবর্তী ১৯৫৩ সালের কমিটির রিপোর্টের আলোকে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম ‘সরকারি ভাষা’ হিসেবে মর্যাদাদানের সুপরিশ করা হয়।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের পরাজয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করে এবং ১৯৫৬ সালের সংবিধানে উর্দুর সঙ্গে বাংলাও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
বর্তমানে পৃথিবীতে ৬৭০০ এর বেশি ভাষা আছে। বর্তমান শতকে অধিক ভাষা হারিয়ে যাবে অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে একটি ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে। আমরা চাই আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষা দিনে দিনে আরো সমপ্রসারিত হোক।
সামপ্রতিককালে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলা ভাষার অনেক উন্নতি বা পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমান সরকারের দক্ষ এবং আন্তরিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে সাধারণ অধিবেশনে ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৮৮টি দেশের সমর্থনে সারাবিশ্বে আজ যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে দিবসটি “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে পালিত হচ্ছে।
শুধু এখানেই শেষ বলা যাবে না, যারা সেদিন ভাষা শহীদদের বুকে গুলি চালিয়েছিল, তাদের দেশেও আজ দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। অত্যন্ত আনন্দের সাথে বাংলা ভাষার সাম্প্রতিক একটি অর্জনের কথা লিখছি। নিউইয়র্ক সিটির ১৮০০ পাবলিক স্কুলে বাংলা শিশুদের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কয়েক লাখ স্কুল ছাত্র/ছাত্রী ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষায় পড়ার সুযোগ পাবে। নিজেদের বাবা মায়ের ভাষার সঙ্গে আরও সুন্দরভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ মিলবে। এজন্য অভিনন্দন জানাই নিউইয়র্ক স্কুল চ্যান্সেলর কংগ্রেসম্যান নিদিয়া ভ্যালেসকুয়েজকে।
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে যে প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছিল এবং পরের দিন ২৪শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালের শহীদ শফিউর রহমানের গর্বিত পিতার হাতে উদ্বোধনের পরে আজ সেই ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি চিরপ্রবহমান নদীর ধারার মত দেশ ও বিদেশে অবসি’ত সকল শহীদ মিনার বা স্মৃতিস্তম্ভে আবাল বৃদ্ধবনিতার মাধ্যমে ফুলে ফুলে, ভালোবাসার মালায় সিক্ত হয়ে শ্রদ্ধা আর ভক্তিতে ভরে উঠেছে। আর অন্তরের অন্তস’ল হতে হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত এবং প্রয়াত সুরকার আলতাফ মাহমুদ এর সুরে কালজয়ী গানটি দলে দলে গাইছে “আমার ভাইয়ের রক্ত রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলতে পারি”….।
আমাদের বাংলাভাষার আন্দোলনের বিশ্ব স্বীকৃতি মিলেছে। ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণায় অবলুপ্তির পথে যাওয়া ভাষাগুলি রক্ষা করতে বিভিন্ন জাতির মধ্যে সচেতনতা বাড়বে, তাছাড়া প্রবল কয়েকটি ভাষার বিশ্বায়নের চাপে পড়া ভাষাগুলিকে সমৃদ্ধ ও বিকশিত করতেও অনুপ্রেরণা জোগাবে।
২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদদের ভাষার জন্য আত্মদানের কাহিনী ছড়িয়ে দিতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটকে সক্রিয় করতে হবে। গবেষণা এবং অনুবাদের মাধ্যমে আমাদের সাহিত্যকর্ম বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব।
ভাষা আন্দোলনের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া আমাদের জাতীয় জীবনে গভীরভাবে অনুভূত হওয়া প্রয়োজন। এখানে নানা ঘাটতি, ফাঁক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সুতরাং একুশের লড়াই থামেনি বরং তা নিরন্তর চালিয়ে যেতে হবে।

লেখক : শিক্ষক, প্রাবন্ধিক