খালেদার মুক্তি নিয়ে শংকার শেষ নেই

কাল উচ্চ আদালতে আপিল ও জামিন আবেদনের সম্ভাবনা আরও দুই মামলায় আদালতে হাজির করার নির্দেশ

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা

কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে সব ধরনের প্রস’তি সেরে রেখেছেন তার আইনজীবীরা। অপেক্ষা কেবল নিম্ন আদালতের রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি। সেটিও আজ বুধবার পেয়ে যাওয়ার আশা করছিলেন বিএনপিপনি’ আইনজীবীরা। সে অনুযায়ী আগামীকাল বৃহস্পতিবার উচ্চ আদালতে যেতেও প্রস’ত তারা। এমনকি বয়স, সামাজিক অবস’ান, স্বাস’্যগত দিক এবং তুলনামূলক কম সাজার বিবেচনায় খালেদা জিয়ার জামিন হয়ে যাবে বলেও বেশ আশাবাদী ছিলেন তারা।
এতকিছুর পরেও বিএনপির চেয়ারপারসনকে এখনই কারাগার থেকে ছাড়িয়ে আনতে পারবেন কি-না, এ নিয়ে তারা নিজেরাও বেশ শংকিত। নতুন যে দুটি মামলায় বেগম জিয়াকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত, সেটিকেই এই মুহূর্তের প্রতিবন্ধকতা মনে করেন তারা। পাশাপাশি আরও অন্তত তিনটি মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আংশকা করছেন তারা।
গতকাল সকালে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরোনো কারাগারে বন্দি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন তার আইনজীবীরা। তারা কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও আলাপ করেন। এরপরই খবর আসে আরও দুটি মামলায় খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করার নির্দেশনা জারি হয়েছে। এ বিষয়ক চিঠি গতকালই কারাগারে পৌঁছায়। এ কারণে বিএনপি নেত্রীর কারাবাস দীর্ঘ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে নাশকতার একটি মামলায় খালেদাকে গ্রেফতার দেখানোর যে খবর বেরিয়েছে, সেটি নাকচ করে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিএনপি সূত্র জানায়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার বিষয়ে খালেদা জিয়ার পরামর্শ নিতেই গতকাল কারাগারে যান তার আইনজীবীরা। আপিল এবং জামিনের আবেদনের জন্য তারা প্রস’তি সেরে রেখেছেন। কেবল নিম্ন আদালতের দেয়া রায়ের সত্যায়িত অনুলিপির অপেক্ষা এখন।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত এবং কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ শেষে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা খালেদার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া জানান, বুধবার (আজ) রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বৃহস্পতিবারই তারা উচ্চ আদালতে যাবেন।
তিনি আরও জানান, প্রথমে নিম্ন আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করা হবে। এরপর জামিনের আবেদন। বয়স, স্বাস’্যগত বিষয়, সামাজিক অবস’ান এবং সাজা তুলনামূলক কম হওয়ায় খালেদা জিয়া জামিন পাওয়ার যোগ্য বলেও দাবি করেন তিনি।
খালেদার আরেক আইনজীবী আব্দুর রেজ্জাক খান গতরাতে সুপ্রভাতকে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি এখনই হবে কি-না, এ বিষয়ে আমরা যথেষ্ঠ সন্দিহান। দুটি মামলায় তাকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর জন্য তারিখও নির্ধারণ করে দিয়েছেন আদালত। একটিতে ১৮ ফেব্রুয়ারি, অন্যটিতে ৪ মার্চ। এর মধ্যে শুনছি আরও তিনটি মামলায় বিএনপি নেত্রীকে গ্রেফতার দেখানো হবে। সরকার মূলত তাকে দীর্ঘমেয়াদে কারাবন্দি করতে চাইছে। এটি অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।’
২০০৮ সালের ৩ জুলাই রাজধানীর রমনা থানায় খালেদাসহ ছয় আসামির বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুদকের একটি সূত্র জানায়, রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি পেলে খালেদা জিয়ার সাজা বৃদ্ধির আবেদন করে তারাও উচ্চ আদালতে আপিল আবেদন করতে পারেন। তবে এ বিষয়ে সংস’াটি চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গতকাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি।
দুই মামলায় আদালতে হাজির করার নির্দেশ
খালেদাকে আরও দুটি মামলায় আদালতে হাজির করার নির্দেশনা গতকাল কারাগারে পৌঁছেছে। শাহবাগ থানার একটি মামলায় ১৮ ফেব্রুয়ারি এবং তেজগাঁও থানার আরেক মামলায় ৪ মার্চ খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করাতে আদালত থেকে চিঠি যায় কারাগারে।
কারা অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের ডিআইজি (প্রিজন্স) তৌহিদুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। মামলা দুটি ২০০৮ সালের বলে জানান এই কারা কর্মকর্তা। তবে কী অভিযোগে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এ প্রসঙ্গে গতকাল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল গণমাধ্যমকে জানান, যে দুটি মামলায় খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করতে বলা হয়েছে, সে দুটির বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই। তিনি কোর্টের নির্দেশনা মেনে কোর্টে যাবেন। ওই দুটি মামলায় তিনি জামিনেও আছেন।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ সময় বলেন, ‘গ্রেফতার দেখানো হবে না, যদি উনি সময়মতো কোর্টে হাজির হন। এখানে তো অন্য কিছু নেই। উনি কোর্টে হাজির হবেন, কোর্ট ডিসিশন নেবে।’
আর কোনো মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়নি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
নাশকতার একটি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসনকে গ্রেফতার দেখানোর যে খবর বেরিয়েছিলো, সেটি নাকচ করে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। গতকাল তিনি জানান, নতুন করে আর কোনো মামলায় খালেদাকে গ্রেফতার দেখানো হয়নি।
গতকাল সচিবালয়ে তিনি বলেন, আর কোনো মামলায় খালেদা জিয়াকে শোন অ্যারেস্ট কিংবা এ ধরনের কোনো কিছু আমলে আনা হয়নি। তার নামে যেসব ওয়ারেন্ট রয়েছে সেগুলোতে তাকে আটক দেখানো হয়নি। এটা একটা ভুল ইনফরমেশন ছড়িয়েছে। তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত যেটাতে, সেটাতেই তিনি কারাবরণ করছেন।”
নতুন নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানো এবং আদালতে হাজির করার নামে খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে বলে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ভাষ্য, ‘সরকার কোনো বিষয়েই কোনো রকম উৎসাহ দেখাচ্ছে না। কোর্ট থেকে যেসব সিদ্ধান্ত আসছে, আমরা সেগুলো বাস্তবায়ন করছি। এখানে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা রাজনৈতিক অভিলাষ নেই।’
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫। একই মামলায় তার বড় ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং অন্য চার আসামিকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। সঙ্গে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা অর্থদণ্ডও। মামলার রায় ঘোষণার পর থেকেই কারাবন্দি রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।