৪৪ যুক্তিতে খালাস চান খালেদা জিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

দেশের বিভিন্ন খাতে লুটপাট, দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে ৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে খালেদা জিয়ার দেওয়া বক্তব্যের একটি বাক্য ছিলো- ‘ক্ষমতার অপব্যবহার আমি করেছি?’ খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের দাবি, এই বাক্য থেকে প্রশ্নবোধক চিহ্নটি সরিয়ে আদালত উল্লেখ করেছেন যে খালেদা জিয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে স্বীকার করে নিয়েছেন। বিস্ময় প্রকাশ করে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা এই পয়েন্টও তুলে ধরেছেন তাদের আপিলের যুক্তিতে।
শুধু এটি নয়, মোট ৪৪টি যুক্তি দেখিয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার বেকসুর খালাস চেয়েছেন তার আইনজীবীরা। এ মামলায় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড নিয়ে বন্দি আছেন বিএনপির চেয়ারপারসন। রায় ঘোষণার ১২ দিন পর গতকাল বুধবার উচ্চ আদালতে আপিল করা হলো। এই আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করা হবে কি না- আগামীকাল বৃহস্পতিবার সে সিদ্ধান্ত দেবে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের হাই কোর্ট বেঞ্চ।
এর আগে গত সোমবার বিকেলে পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি হাতে পান খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। নথিপত্রসহ মোট ১২২৩ পৃষ্ঠার আপিল আবেদনে ফাইলিং লইয়ার হিসেবে আবদুর রেজাক খানের নাম রয়েছে। খালেদার আইনজীবী দলের সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দুপুরে হাই কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায়
আপিল আবেদন জমা দেন। পরে তা বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের বেঞ্চে শুনানির জন্য তোলা হয়। বিএনপি চেয়ারপারসনের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদীন। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জমির উদ্দিন সরকার, খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলীসহ বিএনপিপনি’ আইনজীবীরা এ সময় উপসি’ত ছিলেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ আহমেদ ও সহকারি অ্যাটর্নি জেনারেল ইউসুফ মাহমুদ মোর্শেদ ও সাবিনা পারভিন। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান।
ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ গত ৮ ফেব্রুয়ারি এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। খালেদার পাশাপাশি তার বড় ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অন্য আসামিদের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। রায় ঘোষণার সময় বিচারক বলেছিলেন পুরো রায় ৬৩২ পৃষ্ঠার। তবে সোমবার বিকেলে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ পেলে দেখা যায় সেটির পরিধি ১১৬৮ পৃষ্ঠার। সোমবার একইসঙ্গে খালেদা জিয়ার আইনজীবী এবং দুদকের মোশাররফ হোসেন কাজলের হাতে রায়ের সত্যায়িত কপি তুলে দেন আদালতের পেশকার মোকাররম হোসেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, সরকারি এতিম তহবিলের টাকা এতিমদের কল্যাণে ব্যয় না করে পরস্পর যোগসাজশে আত্মসাৎ করে খালেদা জিয়াসহ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আসামিরা রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধ করেছেন।
রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি পেয়ে সোমবার রাতেই সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলীর চেম্বারে জরুরি বৈঠক করেন খালেদার আইনজীবীরা। গতকালও তারা দফায় দফায় বৈঠক করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্মেলন কক্ষে।
দুই পক্ষের প্রতিক্রিয়া
আপিল আবেদন দাখিলের পর বিএনপির স’ায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, এটা সাক্ষী-প্রমাণ দ্বারা প্রমাণ করা সম্ভব হয় নাই বলে আমরা মনে করি। তিনি নির্দোষ এবং তিনি আপিলে খালাস পাবেন।’ ১১৬৮ পৃষ্ঠার ওই রায়ের পাঁচ ভাগের চার ভাগই একেবারে অবান্তর বলে দাবি তার।
অন্যদিকে, দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এখনো তাদের দরখাস্তের (আপিল) কোনো কপি পাইনি। আমরা আপিলে মোকাবেলা করব। সর্বোতভাবে আমরা প্রস’ত।’ খালেদার সাজা বাড়ানোর কোনো আবেদন করা হবে কি-না, এ ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান এই আইনজীবী।
কয়েকটি যুক্তি
খালেদা জিয়ার আপিলে মোট ৪৪টি যুক্তি দেখানো হয়। একটি যুক্তিতে বলা হয়- জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে অর্থ বরাদ্দ বা এর কোনো লেনদেনের সঙ্গে খালেদা জিয়ার সম্পৃক্ততা নেই। তাছাড়া ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাত হয়নি, বরং ব্যাংকে তা বেড়ে তিনগুণ হয়েছে।
আরেক যুক্তিতে বলা হয়, এ মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা মামলা থেকে খালেদা জিয়াকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই তাকে মামলার অভিযোগপত্রে সম্পৃক্ত করেন। এটা তিনি করেছেন ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ হয়ে।
মামলার শুনানিতে দুদক ট্রাস্ট ফান্ডের মূল নথি দেখাতে পারেনি বলেও যুক্তিতে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, ২০০৮ সালের যে সম্পূরক নথি দেখানো হয়েছে তা জাল। এ মামলার জন্যই এসব নথি সৃজন করা হয়েছে।
আইনের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আপিলের আরেক যুক্তিতে বলা হয়েছে, ট্রাস্টের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড বা লেনদেনে যদি অনিয়ম থাকত তাহলে তা প্রতিকারের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। কিন’ সে আইনে মামলা না করে করা হয়েছে দুর্নীতি দমন আইনে। কোনোভাবেই এ বিষয়টি দুর্নীতির পর্যায়ে পড়ে না।
৩৪২ ধারায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে খালেদা জিয়ার দেওয়া বক্তব্যকে রায়ে ভুলভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে তিনি যা বলেছিলেন তা হল- ‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে নির্বিচারে গুলি করে প্রতিবাদী মানুষদের হত্যা করা হচ্ছে। ছাত্র ও শিক্ষকদের হত্যা করা হচ্ছে। এগুলো কি ক্ষমতার অপব্যবহার নয়? ক্ষমতার অপব্যবহার আমি করেছি? শেয়ার বাজার লুট করে লক্ষ কোটি টাকা তছরুফ হয়ে গেল, নিঃস্ব হল নিম্ন আয়ের মানুষ, ব্যাংকগুলো লুটপাট করে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে।’
যুক্তিতে বলা হয়, ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করেছি’ বাক্যাংশের পরে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছিল। কিন্ত তা সরাসরি খালেদা জিয়ার বক্তব্য হিসেবে গ্রহণ করে বিচারিক মননের প্রয়োগ ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন আদালত।