অমর একুশে আজ

ভাষার জন্যে লড়াই করার দেশেই অবহেলিত বহু ভাষা

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা

ভাষাবিদদের মতে, পৃথিবীতে মোট ভাষার সংখ্যা ৮ হাজার। আবার একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস’ার মতে, পৃথিবীতে এখন প্রচলিত রয়েছে ৬ হাজার ভাষা। এই হাজারও ভাষার ভিড়ে পৃথিবীতে অনেকটা চূড়ার দিকে অবস’ান করছে ‘বাংলা’। ত্রিশ কোটি মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করার এই ভাষাটির অবস’ান পৃথিবীতে চতুর্থ। আর, এই ভাষা তার স্বীকৃতি আদায় করেছে রক্তের বিনিময়ে। আজ সেই শোকের দিন। গৌরবের দিন। আজ অমর একুশে- শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউর, আউয়াল, অহিউল্লাহর রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আজ।
দিনটি আজও মর্মন’দ ও গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিবিজড়িত বাঙালি জাতির কাছে। ১৯৫২ সালের এই দিনে উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার প্রতিবাদে তথা রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আদায়ে আন্দোলনে নেমেছিলো ছাত্রজনতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার এক সভা থেকে পুলিশের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রতিবাদী মিছিলের সিদ্ধান্ত হয়। সেই মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে শহীদ হন কয়েকজন ছাত্র-তরুণ। সৃষ্টি হয় ইতিহাস। ভাষার লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ হারানোর এক অমর ইতিহাস। রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের কাছে মাথানত করে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার।
শুধু বাংলা ভাষাভাষী ৩০ কোটি মানুষের দেশ নয়, এই দিনে সেইসব ভাষা শহীদদের স্মরণ করবে পৃথিবীর ১৯৩টি দেশ। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। পরের বছর অর্থ্যাৎ ২০০০ সাল থেকে দিবসটি আন্তর্জাতিক
পর্যায়ে পালন করা শুরু হয়।
আজকে এই বাংলার আকাশে-বাতাসে যখন ধ্বনিত হচ্ছে ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি…’, আজ পৃথিবীব্যাপী যখন ভাষার দিনটি উদযাপন হচ্ছে গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়, তখনও গুমরে কাঁদে স্বয়ং এই দেশেরই অনেক ভাষা; যেগুলো রাষ্ট্রীয় অবহেলার কারণে আজ বিলুপ্তির পথে। ভাষার জন্যে প্রাণ বিলিয়ে দেওয়া, লড়াই করা এই দেশের কয়েকটি আদিবাসী ভাষা সেভাবে মর্যাদা পাচ্ছে না।
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৩(১)-এ উল্লেখ রয়েছে- ‘সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের তাদের মাতৃভাষায় পড়তে ও লিখতে শিক্ষা দান করতে হবে। কিংবা যেখানে এটা সম্ভব নয়, সেখানে তাদের সমগোত্রীয়দের মধ্যে সাধারণভাবে বহুল প্রচলিত ভাষায় শিক্ষা দান করতে হবে।’ অনুচ্ছেদ ২৩(২)-এ উল্লেখ রয়েছে- ‘মাতৃভাষা বা আদিবাসী ভাষা থেকে জাতীয় ভাষা কিংবা দেশের একটি অফিসিয়াল ভাষায় ক্রমান্বয়ে উত্তরণের জন্য ব্যবস’া গ্রহণ করতে হবে।’
কিন’ বাস্তবতা বলছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় স’ানীয়ভাবে নানারকম দাবি-দাওয়ার পরেও সরকার সেরকম ব্যবস’া করছে না। ভাষাগুলো সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ নেওয়ার দাবিও উপেক্ষিত। প্রাথমিকে শিক্ষার্থীদের কয়েকটা আদিবাসী ভাষায় বই পড়তে দিলেও পড়ানোর জন্যে কাউকে দেয়া হয়নি। ভাষাগুলো চর্চার জন্যে নেই কোনো ইনস্টিটিউট।
বান্দরবানে কালচারাল সোসাইটি ২০০১ সালে ম্রো ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্য ৬০টি স্কুল করেছিল। অর্থের সংকটে এগুলো চলছে তো চলছে না। পাঠদান কার্যক্রম একেবারেই ঢিমেতালে।
বার্মা, মালতো, খড়িয়া, গাড়ো, সাঁওতালি, সৌরা, মুরী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার সংখ্যা নেহাত কম নয়। কিন’ এই ভাষাগুলোর বেশিরভাগই অবহেলিত ও বিপন্ন। পাঁচ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য এই প্রথম সরকার থেকে প্রাথমিক শিক্ষার বই পাঠ্যদানে সংযুক্ত করা হয়েছে। কিন’ বেশিরভাগ ভাষায় তার কিছুই জোটেনি। তাই এখনই তা সংরক্ষণ করা না গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে কমপক্ষে আরও ১৫টি ভাষা হারিয়ে যাবে। আর ভাষা গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রচলিত ৫২টি ভাষার মধ্যে বর্তমানে সচল ৪২টি। মাত্র ১০০ বছরের ব্যবধানে বাকি ১০টি ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
জানা গেছে, রাঙামাটি সাজেক আঞ্চলের শৌরা ভাষা। এই ভাষায় কথা বলে মাত্র পাঁচজন মানুষ। পার্বত্য এলাকার রেংমির্চা ভাষা অবস’াও একই রমক। এ ভাষায় কথা বলে মাত্র জনাচল্লিশেক মানুষ। এদের সবার বয়স পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে। ভাষা গবেষকরা মনে করছেন, জীবিত এই মানুষগুলোর মৃত্যুর পরই এই ভাষাগুলোতে কথা বলার মত আর কেউ থাকবে না। ফলে ভাষাগুলো হারিয়ে যাবে চিরতরে।
[এই প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন- রবি হোসাইন]